রাজধানীর বনশ্রীর বাসিন্দা ফজলুর রহমান উত্তরা যাওয়ার জন্য সিএনজিতে ওঠেন। যাওয়ার পথে সিএনজিচালক কৌশলে ফজলুর রহমানের সঙ্গে কথায় কথায় সখ্য গড়ে তোলে। এরপর সে জানাই তার নিকট ডলার রয়েছে। গরিব আর অশিক্ষিত হওয়ার কারণে সে ভাঙ্গাতে পারছে না। ডলার ভাঙ্গার অনুরোধ জানানোর পর ফজলুর রহমান ডলারটি দেখতে চায়। এমন সময় ফজলুর রহমানকেই ডলারটি নেওয়ার জন্য বলে। বাজারের রেটের চাইতে অনেক কম বলায় আগ্রহ বাড়ে তার। ১০০ ডলার ৪ হাজার টাকা দিয়ে নিয়েও নেয় সে। পরে তিনি যখন সেটি ভাঙ্গাতে গেছেন তখন জানতে পারেন ডলারটি জাল।
শুধু কি ফজলুর রহমান! এ রকম প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত রাজধানীর রাস্তায় টাকা পয়সা খোয়াচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ভুয়া বিদেশি টাকা, স্বর্ণলঙ্কার দেওয়ার নাম করে রাজধানীতে বেড়েছে এ ধরনের প্রতারকদের দৌরাত্ম্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ধরনের প্রতারণায় সিএনজিচালকদের পাশাপাশি রিকশাচালকরাও জড়িত। বিশেষ করে রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, পল্টন এলাকাতে এদের আনাগোনা বেশি। এই সব এলাকায় বিদেশিদের আনাগোনা থাকায় সহজেই সাধারণ মানুষদের টার্গেট করে সিএনজি অথবা রিকশাচালকরা। রিকশা উঠার পরপরই জানায় কিছুক্ষণ আগে এক বিদেশি তাকে ডলার দিয়েছে। এই টাকা কোথায় ভাঙ্গাবেন বা অশিক্ষিত যেতে পারেনা নানা ধরনের কথা বলে যাত্রীকে কেনার জন্য আকৃষ্ট করে। অনেকেই রিকশাচালক অথবা সিনএনজিচালকের কথায় আকৃষ্ট হয়। আর আকৃষ্ট হওয়া মানেই প্রতারিত হওয়া।
ডিএমপির গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগের সহকারি পুলিশ কমিশনার মোঃ ফজলুর রহমান জানান, ঢাকা শহরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় কখনো রিকশাচালক কখনো ফেরীওয়ালা সেজে এই চক্রের অন্য সহযোগীরা সহজ-সরল প্রকৃতির লোকজনদেরকে বলে যে তারা রাস্তায় বিদেশি রিয়াল পেয়েছে। সে অশিক্ষিত মানুষ, কীভাবে এটা ভাঙ্গাতে হয় সে জানে না। রিয়াল ভাঙ্গিয়ে দিলে সহজ-সরল মানুষকে সে কিছু টাকা দেবে বলে প্রস্তাব দেয়। উপকার হবে ভেবে ঐ লোকটি রিয়েল ভাঙ্গিয়ে দিলে রিকশাচালক/ফেরীওয়ালা লোকটির ফোন নম্বর নেয়। পরবর্তী সময়ে ফোনে তারা যোগাযোগ করে জানায় যে, তার কাছে আরো রিয়েল আছে। সেগুলো সে অর্ধেক দামে বিক্রি করবে। এমন প্রলোভনে লোকটি রাজি হলে টাকা নিয়ে তাদের পছন্দমতো জায়গায় নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ে লোকটিকে আসতে বলে।
তিনি বলেন, রিকশাচালক/ফেরীওয়ালা তাদের চক্রের অপর একটি দলকে ডিবি পুলিশ সাজিয়ে ওই তারিখ ও সময়ে নির্ধারিত স্থানে পিস্তল, ওয়ারলেস সেট, হ্যান্ডকাপসহ মাইক্রোবাস বা একাধিক প্রাইভেটকারে অপেক্ষা করতে থাকে। অপরদিকে রিকশাচালক/ফেরীওয়ালা কাপড়ে মুড়িয়ে রিয়ালের নামে কাগজ বা অন্য কোনো জিনিস নিয়ে এসে রিয়াল ক্রেতাকে বুঝিয়ে টাকা নিয়ে বলে যে, পুলিশ আসছে তাড়াতাড়ি চলে যান। একথা বলে রিয়াল বিক্রেতা টাকা নিয়ে সটকে পড়ে। রিয়াল ক্রেতা একটু অগ্রসর হলেই পূর্বেই ওঁৎ পেতে থাকা ভুয়া ডিবি দলের সদস্যরা রিয়াল ক্রেতাকে আটক করে তাদের গাগিতে উঠিয়ে নেয়। তার কাছে অবৈধ রিয়াল আছে, তার বিরুদ্ধে মামলা/মিডিয়ায় প্রচার করার ভয় দেখিয়ে তার কাছে থাকা নগদ টাকা, মোবাইল ফোন বা অন্যান্য মূল্যবান জিনিস ছিনিয়ে নেয়। রিয়াল ক্রেতার কাছে এটিএম কার্ড থাকলে বুথ থেকে টাকা তুলে নেয় ও মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে টাকা ট্রান্সফার করে নেয়। একসময় রিয়েল ক্রেতাকে সুবিধাজনক স্থানে নামিয়ে দিয়ে অপরাধীরা চলে যায়।
তিনি বলেন, এ ধরনের চক্র চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১০জনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। ছদ্মবেশে পুলিশ কিছু চিহ্নিত এলাকায় এ সব চক্রকে গ্রেপ্তারে কাজ করছে।
এদিকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের লালবাগ বিভাগের টি এ চক্রের ১০ জনকে আটক করেছে। আটককৃতরা হলো মহসিন শেখ (৩০), আনিছুর রহমান (৫০), সেন্টু মুন্সি (৪০), জুয়েল মিয়া (৩০), শাহিন শেখ (২৫), মহব্বত শেখ (৩২), আবুল কালাম (৫০), সুলতান মোল্লা (৩৪), হেমায়েত শেখ (৫৫) ও কাইয়ুম শেখ (৪৫)। এ সময় তাদের নিকট হতে ১টি প্রাইভেটকার, ডিবির জ্যাকেট, ওয়ারলেস সেট, ১ জোড়া হ্যান্ডকাপ ও পুলিশ লেখা স্টিকার উদ্ধার করা হয়।
ডিবি জানায়, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ঢাকা শহর ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা আছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, ঢাকা মহানগর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় এই ধরনের অনেকগুলো অপরাধীদের দল আছে। অপরাধীচক্রের পলাতক ও অন্যান্য সদস্যদেরকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান আছে।





