নরসিংদীতে মানবপাচার চক্রের ২ সদস্য গ্রেপ্তার

প্রতিনিধির পাঠানো ছবি

বাংলাদেশ

ভূমধ্যসাগরে স্পিডবোট ডুবি

নরসিংদীতে মানবপাচার চক্রের ২ সদস্য গ্রেপ্তার

  • নরসিংদী প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ৮ মার্চ, ২০২২

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে স্পিডবোট ডুবিতে নিখোঁজ ২৮ জনের মধ্যে ১৫ জনের বাড়িই নরসিংদীতে। ঘটনার ৩৭ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো সন্ধান না পাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, তাদের সবাই মৃত্যু হয়েছে। ফলে নিখোঁজ পরিবারগুলোতে বইছে স্বজন হারানোর শোক। আর বেঁচে যাওয়া ৬ জনের মধ্যে নরসিংদীর একজন দেশে ফিরেছেন।

এদিকে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নরসিংদীতে মানব পাচারকারী চক্রের ২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত সোমবার রাতে রায়পুরা উপজেলার হাসনাবাদ এলাকায় পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন রায়পুরা উপজেলার হাসনাবাদ এলাকার বাচ্চু মোল্লার ছেলে মামুন মোল্লা (৩৯) ও আগানগর এলাকার কালীপদ শীলের ছেলে সুবল চন্দ্র শীল (৪৫)। সুবল লিবিয়া প্রবাসী মনি চন্দ্র শীলের চাচাতো ভাই।

পুলিশ জানায়, রায়পুরার আগানগর এলাকার বাসিন্দা মনি চন্দ্র শীল প্রায় ৫ থেকে ৬ বছর ধরে লিবিয়ায় চাকরি করছেন। সে হাসনাবাদ এলাকার বাসিন্দা তারেক মোল্লা ও মামুন মোল্লাসহ তাদের আত্নীয় স্বজনদের মাধ্যমে ইতালি নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখায়। তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে বিভিন্ন দেশে পাচার করে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা আশিষ সূত্র ধর (২১), মো. আলামিন ফরাজী (৩০), নাদিম সরকারকে (২২) বৈধ পথে ইতালি নেওয়ার কথা বলে আট লাখ টাকা মৌখিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়। দেশ ছাড়ার আগে ছয় লাখ টাকা তাদেরকে দেওয়া হয়। বাকি টাকা ইতালি পৌঁছার পর দেওয়ার কথা ছিল। পরে গত ৩০ নভেম্বর আশিষ সূত্রধর ঢাকা বিমানবন্দর হতে ইতালীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। পরবর্তীতে আশিষ সূত্রধরকে দালাররা ইতালি না পাঠিয়ে লিবিয়াতে পাঠায়। লিবিয়া পৌঁছার পর হতে আশিষ সূত্রধর লিবিয়া অবস্থান করতেছে বলে মোবাইলে তার পরিবারকে জানায়। গত ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর হতে আশিষ সূত্রধরের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। ছেলের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে জানার জন্য তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার ছেলে ইতালী আছে বলে জানায় এবং বাকি দুই লাখ টাকা দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। দালাররা আলামিন ফরাজী (৩০) এবং নাদিম সরকার (২২) সহ রায়পুরা থানা এলাকার আরো একাধিক যুবককে বিভিন্ন সময়ে একই কায়দায় ইতালীর কথা বলে লিবিয়া বা অন্য কোন দেশে পাচার করেছে বলে জানা যায়।

রায়পুরা থানার উপ-পরিদর্শক আতাইর রহমান বলেন, রোববার এ ঘটনায় উপজেলার আমিরগঞ্জ এলাকার দুই দালাল মো. তারেক মোল্লা ও লিবিয়াপ্রবাসী মনি চন্দ্র শীলের বিরুদ্ধে রায়পুরা থানায় নিখোঁজ আশিষ, আল আমিন ও নাদিমের পরিবার লিখিত অভিযোগ করে। পরে সোমবার রাতে রায়পুরা উপজেলায় গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে মামুন মোল্লা ও সুবল চন্দ্র শীলকে গ্রেপ্তার করে।

