ভাষাশহীদদের ‘ভুল’ ছবিতে সম্মান জানানো অমর্যাদার

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

ভাষাশহীদদের ‘ভুল’ ছবিতে সম্মান জানানো অমর্যাদার

  • প্রকাশিত ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের মনে পড়ে যায় বাংলা ভাষার সেই বীরগাথা ইতিহাস। ‘ফেব্রুয়ারি’ নাম শুনলে নিজের অজান্তেই মনটা কেঁদে ওঠে, যারা বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছেন, তাদের জন্য। পৃথিবীতে বাংলাই একমাত্র ভাষা, যার স্বীকৃতির জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি এমনই একটি দিন যে দিনটি আমাদের জন্য শোকের কিন্তু একই সাথে গৌরবেরও। বাঙালি জাতির একটি অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি বিজড়িত একটি দিন এটি। এই দিনটির জন্যই বাংলা ভাষা বিশ্বদরবারে নিজের স্থান করে নিয়েছে। ১৯৫২ সালের এই দিনটির পর ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা দিয়েছে। তাই পরবর্তী বছর থেকে পুরো বিশ্ব এই দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়।

আমাদের বাংলা ভাষা বিশ্বের দরবারে পরিচিত হয়েছে ঠিক; কিন্তু আজ আমরা সেই ভাষার মর্যাদা কতটুকু দিচ্ছি? শুধু মর্যাদা দিতে পারছি না তা-ই নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তো এই মহান ভাষাটির অবমাননাও করছি। আমরা আজ ইংরেজি ও হিন্দির প্রতি এতই আকৃষ্ট হয়ে যাচ্ছি যে, ৪/৫ বছরের একটা বাচ্চা গড়গড় করে ইংরেজি বলছে, হিন্দি বলছে; কিন্তু শুদ্ধভাবে বাংলা বলতে পারে না। হ্যাঁ, আধুনিক যুগে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে আমাদের অবশ্যই ইংরেজি শেখার প্রয়োজন আছে। তাই বলে শুদ্ধভাবে বাংলা না শিখিয়েই ইংরেজি? হিন্দি? এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

আমাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে এখনো পালন করা হয় না আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। যদিও বা পালিত হয়, সেখানে শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় না এই দিবসটির মাহাত্ম্য। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই জানে না এই দিনটির সঠিক ইতিহাস। বিদ্যালয়গুলোতে নেই কোনো শহীদ মিনার। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে দিবসটি পালন করা হয়। আর সেই চাঁদার টাকা উসুল করতেই মূলত তারা সেদিন বিদ্যালয়ে যায়। তারা জানে না ভাষাশহীদদের নাম। শুধু তারাই নয়, প্রতি বছর দিবসটি এলেই দেখা যায় ভাষাশহীদদের জায়গায় ব্যবহার করা হচ্ছে বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি। দেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের গাফিলতি করা হচ্ছে। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে অনেক ব্যানারে দেখা যায় ভুল বানানে অনেক বড় করে লেখা ‘শ্রদ্ধাঞ্জলী’। অনেকেই আবার জুতা পায়ে শহীদ মিনারে উঠে নাচানাচি করে। এভাবেই আমরা প্রতি বছর পালন করছি আমাদের স্মৃতিবহ এই দিবসটি। এছাড়া দেশের সর্বত্রই আমরা লক্ষ করছি বাংলা শব্দের বানান ভুলের মহোৎসব। দেশের অধিকাংশ দোকান, শপিংমল, ব্যানার, ফেস্টুন, সিনেমার পোস্টারে ইংরেজি শব্দের সাথে বাংলা শব্দ মিশিয়ে বিকৃত করা হচ্ছে বাংলা ভাষাকে, যা আমাদের জন্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহূত বাংলার কথা না-ইবা বললাম। সেখানে তো আমরা বাংলা, ইংরেজি, হিন্দির মিশ্রণে এক সংকর জাতের ভাষার আবিষ্কার করে ফেলছি।

বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পাওয়ার পর থেকেই আমরা উত্তরোত্তর এর মর্যাদার হানি করছি। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান গণপরিষদ ও ১৯৫৬ সালে জাতীয় পরিষদে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পাওয়ার এতদিনেও বাংলা তার যোগ্য মর্যাদা পায়নি। ভাষাশহীদের আমরা অসম্মান করছি আর কেউবা তাদেরকে চেনেনই না। আমাদেরকে বাংলা ভাষা পরিপূর্ণ ও সঠিকভাবে জানতে হবে। ভাষা, শব্দ, বাক্য ব্যবহারে সচেতন থাকতে হবে। বাংলা ভাষার ওপর গবেষণা ও চর্চা বাড়াতে হবে। দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্রই বাংলা ভাষা চালু করতে হবে। সেই সাথে কেউ যেন বাংলা ভাষাকে বিকৃত করতে না পারে, সেজন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর বুকে সমুন্নত থাকবে বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং পৃথিবীব্যাপী গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হবে ভাষাশহীদদের।

আদিত্য রায় রিপন

লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads