আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা এবং না-বলা কথা

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা এবং না-বলা কথা

  • প্রকাশিত ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

আলজাজিরার টানা এক ঘণ্টা ২০ সেকেন্ডের ডকুমেন্টারিটি দেখলাম। বাংলাদেশের সেনাপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারকে মাফিয়া হিসেবে বিশ্বে পরিচিত করার জন্য অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ডকুমেন্টারিটি বানানো হয়েছে। ডকুমেন্টারিতে ‘মাফিয়া’ শব্দটি ব্যবহারও করেছে আলজাজিরা।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (সম্ভবত ‘বিলাসী’ গল্পে) একটি উদাহরণ দিয়েছিলেন। তার এগজাক্ট কোটটি আমার মনে নেই। তবে কথাটি ছিল, যে ব্যক্তি রেলগাড়ির জানালা দিয়ে বাংলাদেশের গ্রাম দেখেছেন তিনি প্রশ্ন করতেই পারেন, ‘ধান গাছের তক্তা হয় কি না?’ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ যারা আলজাজিরার ওই ডকুমেন্টারি দেখে বাংলাদেশকে জানলেন, এখন তাদের মনেও প্রশ্ন জাগতে পারে, ‘বাংলাদেশ একটি মাফিয়া রাষ্ট্র কি-না?’ বিদেশিদের সেই ধারণার বীজে জল সিঞ্চনের জন্য দেশে-বিদেশে রাজনৈতিক প্রোপাগেটরেরও অভাব নেই। কিন্তু আমরা যারা বাংলাদেশকে জানি এবং বুঝি, তাদের কাছে এই প্রতিবেদনটি কীভাবে প্রতিভাত হয়? আলজাজিরা তাদের প্রতিবেদনে মোটাদাগে চারটি বিষয়কে ফোকাস করেছে :

এক. বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের তিন ভাই— হারিস, আনিস ও জোসেফ সন্ত্রাসী এবং আলজাজিরার দৃষ্টিতে তারা আন্তর্জাতিক মাফিয়া। হারিস যে তার এলাকায় একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, এই তথ্যটি আলজাজিরা গোপন করেছে। তার ভাই জোসেফকে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল বিএনপি সরকার এবং সেই তালিকা যে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হতে পারে— এ বিষয়ে আলজাজিরা কৌতূহল প্রকাশের অবকাশ পায়নি। জোসেফ ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন, এটাও উল্লেখ করতে আলজাজিরা ভুলে গেছে। ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাসী মোস্তফা হত্যা মামলায় জোসেফের মৃত্যুদণ্ড এবং তার অন্য দুই ভাইয়ের যাবজ্জীবন হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট পরবর্তীকালে জোসেফের সাজা কমিয়ে দেয়।

এই ফ্রিডম পার্টিকে আলজাজিরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ফ্রিডম পার্টি কি আসলেই একটি রাজনৈতিক দল ছিল বা আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার মতো ছিল? সে তো ছিল একটা খুনি-সন্ত্রাসী গ্যাঙ, যার মার্কা ছিল ‘কুড়াল’, যে গ্যাঙটিকে জাতীয় পার্টি এবং বিএনপি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যবহার করত। ‘ফ্রিডম পার্টি’ একটি নিষিদ্ধ সংগঠন— এই তথ্যটিও উল্লেখ করতে আলজাজিরা ভুলে গেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকারী কর্নেল ফারুক, রশিদ এবং অন্যরা কীভাবে বাংলাদেশে প্রকাশ্যে রাজনীতিতে নামতে পারল, কারা তাদের অস্ত্র, অর্থ, পৃষ্ঠপোষকতা তথা সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কীভাবে মাঠে নামাল— এসবের কোনো বর্ণনা প্রতিবেদনে নেই। কারণ এসব উল্লেখ করলে তাদের পারপাসটাই মাটি হয়ে যায়। শেখ হাসিনাকে কীভাবে কতবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে, হারিস ও জোসেফরা কীভাবে তাঁর প্রাণ বাঁচিয়েছেন, তাদের প্রতি শেখ হাসিনার কৃতজ্ঞতা থাকার বা স্নেহশীল হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে কি-না, এই অ্যানালাইসিসের কোনো প্রয়োজন আলজাজিরা দেখেনি। শেখ হাসিনাকে সে সময় রাষ্ট্র প্রোটেকশন দেয়নি। আর্মি বা পুলিশ তার প্রাণ বাঁচায়নি, তার দলের নিবেদিত কর্মীরাই বারবার মানবঢাল তৈরি করে এবং নিজেদের জীবন দিয়ে তাদের নেত্রীর প্রাণ বাঁচিয়েছেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসতে না পারলে তাকে যতবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল, তার কোনোটারই বিচার পাওয়া সম্ভব ছিল না।

১৯৯৬ সালে ফ্রিডম পার্টির গুলিবিদ্ধ সন্ত্রাসী মোস্তফা মৃত্যুর আগে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে একটি জবানবন্দি দিয়েছিল বলে আলজাজিরা প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে। ভিডিওচিত্রের ওই অংশটি আমি টেনে টেনে কয়েকবার দেখেছি। ম্যাজিস্ট্রেটের অনুলিখনে (ইংরেজিতে লেখা) সেখানে মোস্তফার বয়ান হলো, ‘হারিস আমাকে তার লাইসেন্স করা বন্দুক দিয়ে প্রথমে গুলি করে।’ প্রশ্ন হলো, একজন মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি কীভাবে নিখুঁতভাবে বলতে পারে তাকে যে বন্দুক দিয়ে গুলি করা হয়েছিল সেটি লাইসেন্সকৃত? মোস্তফা বলেছেন, ‘হারিসের পর জোসেফ আমার কোমর থেকে পিস্তল নিয়ে আমার পেটে গুলি করে।’ অর্থাৎ মোস্তফা কোমরে পিস্তল ঝুলিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতেন। যে দেশে মুদির দোকানে পিস্তল কিনতে পাওয়া যায় সে দেশের মানুষ ওই জবানবন্দি দেখে অবাক হবে না। মোস্তফা যদি সচেতনভাবেই বলতে পারেন, তার কোমরে পিস্তল ঝোলানো ছিল এবং জোসেফ সেটা দিয়েই তাকে গুলি করেছে, তবে মোস্তফা আসলে কী জিনিস ছিলেন, সে পরিচয় পেতে আমাদের অসুবিধা হয় না। মোস্তফা জবানবন্দিতে আরো বলেছেন, হারিস এবং জোসেফ ছাড়া অন্যরা তাকে র‍্যান্ডমলি গুলি করেছে। তাকে নয়টি গুলি করা হয়েছে— একথাও মোস্তফা তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন। একজন মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি নিজের দেহে নয়টা গুলি লাগার কথা গুনে গুনে বলতে পারে— এটা শুনে আমি হতবাক হয়েছি। কিন্তু আলজাজিরার প্রতিবেদক এতে অবাক হননি।

মৃতব্যক্তির ডায়িং ডিক্লারেশনের ভিত্তিতেই বিএনপি আমলে জোসেফ এবং অন্যদের সাজা দেওয়া হয়েছিল। সে জবানবন্দিতে মোস্তফার স্বাক্ষর ছিল না, হাতের ছাপও ছিল না। বিএনপি সরকারের নিয়োগ করা ম্যাজিস্ট্রেট কীভাবে ওই জবানবন্দি বানিয়েছিলেন তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের যথেষ্ট অবকাশ আছে। মোস্তফা আসলে কবে এবং কোথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিল তা নিয়েও বিভ্রান্তি আছে। মৃত্যুর ঘোষণাপত্রে বলা হয়, গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল সিডিএস প্রিন্টিং প্রেসে। যেটা অন্য একটি দলের সঙ্গে হয়েছিল এবং সেটি ১৯৯৬ সালের ৫ মে হয়েছিল। আর এফআইআরে বলা ছিল ৭ মে। জোসেফ এবং তার ভাইদের ফাঁসানোর জন্য ঘটনাকে নতুনভাবে সাজানো হয়েছিল বলে তাদের আইনজীবী বহুবার আদালতকে বলেছেন। মামলাটি নিয়ে এরকম অনেক বিভ্রান্তি আছে, যা বিস্তারিত করছি না। আমি মনে করি, সরকারের উচিত কোর্টের অনুমতি নিয়ে ওই মামলাটি পুনঃতদন্ত করা। কারণ এর সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি জড়িয়ে গেছে।

