মুহাম্মাদ হাবীব আনওয়ার
জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করা বর্তমানে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে। তাদের এই কুকর্ম দেখতে দেখতে জনগণও এটাকে এখন স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছে। জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করা এখন আর কেউ দোষের কিছু ভাবে না। চাল চোর আর গম চোর উপাধিতে বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের মান-মর্যাদায় তেমন আঘাতও ফেলে না। চোখের সামনে টনকে টন চাল আত্মসাৎ করে বীর বাহাদুরের মতো বুক টান করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর দেখা হলে আমরা তাদের প্রণাম করে যাচ্ছি। আড়ালে সমালোচনার পাহাড় গড়ছি। এভাবে রাতদিন আমরা যতই সমালোচনা করি না কেন হেতু কোনো লাভ হবে না। কারণ, অন্তর থেকে আল্লাহভীতি দূর হওয়ার পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও জবাবদিহিতা না থাকায় দুর্নীতি এখন চরমে পৌঁছেছে।
মানুষের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন হচ্ছে চারিত্রিক উন্নয়ন। একজন মানুষ যত বড় শিক্ষিত হোক না কেন যদি চারিত্রিক উন্নয়ন তাঁর মাঝে না থাকে তাহলে তার দ্বারা কখনোই নৈতিকতা আশা করা যায় না। চারিত্রিক উন্নয়ন না থাকার পেছনে বড় কারণ হচ্ছে, ধর্মহীন বা আদর্শহীন শিক্ষা। একজন মানুষের আত্মন্নোয়নের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই চলছে চারিত্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে চরিত্র ধ্বংসের হোলিখেলা। ধর্মহীন ও ব্যক্তি স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা কখনো সৎ, দক্ষ ও আত্মন্নোয়ন জাতি গঠন করতে পারে না। যার ফলে দেশে শিক্ষিতের হার বাড়লে কমেনি শিক্ষিত চোরের হার। বর্তমান এই লাগামহীন বাজার মূল্যের সময় গ্রামের একজন অভাবি লোক যদি ক্ষুধার তাড়নায় ৫ টাকার কিছু চুরি করে তাহলে আমরা তার ওপর নির্যাতনের রোলার চালাই। একবারও ভাবিনা বা তাঁর কথা শুনি না। অথচ, আমাদের চোখের সামনে প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে দিব্যি ঘুরে বেড়ানো শয়তানগুলোকে সম্মান দিয়ে চলছি।
দেশের অসংখ্য মানুষ যখন অনাহারে বা অর্ধাহারে কোনোমতে জীবন পাড় করছেন, ঠিক তখন আমাদের দেশের নষ্ট চরিত্রের লোকগুলো রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে সম্পদের পাহাড় গড়ছে। দেশের গণ্ডি পেড়িয়ে পাচার করছে বিদেশে। আপামর জনতার ঘাম ঝোড়ানো ট্যাক্সের টাকাগুলো নিজেদের মন মতো যতেচ্ছ ব্যবহার করছে। রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীল থেকে শুরু করে চেয়ারম্যান-মেম্বার এমন কি একজন চৌকিদারও এমন জগণ্য কর্মের সাথে জড়িত। মানুষ কতটা নীচু ও পশুত্বে পরিণত হলে এই বর্তমান সংকটময় সময়েও নিরীহ জনতার সাথে জুলুম করতে পারে। এদের চোখ-কান, দেমাগ ঠিক থাকার পরেও এমন জগন্য কাজ কীভাবে করতে পারে? মহান আল্লাহতায়ালা এদের উদ্দেশ্য করেই হয়তো বলেছেন, ‘এরা চতুষ্পদ জানোয়ারের চেয়ে নিকৃষ্ট।’ অন্যের সম্পদ হেফাজতের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদের মধ্যে পরস্পরের ধন সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করোনা এবং তা বিচারকের নিকট টোপ হিসাবে উপস্থাপন করোনা যাতে তোমরা জ্ঞাতসারে লোকের সম্পদের অংশ অন্যায়ভাবে উদরস্থ করতে পার।’ (সূরা বাকারা ১৮৮)
রাষ্ট্র কিংবা জনপ্রতিনিধিদের কাছে জনগণের সম্পদ হচ্ছে আমানত। এই আমানত রাক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করছেন, গচ্ছিত বিষয় ওর অধিকারীকে অর্পণ কর; এবং যখন তোমরা লোকদের মধ্যে বিচার মীমাংসা কর তখন ন্যায় বিচার কর; অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম উপদেশ দান করছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী পরিদর্শক। (সূরা নিসা ৫৮) আমানত রাক্ষা করা ঈমানদারের পরিচয়। যার মাঝে আমানতের গুরুত্ব নেই তার ঈমানও পরিপূর্ণ নয়। আল্লাহতায়ালা সুরা মুমিনে ‘যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে’ তাদের ঈমানদার বলেছেন।
অন্যের মাল আত্মসাৎ করার শাস্তি সম্পর্কে অসংখ্য হাদিসে আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কোনো মুসলিমের মাল আত্মসাৎ করার জন্য যে ব্যক্তি মিথ্যা কসম করবে, আল্লাহ্র সাথে তার সাক্ষাত ঘটবে এমন অবস্থায় যে আল্লাহ তার ওপর রাগান্বিত থাকবেন। এ কথারই সত্যতায় আল্লাহতায়ালা অবতীর্ণ করেন, নিশ্চয় যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করে, এরা আখিরাতের নিয়ামাতের কোনো অংশই পাবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-৬৬৫৯) হজরত আবু হুমায়দ সাইদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আযদ গোত্রের ইবনে উতবিয়া নামের এক লোককে সদকা সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি ফিরে এসে বললেন, এগুলো আপনাদের আর এগুলো আমাকে হাদিয়া দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে তার বাবার ঘরে কিংবা তার মায়ের ঘরে কেন বসে থাকল না। তখন সে দেখতে পেত তাকে কেউ হাদিয়া দেয় কিনা? যাঁর হাতে আমার প্রাণ, সেই সত্তার কসম! সদকার মাল হতে স্বল্প পরিমাণও যে আত্মসাৎ করবে, সে তা কাঁধে করে কিয়ামত দিবসে উপস্থিত হবে। সেটা উট হলে তার আওয়াজ করবে, আর গাভী হলে হাম্বা হাম্বা রব করবে আর বকরি হলে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করতে থাকবে। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দুহাত এই পরিমাণ উঠালেন যে, আমরা তার দুই বগলের শুভ্রতা দেখতে পেলাম। তিনি তিনবার বললেন, হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছে দিয়েছি। হে আল্লাহ আমি কি পৌঁছে দিয়েছি? (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-২৫৯৭)
নাউজুবিল্লাহ! কত বড় মারাত্মক কথা। দুনিয়ায় সামান্য লোভ-লালসার জন্য অনন্তকালের আখেরাতকে আমরা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি। অর্থের লোভ মানুষকে পিচাশ বানিয়ে দিচ্ছে। যার ফলে প্রতিনিয়ত খুন, গুম, অপহরণসহ নানা অপরাধ বেড়েই চলছে। আল্লাহতায়ালা আমাদের হেফাজত করুন। আমিন!
লেখক : শিক্ষার্থী, দারুল উলূম হাটহাজারী মাদরাসা চট্টগ্রাম