এর আগে ২৭ জানুয়ারি ভূমধ্যসাগরে ৩৫ যাত্রী নিয়ে স্পিডবোটডুবির ঘটনা ঘটে। নরসিংদীর নিখোঁজ ১৫ জন হলেন রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ মির্জানগর পূর্বপাড়া এলাকার ওসমান গণির ছেলে এস এম নাহিদ (২৮), হাসনাবাদ বাজারের অনিল সূত্রধরের ছেলে আশিষ সূত্রধর (২২), হাইরামা ইউনিয়নের কবির মিয়ার ছেলে শাওন মিয়া (২২), আগানগর এলাকার আব্দুল করিম ভূঁইয়ার ছেলে ইমরান ভূঁইয়া (২১), বালুয়াকান্দি এলাকার সবুজ মিয়া (৩৮), দড়ি হাইরামার ইয়াকুব আলীর ছেলে সেলিম (৩৪), ডৌকারচর ইউনিয়নের সোবহান সরকারে ছেলে নাদিম সরকার (২২), বাচ্চু ফরাজীর ছেলে আল আমিন ফরাজী (৩৩) ও আলমগীর সরকার। বেলাব উপজেলার হালিম মিয়া, নারায়ণপুর ইউনিয়নের ভাটেরচর গ্রামের ইউনুছ আলীর ছেলে আল আমিন (২৫), সল্লাবাদ ইউনিয়নের ইব্রাহীমপুর এলাকার ইউনুছ মিয়ার ছেলে সালাউদ্দিন, হাবিবুর রহমানের ছেলে শরিফুল ইসলাম ও নারাণপুর ইউনিয়নের দুলালকান্দি এলাকার নুরুল ইসলামরে ছেলে মতিউর রহমান ও বাচ্চু মিয়ার ছেলে বিপ্লব মিয়া (২৫)।

স্পিডবোট ডুবির ঘটনায় বেঁচে থাকা ছয়জনের মধ্যে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জের ইউসুফ মৃধা গত বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ২৭ জানুয়ারি লিবিয়ার স্থানীয় সময় ৮টার দিকে দুই মিসরীয় চালক তাদের ২৫ জনের ধারণক্ষমতার স্পিডবোটে ৩৫ জনকে নিয়ে ইতালির উদ্দেশে রওনা হন। এসময় আমাদের কোন লাইফ জ্যাকেট বা কোনো ধরনের সেফটি ইকুইপমেন্ট কাউকে দেওয়া হয়নি। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় পড়ে যাওয়া একজনকে তুলতে গিয়ে স্পিডবোডটি উল্টে যায়। ওই সময় তিনিসহ আরো সাতজন উল্টো স্পিডবোটের ওপরে অবস্থান নেন। বাকিরা টেউরের ধাক্কায় ভেসে যান। তীব্র ঠাণ্ডায় ১১ ঘণ্টা ভেসে থাকার পর কোস্ট গার্ডের সদস্যরা তাদের উদ্ধার করেন। তবে তীরে ওঠার আগেই ঠান্ডায় জমে একজনের মৃত্যু হয় বলে জানান তিনি।

এদিকে নিখোঁজ হাসনাবাদ বাজারের আশিষ সূত্রধরের ভাই আনন্দ সূত্রধর বলেন, তারেক মোল্লা যুবকদের ইতালি যেতে প্রলোভন দেখাতেন। আশিষকে দুবাই ও মিসর হয়ে লিবিয়ার বেনগাজিতে নেওয়া হয় । পরে সেখান থেকে ত্রিপোলি নিয়ে বেশ কিছুদিন রাখা হয়। গত ২৭ জানুয়ারি আশিষ শেষবারের মতো ফোন করে জানায়, রাতে স্পিডবোটে করে তাদেরকে ইতালি পৌঁছে দেওয়া হবে। চার দিন আগে দেশে ফেরা ইউসুফের মাধ্যমে জানতে পারি স্পিডবোট ডুবির ঘটনা। পরে ভাইয়ের সন্ধান চেয়ে তারেক মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আশিষ এখনো জীবিত আছে, কিন্তু তাদের কথায় আমরা আশ^স্ত হতে পারছি না, ভাইয়ের পরিণতি নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি।


আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads