মুক্তমত

শুকনো পাতাদের বিজয়গাথা

  • প্রকাশিত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০

সাদিক আল আমিন

 

বিজয়ের ইতিহাস প্রতিটি অনুগত বাঙালিই জানে। জানার কথাও। এত বিপ্লবের যে আঁকাবাঁকা পথ, সে পথের পথিকেরা এবং যারা পরে জেনেছেন সেই পথের ভীষণ করুণ মর্ম তাদের মধ্যে একটা বিভেদ আছে। সেই বিভেদ সহজে বলার মতো নয়। জগতের সবকিছুই আপেক্ষিকতার জটিল রহস্যে ভরপুর। তেমনি জটিল এবং অসহজলভ্য আমাদের বিজয়। যারা বিজয় এনেছেন, তাদের দুঃখকথা কলমে লেখা সম্ভব নয়। সেই কঠিন অবাস্তব পথে যারা হেঁটে অন্যদের বিকাশের সুযোগ করে দিয়েছেন, তাও নয় ভাষায় প্রকাশ করার মতো। প্রতিটি মানুষেরই থাকে একটি চেতনা উত্তরসূরিদের নিয়ে। পরের প্রজন্ম নিয়ে মাথাব্যথা সবারই হয়। আপনি নিশ্চয়ই আপনার সন্তানদের ভবিষ্যতে ভালো দেখতে চাইবেন। তেমনি চেয়েছিলেন আমাদের নেতারা, যোদ্ধারা। তারাই জানেন সেই পথের বেগতিক অবস্থা। দূর থেকে দেখলে একটি পথকে শুধু পথই মনে হয়। অথচ যারা হাঁটে খালি পায়ে, তারা জানে কত ইট-সুরকি, কত কাঁটা, কত ভাঙা কাচ, কত পচা উচ্ছিষ্টে ভরপুর সেই পথ। তারা জানে কত কষ্টসাধ্য সেই যাত্রা। যারা বিজয়ের জয়গান গেয়েছেন, তারা জানেন প্রতিটি ইট-সুরকি-পাথর-কাচ পায়ে বিঁধে তারপর সেগুলো সরানোর মর্মবেদনা। কী দায় ছিল তাদের! কী দায় ছিল বিজয়ের! উত্তরে বলা যায় সহস্র কথা। তবে শুধু বলল, এই বাংলাদেশ, এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মর্মদহন অনুভব করার মতো হূদয় আমাদের আজো হয়নি, হবেও না কোনোদিন।

