সারা দেশ

অনিয়ম দুর্নীতির কারণে বার বার বদলি হয়েও থেকে যান স্বপদে

চসিক সচিব খালেদ মাহমুদের খুঁটির জোর কোথায়

  • অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিত ৩১ অক্টোবর, ২০২৩

আ ন ম সানাউল্লাহ, চট্টগ্রাম: বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বার বার বদলি হবার পরেও কোন এক অজানা কারণে আবারো স্বপদে বহাল হয়ে যান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) আলোচিত সচিব খালেদ মাহমুদ।

এর আগে দুই বার তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বদলির আদেশ দেয়া হলেও উর্ধতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে প্রতিবারই তিনি বদলির আদেশ প্রত্যাহার করিয়েছেন। এ নিয়ে চসিকে নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়েছে।

জানা যায়, চলতি বছরের ১৭ জুলাই চসিক সচিব খালেদ মাহমুদকে বদলি করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊনি-২ শাখা থেকে এ বিষয়ে পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মেহেদী হাসান ও আব্দুল্লাহ আরিফ মোহাম্মদ স্বাক্ষরিত দুই চিঠি থেকে এ তথ্য জানা যায়।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বছরজুড়ে দুর্নীতি অনিয়মের কারণে সমালোচনার শীর্ষে থাকা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের শীর্ষ চারপদে পরিবর্তন আনতে চায় মন্ত্রণালয়। আড়াই হাজার কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম ইয়াজদানীর উপর হামলার পর থেকে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে চসিকের উপর। এরই প্রেক্ষিতে চসিকের সচিব খালেদ মাহমুদকে বদলির মধ্য দিয়ে দাপ্তরিক সংস্কারের কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়।

এদিকে, চসিকের সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে খালেদ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। গত বছরের জানুয়ারিতে এ কর্মকর্তা সরকারী চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে নিজের মেয়েকে (শায়লা শারমিন মুমু) চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত পূর্ব বাকলিয়া উচ্চ বালিকা স্কুল এন্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেন। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে নিজের আত্মীয় পরিজনদের মধ্যে প্রভাব খাটিয়ে অন্তত ১৫ জনকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন বিভাগে চাকরি দিয়েছেন তিনি।

এমন গুরুতর অভিযোগ উঠার পরও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে এর আগেও এক দফা বদলি করা হয়েছিলো তাকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চসিকের শীর্ষকর্তাকে ম্যানেজ করেই টিকিয়ে রেখেছিলেন সচিবের চেয়ার। এবারো একই কাজ করলেন তিনি।

১৭ জুলাই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) বর্তমান সচিব খালেদ মাহমুদকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে বদলি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়। একইসঙ্গে চসিকের নতুন সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয় সরকারী আবাসন পরিদপ্তরের (গণপূর্ত) উপ-পরিচালক কাজী শহিদুল ইসলামকে। নিয়মানুযায়ী সরকারি এ দুই কর্মকর্তাই নিজ নিজ বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে যোগদান করবেন নতুন কর্মস্থলে। মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুসারে চসিকের সচিব পদে যোগদান করেন কাজী শহিদুল ইসলাম। এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল।

তবে বিপত্তি ঘটে এ কর্মকর্তা (কাজী শহিদুল ইসলাম) যখন ৭ আগস্ট চসিকে যোগদান করতে আসেন। কারণ সদ্য বদলি হওয়া বর্তমান সচিব খালেদ মাহমুদ তাঁর দায়িত্ব থেকে অবমুক্ত না হওয়ায় কর্মস্থলে এসেও সচিবের দায়িত্বভার পাননি নতুন সচিব। এমনকি বসতে পারেননি সচিবের রুমেও।

এরইমধ্যে ৭ আগস্ট বিকেলে কোন এক অদৃশ্য কারণে চসিকের বর্তমান সচিব খালেদ মাহমুদের বদলির আদেশ বাতিল করে মন্ত্রণালয়। অর্থাৎ বর্তমান সচিব তাঁর পদেই বহাল থাকবেন। আবার চসিকে সদ্য যোগদান করা নতুন সচিবকে তখনো অন্য কোথাও পদায়ন বা বদলির কোনো আদেশই জারি করেনি মন্ত্রণালয়। এ যেন এক সিটি কর্পোরেশনেই দুই সচিব।

এমন বিস্ময়কর ঘটনা জানাজানি হলে তোলপাড় সৃষ্টি হয় মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনেও। যেন গায়ের জোরেই পদ বাঁচালেন বর্তমান সচিব খালেদ মাহমুদ।

চসিক সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ জুলাই চসিকের সচিব পদে কাজী শহিদুল ইসলামকে পদায়ন এবং বর্তমান সচিব খালেদ মাহমুদকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপ-প্রধান হিসেবে বদলি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়। নিয়মানুযায়ী গত ২৬ জুলাই বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে ৩০ জুলাই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব পদে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন কাজী শহিদুল ইসলাম। পরবর্তীতে গত ২ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মাহবুবা আইরিনের স্বাক্ষরিত আরেকটি প্রজ্ঞাপনে ৩০ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব পদে কাজী শহিদুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সচিব পদে গত ৩ আগস্ট চসিকে যোগদান করার কথা থাকলেও ৭ আগস্ট যোগদান করতে আসেন এ কর্মকর্তা। তবে এরমধ্যেই ‘দাবার চাল’ উল্টে গিয়ে মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মেহেদী হাসানের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়— ‘বর্তমান সচিব খালেদ মাহমুদের বদলির আদেশ বাতিল করা হলো’।

 

চসিকের ‘আলোচিত’ সচিবকে বদলি

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ জুলাই রাতে চসিকের বর্তমান সচিব খালেদ মাহমুদের মা মারা যান। মায়ের মৃত্যুর কথা বলে তিনি প্রথমে মৌখিকভাবে ১৫ দিন পর নতুন কর্মস্থলে যোগ দেবার অনুমতি নেন। সচিবের চেয়ার না ছাড়তে পরবর্তীতে চসিক মেয়র থেকে বদলি প্রত্যাহারের ডিও লেটার (আধা সরকারি পত্র) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে নানাভাবে তদবির চালান এ কর্মকর্তা। শেষমেষ বদলির আদেশ প্রত্যাহার করিয়ে আনলেন।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নতুন সচিব যোগদান করতে এলে এ সচিব মেয়রের নির্দেশ ছাড়া তাকে রুমেও ঢুকতে দেননি। সারাদিন তিনি বিভিন্ন কর্মকর্তাদের রুমে ছিলেন। দুপুরের খাবার খেয়েছেন প্রধান নিবার্হী ও প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে। এই বিষয়টি খুবই দৃষ্টিকটু। যেহেতু নতুন সচিবের আদেশ বাতিল হয়নি। আবার বর্তমান সচিবও বহাল থাকছেন। পুরো ব্যাপারটি রীতিমতো হাস্যকর হয়ে গেছে।’

 

এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমাদের মেয়র গেছেন আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। যতটুকু শুনেছি এরই ফাঁকে তিনি বদলির আদেশ বাতিল করিয়ে এনেছেন। এই সচিবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় গুরুতর অভিযোগ উঠার পরও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কীভাবে কীভাবে যেন বরাবরই টিকে যান তিনি।’

বদলি এবং অভিযোগের বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব খালেদ মাহমুদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বদলি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জারি করেছিলো আবার তারাই বাতিল করেছে। তারা কেন বাতিল করেছে সেটা তারাই বলতে পারবে। আর অভিযোগের বিষয়গুলো মেয়র মহোদয় বলতে পারবেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads