মো.  জিয়াউল  হক  হাওলাদার

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

তরুণ প্রজন্মের আদর্শ বঙ্গবন্ধু

  • প্রকাশিত ২৭ মার্চ, ২০২১

যে-কোনো সমাজ বা জাতির দ্রুত ও টেকসই উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে সেই দেশের তরুণসমাজ। তবে সেই তরুণসমাজকে হতে হবে চিন্তাচেতনায় আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক, শিক্ষিত ও দক্ষ, সর্বোপরি দেশপ্রেমে উজ্জীবিত। মাদক ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান হতে হবে কঠোর। তরুণসমাজকে চিনতে হবে এবং জানতে হবে তাদের কালজয়ী নেতৃত্বকে। সেই নেতার আদর্শ অনুসরণ করতে হবে, তার দর্শনকে দেশের উন্নয়নে প্রয়োগ করতে হবে।

বাঙালি জাতির জন্য সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু একজন মহান আদর্শবান ব্যক্তিত্ব, দেশপ্রেমে অনন্য, মানবতাবাদী ও জনকল্যাণে এক মহানপুরুষ। যিনি বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের এবং নিজ পরিবারের সর্বসুখ, শান্তি ত্যাগ করে তার ৫৫ বছরের জীবনে জেল খেটেছেন ৪ হাজার ৬৮২ দিন অর্থাৎ ১২ বছরেরও বেশি। বিশ্বের কম নেতাই আছেন যে তার রাজনৈতিক জীবনে এতদিন জেল খেটেছেন। বাঙালির জন্য তার পরম মমতা, ভালোবাসা তাকে বাঙালি জাতির হূদয়ে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

তরুণ মুজিব ছাত্রাবস্থা থেকেই এদেশের মানুষের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার জন্য লড়াই করেছেন। মৃত্যুভয় তার ছিল না। তিনি ছিলেন এক অসীম সাহসী সিংহপুরুষ। এই সিংহপুরুষের ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে সমগ্র বাঙালি জাতিকে এক কাতারে সমবেত করেছিলেন। তার এই কালজয়ী ভাষণ আজো পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে একটি। এই ভাষণটি সর্বদাই আমাদের তরুণ প্রজন্মকে উজ্জীবিত করে।  স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই তরুণ প্রজন্মকে দেশের উন্নয়নে আত্মনিবেদিত হওয়ার জন্য অনেক অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি  কবি জীবনানন্দ দাশের মা কুসুমকুমারী দাশের কবিতার উদ্ধৃতি দিতেন, ‘মুখে হাসি, বুকে বল তেজে ভরা মন/ মানুষ হইতে হবে—এই তার পণ।’

বঙ্গবন্ধু ছিলেন এশিয়া মহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সংগঠক। তিনি তরুণসমাজের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি তার চিন্তা এবং আদর্শকে তরুণসমাজের মাঝে খুব দ্রুত সঞ্চার করতে পারতেন। বঙ্গবন্ধুর মোহনীয় জাদুর ক্ষমতায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে এবং ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে দেশের তরুণসমাজের এক অভূতপূর্ব সম্মিলন ঘটাতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু যেদিকে যেতেন হাজার হাজার তরুণ তার দিকে ধাবিত হতো। এ এক বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী তিনি ছিলেন। হিমালয় পর্বতের মতো তিনি লক্ষ্য অর্জনের বিশ্বাসে অটল ছিলেন। তাই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের শত নির্যাতন, কষ্ট, জেল-জুলুম, হুলিয়া সত্ত্বেও দেশপ্রেমের আদর্শ থেকে একবিন্দুও টলেননি। এরকম আদর্শের তরুণসমাজ বঙ্গবন্ধু এদেশে দেখতে চেয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন তার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে। সেই তরুণ প্রজন্মকে হতে হবে সাহসী, তেজে ভরা মনের অধিকারী।

১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, বাঙালির মুক্তির সনদ বঙ্গবন্ধু যখন ঘোষণা করলেন; তখন এদেশের কোটি তরুণ এতে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্নের প্রতিফলন দেখতে পেলেন। এদেশের তরুণ ছাত্রসমাজ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আন্দোলনে শরিক হয়ে পাকিস্তানি শাসকদের ভীত প্রকম্পিত করে দিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে এদেশের তরুণ-যুব-ছাত্রসমাজ বঙ্গবন্ধুর এক নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বঙ্গবন্ধুর ওপর তরুণসমাজের দৃঢ় বিশ্বাস ও আস্থা ছিল। তারা বিশ্বাস করত বঙ্গবন্ধুই বাঙালি জাতির একমাত্র ত্রাণকর্তা।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, তার দর্শন সম্পর্কে জানতে হলে নতুন প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর লেখা তিনটি বই ভালো করে পড়তে হবে এবং গভীরভাবে আত্মস্থ করতে হবে। বইগুলো হচ্ছে-‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং ‘আমার দেখা নয়াচীন’। আমি যখন ছাত্র ছিলাম তখন আবুল মনসুর আহমেদের ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ পড়েছি। পরে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ প্রকাশিত হলো এবং বই দুটি পড়লাম, তখন মনে হলো আবুল মসনুর আহমেদের সেই বইটির আর কোনো আবেদন আমার কাছে নেই। অর্থাৎ আমি তরুণ প্রজন্ম হিসেবে বাঙালি জাতির অভ্যুদয়, উত্থান এবং আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের একটি অখণ্ড এবং পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেলাম। আর তাই আমাদের তরুণ প্রজন্মের সকলকে বঙ্গবন্ধুর লেখা ওই ৩টি বই পড়তে হবে এবং বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রকাশিত গবেষণাসমূহ পড়তে হবে।

২০১৮ সালে জার্মান মিডিয়া ডয়েচ ভেলে ‘নতুন প্রজন্মের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক একটি মতামত জরিপ  বাংলাদেশের তরুণ ছাত্রছাত্রীদের মাঝে চালিয়েছিল। ঐ জরিপে প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য মতামত হচ্ছে এরকম : বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম সকল তরুণের জন্য অনুসরণীয়। এই দেশপ্রেম অনুসরণ করতে পারলে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব। একজন তরুণ হিসেবে বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন একজন আদর্শ মানুষ। তার ব্যক্তিত্ব, আদর্শ, গুণাবলি নিজের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি তরুণ প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক, আত্মত্যাগী মানুষ। বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষের জন্য কাজ করেছেন, সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। তার আদর্শ চিরভাস্বর ও বিশাল ব্যক্তিত্ব সর্বদাই অনুসরণীয়।

জাতির পিতার স্বপ্নপূরণ করার দায়িত্ব নিতে হবে নতুন প্রজন্মকে। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গত ১৭ মার্চ ২০২০ মুজিববর্ষের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমরা দেশকে এবং দেশের মানুষকে ভালোবাসবে। অনেক ত্যাগের বিনিমেয়ে অর্জিত আমাদের এই স্বাধীনতা। স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলার উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে তোমাদের নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। ঠিক যেভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন, সেভাবেই ভালোবাসতে হবে। তার আদর্শে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।’

সুতরাং আমাদের সব তরুণকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে যাতে করে আমরা নিজেরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে অনুসরণ করতে পারি এবং তার দর্শনকে লালন ও প্রয়োগ করে সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে আমাদের মন-মনন-মেধা-চিন্তাকে সপ্রতিভ এবং শানিত করতে হবে। আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে আগামী ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর ন্যায় জীবনভর আত্মতাগে বলীয়ান হয়ে সর্বোচ্চ পরিশ্রম করে যেতে হবে, এই হোক আমাদের দৃঢ় প্রত্যয়।

লেখক : মো.  জিয়াউল  হক  হাওলাদার

ব্যবস্থাপক (জনসংযোগ), বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads