চলতি বছরের শুরুর দিকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমার প্রবণতা ছিল লক্ষণীয়। অনেকেরই ধারণা ছিল বৈশ্বিক মহামারী করোনার প্রকোপ বৃদ্ধির সঙ্গে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ তথা রেমিট্যান্সের পরিমাণ হয়তো আরো কমে যাবে। কিন্তু জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও সবশেষ নভেম্বরেও রেকর্ড পরিমাণ দেশে আসায় এ নিয়ে উচ্ছ্বসিত সরকার। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) প্রায় ১ হাজার ৯০ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছে প্রবাসীরা। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি। জুলাই মাসে ২ দশমিক ৫৯, আগস্টে ১ দশমিক ৯৬, সেপ্টেম্বরে ২ দশমিক ১৫, অক্টোবরে ২ দশমিক ১১ ও নভেম্বরে ২ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স জমা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্সের প্রবাহের এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ফুলে-ফেঁপে উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ। কিন্তু হঠাৎ কেন এবং কীভাবে প্রবাসীরা এত বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠাতে সক্ষম হলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বাংলাদেশের খবরকে জানান, আগে প্রবাসীদের অনেকেই ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে হুন্ডিসহ বিভিন্ন ইনফরমাল চ্যানেলে টাকা পাঠাত। কিন্তু সরকার ২ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করায় এখন তারা বৈধ চ্যানেলে টাকা প্রেরণ করছেন। এ ছাড়া করোনা মহামারীর কারণে প্রবাসী অনেক ব্যবসায়ী তাদের বিনিয়োগের টাকা এবং অনেকের সঞ্চিত অর্থ দেশে পাঠানোয় রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, বিদেশে যেসব শ্রমিক কাজ করেন বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিকরা। সেসব দেশে ব্যাংকে টাকা রাখার সুযোগ নেই। এ ছাড়া প্রবাসে বিনিয়োগকারীদের সংখ্যাও তেমন বেশি না। তাই শুধু তাদের দ্বারা এত বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠানো সম্ভব না। এ ব্যাপারে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বিদেশ থেকে আসা অর্থকে ঢালাওভাবে রেমিট্যান্স বলা ঠিক হবে না। এ নিয়ে এত বেশি উচ্ছ্বসিত হওয়ারও কোনো কারণ নেই। তার মতে, এবার যে পরিমাণ অর্থ দেশে এসেছে তার সবটাই যদি শ্রমিকদের হতো তাহলে উচ্ছসিত হওয়ার উপলক্ষ থাকত। কিন্তু এত টাকা শ্রমিকরা পাবে কোথায়? তিনি বলেন, অনেকেই দেশ থেকে অবৈধভাবে টাকা পাচার করেছে। তারা যেসব দেশে টাকা পাঠিয়েছিলেন, করোনা মহামারীর কারণে সেসব দেশে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ না পেয়ে কিংবা ঝুঁকি এড়াতে তারা তাদের পাচারকৃত অর্থ আবারো দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠিয়ে তারা তাদের কালো টাকাকে সাদা করারও সুযোগ পেয়েছেন। ফলে এর মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আসছে বলে মত, এই অর্থনীতিবিদের। তিনি বলেন, টাকা কালো কিংবা সাদা যাই হোক না কেন, দেশের টাকা দেশে ফেরত এসেছে এটি ইতিবাচক। তবে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের ক্লাসিফিকেশন করা উচিত। কারণ, এই ক্লাসিফিকেশনের মধ্য দিয়ে কারা এসব টাকা কোত্থেকে পাঠাচ্ছে তা সহজেই বের করা সম্ভব হবে। এতে করে কারা বিদেশে অবৈধভাবে টাকা পাচার করেছে সেটিও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
‘সরকারের ২ শতাংশ প্রণোদনার কারণে শ্রমিকরা বেশি করে দেশে টাকা পাঠাচ্ছে’-এমন বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আবদুল মজিদ বলেন, ২ শতাংশের ব্যাখ্যা তখনই মিলবে যখন দেখা যাবে এসব টাকা প্রকৃত শ্রমিকরা পাঠিয়েছে।