মার্চের রাত যখন গভীর থেকে গভীরতরো হতে থাকে, বাঙালির ইতিহাসের গল্প ততই কাছে আসতে থাকে। খোলাসা হতে থাকে বেদনা ও প্রতিশোধের আবছায়া। সেই গল্পের গল্পকার এক মহান নেতা। যার কথা সবাই জানেন। যার নাম বিনয়ের সঙ্গে উচ্চারণ করলেও মাথাটা নুইয়ে আসে। সেই রাতে সবাই কি কোনো উৎকণ্ঠা ছাড়াই ঘুমোতে পেরেছিল? এদেশের সাত কোটি মানুষের মনের অবস্থা তখন কী ছিল তা আন্দাজ করা দায়। সেই রাতে ঘাতকের থাবায় পিষ্ট হয়েছে বহু প্রাণ। পিষ্ট হয়েছে একটি জাতির অনুপ্রেরণার জায়গাগুলো। শুকনো পাতা ভাঙার মর্মর ধ্বনির মতোই ভেঙে গিয়েছিল বাঙালির হূদয়। তারপর যখন স্বাধীনতা ঘোষিত হলো, এক অদ্ভুত মায়ায় গুঁড়ো গুঁড়ো হওয়া পাতারা জড়ো হতে লাগল। হতে লাগল সংঘবদ্ধ। কোটি কোটি শুকনো পাতা একত্র হয়ে ঝড় তৈরি করল, আগুন জ্বালালো, পোড়ালো। পুড়ল নিজেরাও। তবে সেই আত্মদহন মর্যাদার, সম্মানের। কোনো মানুষই অস্বাভাবিক মৃত্যু চায় না। সবাই চায় তার মৃত্যু সম্মানের হোক। কুঁড়েঘরের কোণে বসে কেউ মরতে চায় না। তারই তাড়নায় দলে দলে নেমে এলো অনন্ত যৌবন। তরুণের দল পাথরে ফোটা ফুল ছিঁড়ে আরেক পাথর রাখল। লোহায় লোহা কাটে। কেউ যখন এতকিছুর পরেও মানতে চাইছে না তখন পাল্টা ধাওয়াই শ্রেয়। কুকুরের সঙ্গে কুকুরের মতো ব্যবহারই শ্রেয়। কুকুরে কামড়ালে নাকি মানুষের কামড়ানো শোভা পায় না। তবে সেদিন থেকে মানুষেরা না কামড়ালে এই সোনার বাংলার মুখ দেখা যেত না। আদর্শ কখনো কখনো ভাঙতে হয় সবার জন্য। ভেঙেছিল সেই একাত্তরেও। আমরা ভীরু বাঙালি ভেবে নেওয়াটা পাকিস্তানিদের উচিত হয়নি বুঝিয়ে দিতে হয়েছিল অক্ষরে অক্ষরে। তবে শুকনো পাতারা একটি বনকে পুড়িয়ে উজাড় করতে চাইলে আগে তাদের নিজেদের পুড়তে হয়। সূর্য যেমন আগে নিজেকে পোড়ায়, তারপর পোড়ায় অন্যদের। তেমনি বাঙলার বাঙালিরা নিজেদের পুড়িয়েছে। করেছে আত্মোৎসর্গ। ভেঙেছে তাদের পরিবার-পরিজন। তবু থেমে থাকতে চায়নি। দ্বিগুণ ক্ষোভে ভেঙে পড়েছে। কেউ কেউ মুষড়ে যায়। শুকনো পাতা পুড়তে পুড়তে কখনো থেমে গেলে অন্য পাতারা এসে পুড়িয়ে দেয়। তারপর সেই নিভু নিভু পাতা প্রবল বেগে বন পোড়াতে শুরু করে। আমাদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার মতো ছিল অনেকজন। সাহস দেওয়ার মতো ছিল অনেক মনের মানুষ। যারা সংসারের চাইতে দেশকে ভালোবেসেছিল। কোনো এক প্রসূতি মা তার স্বামীকে দুটো নুনভাত খাইয়ে যুদ্ধে পাঠিয়েছিল। বলেছিল, দেশ স্বাধীন করেই তবে ছেলের মুখ দেখবে। দেশ আর সন্তান দুটোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে যুদ্ধ চলে। সেই মা যেন অম্লজান বাতাস। উৎসাহ দিতেই শুকনো পাতারা সব পুড়িয়ে ফেলতে থাকে।

তারপর একদিন খুব ভোরে সূর্য ওঠে। তিরিশ লাখ পাতা নিজেরা পুড়ে খাণ্ডব পাহাড় সব পুড়িয়ে ফেলে। হার মেনে নেয় তারা। অমর বিজয় আসে। কিন্তু এই যে স্বাধীনতার দীর্ঘ নয় মাস, এর সাক্ষী যারা, যারা এই পথে হেঁটে গেছেন, যে পিতা একটি বাংলাদেশ ও তার সন্তানকে দেখার জন্য ঘরে ফিরেছেন; তাদের দুঃখকে অনুভব করার মতো হূদয় হয়েছে কি কারো? ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলব্যাপী যে উৎসব দেখা গিয়েছিল প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে, প্রতিটি মানুষের মুখের হাসিতে ভরে উঠেছিল যখন একেকটা বাংলাদেশ, তখন শুকনো পাতারা তৃপ্তির হাসি হেসেছিল। তারা মরেও যেন মরেনি। তারা শহীদ। শহীদের মতো মর্যাদার মৃত্যু কজনের ভাগ্যে জোটে? তাদের বুকে একেকটি লাল গোলাপ সুগন্ধ ছড়াতে থাকে। আর সেই সুগন্ধি গোলাপের গন্ধে মেতে থাকে এই বাংলাদেশ, এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল। থাকবেও আজীবন ঐশ্বর্যে, দম্ভে, গৌরবে। সেই সুবাস কেউ কখনো দূর করতে চাইলে আবার সেই শুকনো পাতারা গেয়ে উঠবে বিপ্লবের গান।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads