করোনাভাইরাসের কারণে অমর একুশে বইমেলা ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসে নিয়ে আসা হয়েছে। তবুও যে এই মেলা হচ্ছে, এটিই আনন্দের। বইমেলাকে কেন্দ্র করে লেখক, পাঠক, প্রকাশক, প্রেসের কর্মী, মেলার বিক্রয়কর্মী ও দর্শনার্থী সবার প্রতীক্ষা থাকে। শুরুতে সংশয় থাকলেও সেই মেঘ কেটে যায়। মেলার তারিখ ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই বইয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সবার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। লেখক ও পাঠকের মিলনক্ষেত্র হচ্ছে বইমেলা। বইপ্রেমীরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য। জানা যায়, বইমেলার বিষয়টি এদেশে প্রথম ভাবেন প্রয়াত কথাসাহিত্যিক জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সরদার জয়েনউদদীন। ১৯৭২ সালে তিনি যখন গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক, তখন ইউনেস্কো ওই বছরকে আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে। গ্রন্থমেলায় আগ্রহী সরদার জয়েনউদদীন এই গ্রন্থবর্ষ উপলক্ষে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। সেই থেকেই বাংলা একাডেমিতে গ্রন্থমেলার সূচনা। শিক্ষা বিস্তারের সাথে সাথে বইমেলারও প্রসার ঘটতে থাকে। নতুন বই নতুন লেখক কবির মিলনস্থল এই বইমেলা। পুরাতন পাঠকদের সাথে যোগ হয় নতুন প্রজন্মের বইপড়ুয়া পাঠকরা। এই পরিবেশ দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে, অনুপ্রেরণা জোগায়। বইমেলার কেন্দ্রবিন্দু হলো বই। যুগ যুগ ধরে যা জ্ঞান বিতরণের মহাদায়িত্ব পালন করে আসছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসের সাথে বদল হয় বইয়ের ধরন। কিন্তু বদলায়নি বইয়ের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। নতুন-পুরাতন লেখক, কবি, প্রকাশক, মেলার দর্শক সবাই উপস্থিত হয়। বইমেলায় আসা থেকে শুরু করে বই বিক্রি করাই শেষ কথা নয় অথবা মেলার সার্থকতা নয়। মিলনমেলায় সবাই একত্রিত হওয়াটাও উদ্দেশ্য। আদিকাল থেকে যখন কাগজের প্রচলনই হয়নি সেই তখন থেকেই পড়ার প্রতি মানুষের এক ধরনের তীব্র আগ্রহ বিদ্যমান ছিল। মানুষ পড়তে ভালোবাসে। মুদ্রিত আকারে বই প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে সেই ঝোঁক আরো বেড়ে যায়। নতুন বই বইয়ের গন্ধ এসব যেন আমাদের আত্মর সাথে মিশে যায়। আজো আত্মার সাথে মিশেই রয়েছে। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ ইত্যাদি সাহিত্যের নানা শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করে মানুষের আত্মর খোরাক জোগাতে থাকে। তৈরি হয়েছে আলাদা আলাদা পাঠক শ্রেণি। গল্প বা উপন্যাসের বই পড়তে পড়তে কত বইপড়ুয়ার রাত ভোর হয়ে যায়। এসব পড়ুয়া বইপ্রেমীদের হাত ধরে তৈরি হয় বইয়েরসংগ্রহশালা। সেসব সংগ্রহশালায় থরে থরে শোভা পেতে থাকে পাঠকের হূদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। মানুষ আজকের ডিজিটাল যুগে কিছু না কিছু পড়ছেনই। মোবাইলের মেসেজ থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড পর্যন্ত। তারপরও বই পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ থেকেই যাচ্ছে। কেবল জ্ঞান অর্জনের জন্যই বই পড়ছে কথাটা এমন নয়। বই পড়াতে অনেকে মনের মুক্তি খুঁজে নিচ্ছেন। সেই তখন থেকে জ্ঞান অর্জনের প্রধান অনুষঙ্গ বই। আমাদের দেশের আজকাল বই নিয়ে চিত্রটা বেশ কমন। নতুন বই বইমেলাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। নতুন লেখক বইমেলাকেন্দ্রিক। এমনকি বই কেনাটাও সেই বইমেলাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সারা বছর তেমন কোনো নতুন বইয়ের দেখা পাওয়া যাবে না। কিন্তু বইমেলা এলেই বই প্রকাশের হিড়িক লেগে যায়। তা হোক, মেলাতে এমনটাই হবে। তবে বই নিয়ে এমন আগ্রহ যদি সারা বছর থাকত তাহলে বেশ ভালো হতো। অথচ বইয়ের সাথে বহু মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। লেখক, প্রকাশক, ছাপাখানার কর্মীরা সারা বছর এক প্রকার নীরব থাকেন। তাদের তেমন কোনো ব্যস্ততা থাকে না। সব ব্যস্ততা তোলা থাকে বইমেলার জন্য। ফলে বইয়ের চাহিদা একটা নির্দিষ্ট সময়ে থাকবে সেটাই খুব স্বাভাবিক। বই অভ্যাসটা এখন কমেছে এটা সত্যি, তবে এতটা কমেনি। কিন্তু বই প্রকাশের গতি কেবল বইমেলাকেন্দ্রিক হওয়ায় এখনো টিকে থাকা পাঠকরা তাই সারা বছর অভুক্ত থাকে। তা ছাড়া গত কয়েক বছরে এমন কোনো লেখক পাঠকমহলে সাড়া ফেলতে পারেননি যার বইয়ের টানে পাঠকমহল ছুটে আসে। যার বইয়ের খোঁজ সারা বছর নেয় পাঠকরা। হুমায়ূন আহমেদ মারা যাবার পর সেই অভাবটা আরো বেশি টের পাচ্ছে মেলা প্রাঙ্গণ। ঘুরেফিরে সেইসব লেখক-কবির বই-ই বইমেলাজুড়ে।
গত কয়েক বছরে আমাদের দেশে বইমেলার আয়তন বেড়েছে অনেকখানি। বেড়েছে প্রকাশনা সংস্থার সংখ্যা। এসেছে বহু নতুন লেখক, কবি, গবেষক। বইমেলায় একদিকে যেমন প্রচুর বই আসছে, সেইসাথে সেসব বই বিক্রির সংখ্যা কম। হঠাৎ করে আসা লেখক-কবির অনেককেই পরে সাহিত্যচর্চায় দেখা যায় না। আজকাল বই বের করাটা তেমন সমস্যার না। অনেক প্রকাশনী আছে যারা বই বের করার জন্য মুখিয়ে থাকে। লেখককে নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে বই বের করতে হয়। কারণ প্রকাশক কেন ঝুঁকি নেবেন? বই বিক্রি না হলে তো পুরোটা লোকসান। লেখক নিজের টাকা দিয়ে বই বের করেন। অনেক লেখক-কবি প্রতি বছর বই বের করেন। কিন্তু তারা আদৌ কোনো পাঠক শ্রেণি সৃষ্টি করতে ব্যর্থ। হাতে-গোনা কয়েকজন লেখক আজ পাঠক টানতে পারছেন। তাই সাহিত্যের মান রক্ষা করাটা জরুরি। যারা লেখালেখির জগতে নতুন। তাদের একটা বিষয় অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে যেন সাহিত্য বিষয়টা নিয়মিত চর্চা করে। হুট করে বই প্রকাশ করার চেয়ে সময় নিয়ে লেখালেখিতে আরো মজবুত ভিত্তি করে তারপর প্রকাশে যাওয়া উচিত। সাহিত্যচর্চায় ধৈর্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত চর্চা ছাড়া যেমন কোনো কাজেই সফলতা অর্জন করা সম্ভব না, তেমনি সম্ভব না সাহিত্যেও। অনেকেই হঠাৎ দু-একটা বই বইমেলায় নিয়ে আসে। তারপর তারা সাহিত্যের জগৎ থেকে হারিয়ে যায়। এটা সাহিত্যের জন্য শুভসংকেত নয়। কারণ অনেক বই প্রকাশ করেও পাঠকের মনে জায়গা পাওয়া যায় না, আবার দু-চারটি বই প্রকাশ করেই হুলুস্থুল ফেলে দেওয়া যায়। তারা বড় লেখকের সম্মানও পান।
বইমেলা সব বিভেদ দূর করে বাঙালির প্রাণের সঞ্চার করে। সময়ের সাথে সাথে বইমেলা আরো বিস্তৃত হচ্ছে। বইমেলা বাঙালির ভাষাচর্চারও জায়গা। বই বেশি বেশি পড়তে উৎসাহিত করতে হবে। বই পড়া কেবল বইমেলাকেন্দ্রিক হলে তা আমাদের জন্য সুখকর নয়। চর্চা ধরে রাখতে হবে। একেবারে মফস্বল এলাকা পর্যন্ত এই বই পড়া কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে হবে। যদিও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সে দায়িত্ব বহু দিন ধরেই পালন করে যাচ্ছে, তা সত্ত্বেও বাংলা ভাষার সঠিক চর্চার প্রতি আগ্রহটা কম। কেবল ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক বাংলা ভাষাচর্চা সীমাবদ্ধ থাকলে তা আমাদের ভাষার অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। যে ত্যাগ এই ভাষার সাথে মিশে আছে আমাদের সেই ত্যাগের মূল্যায়ন করতে হবে। এই কাজটি সবাইকে মিলেই করতে হবে। বইমেলায় সেই চর্চা অনেকটা এগিয়ে যায়। বইমেলার সাথে আছে লেখক, পাঠকসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই। এসব নিয়েই আমাদের বইমেলা এগিয়ে যাক।
লেখক : শিক্ষক ও নিবন্ধকার