দুই. প্রতিবেদনের অভিযোগ, আমাদের সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে তার প্রবাসী ভাইয়েরা যোগাযোগ রাখেন এবং পরিবারে বিয়েশাদীর মতো অনুষ্ঠানেও তারা যোগ দিয়েছেন। আলজাজিরা এই তথ্য দিয়ে প্রমাণ করার প্রয়াস পেয়েছে, আমাদের সেনাপ্রধানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাফিয়াদের যোগাযোগ আছে। হারিস বা তার অন্য কোনো ভাই কি আসলেই আন্তর্জাতিক মাফিয়া? বাংলাদেশের একটি হত্যা মামলা ছাড়া হারিস বিদেশে কোথাও কোনো অপরাধ কর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন— এর কোনো প্রমাণ বা ন্যূনতম তথ্য আলজাজিরা তুলে ধরতে পারেনি।

আলজাজিরা হারিসকে আন্তর্জাতিক মাফিয়া বলেছে। প্রতিষ্ঠানটি তাহলে বিএনপি নেতা তারেক রহমান সম্পর্কে কী বলবে? তারেক রহমান ২১ আগস্টের বোমা হামলা মামলায়, ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলায় এবং একাধিক দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক অপরাধী। জঙ্গিদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা প্রমাণিত। তিনি কি তাহলে আন্তর্জাতিক মাফিয়া? তিনি কীভাবে পলাতক অপরাধী হয়েও একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান থাকতে পারেন? তাহলে বিএনপি সম্পর্কে আমরা কী বলব? সেনাপ্রধান আজিজের সঙ্গে তার আপন ভাই যোগাযোগ রাখেন— এটি জেনে আমাদের অবাক হওয়ার কারণ নেই। আমাদের পরিবারের কেউ মামলা মোকদ্দমায় আসামি হলে আমরা কি তাদের সহযোগিতা করি না?

তিন. প্রবাসী হারিস ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আলোচনা করেছেন। আলজাজিরা এই বিষয়টি বিশেষভাবে ফোকাসে এনেছে। বিষয়টি সত্য হলে আমি বলব, একজন পলাতক ব্যক্তিকে এরকম সুযোগ দেওয়া উচিত হয়নি। তবে ওইসব সেনাসরঞ্জাম (বন্দুকের কার্তুজ) বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শেষ পর্যন্ত আদৌ কিনেছিল কি না এবং কিনে থাকলেও তাতে দুর্নীতি হয়েছিল কি না, দুই টাকার জিনিস পাঁচ টাকা দিয়ে কিনে দেশের ক্ষতি করা হয়েছিল কি না— এরকম কোনো তথ্য আলজাজিরা হাজির করতে পারেনি।

চার. পলাতক হারিস একসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ছিলেন এবং তার প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর স্নেহের দৃষ্টি আছে। কারণ সে-সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রাণরক্ষায় বড় অবদান রেখেছিলেন। এ বিষয়টি আলজাজিরার চোখে বড় অপরাধ। আমাদের বাঙালি ভাইয়েরা হারিসের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সকৃতজ্ঞ স্নেহকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন? এখানে দুই ধারার মানুষ আছে। ‘মাগো তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেব’, এই স্লোগান যাদের রক্তে বোধের অনুরণন ঘটায় তাদের সেন্টিমেন্ট একরকম। অন্যদিকে যারা সবসময় বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখার মধ্যে শান্তি খুঁজে পায়, তাদের সেন্টিমেন্ট অন্যরকম। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানিদের চোখে সন্ত্রাসী, আমাদের চোখে বীর। খুনি ফ্রিডম পার্টি ও তার সহযোগী পৃষ্ঠপোষকদের কাছে শেখ হাসিনার ওপর আক্রমণকারীরা বীর, একজন দেশপ্রেমিকের চোখে হাসিনার প্রাণরক্ষায় যারা বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তারাই সম্মানিত অগ্রসেনা।

লেখক : পুলক ঘটক

সাংবাদিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads