প্রতিটি সকাল আসে এখন একরাশ হতাশা নিয়ে। কোথাও কোনো ভালো খবর নেই। পত্রিকার পাতা ওল্টালে বিষাদে ভরে যায় মন। ফেসবুক খুলতে ভয় লাগে। না জানি কার মৃত্যুসংবাদ হূদয়কে দুমড়ে মুচড়ে দেয়। কত নিকট আত্মীয় চলে গেলেন এরই মধ্যে! কারো জানাজা নামাজে শরিক হতে পারিনি। অথচ কত আপন ছিলেন তারা! দূর থেকে তাদের মৃত্যুসংবাদ পেয়েছি আর দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছি। এ অবস্থা কতদিন চলবে কে জানে। জীবন কি আবার স্বাভাবিক হবে? মানুষ কি আবার হাসি গানে মেতে উঠবে? এ প্রশ্নের জবাব কারো কাছে নেই। নিয়তির ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে প্রহর গুনছি আমরা। এছাড়া আর উপায়ই বা কী।
প্রাকৃতিক এই মহাদুর্যোগের মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো খবরটি এসেছে গত ৩ মে সোমবার পদ্মাপাড় থেকে। ভয়াবহ এক নৌ দুর্ঘটনায় একসাথে প্রাণ হারিয়েছে ২৬ জন মানুষ। একটি স্পিডবোটে প্রায় ত্রিশজন যাত্রী যাচ্ছিল মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে মাদারীপুরের বাংলাবাজার ঘাটে। কিন্তু চালকের অদক্ষতা এবং খামখেয়ালিপনার কারণে কাঁঠালবাড়ি ঘাটে নোঙর করে রাখা একটি বালুভর্তি বাল্কহেডের সঙ্গে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে তা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ডুবে যায়। আর তাতে ২৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। এ দুর্ঘটনায় কান্নার রোল পড়েছে পদ্মাপাড়ে। স্বজনহারাদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে সেখানকার বাতাস। বিষণ্ন হয়ে পড়েছে গোটা এলাকা। খবরে বলা হয়েছে, লকডাউনের কারণে ফেরি ও লঞ্চ বন্ধ থাকায় মানুষগুলো স্পিডবোটে নদী পার হচ্ছিল।
দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে যতটুকু জানা গেছে— বোট চালকের অদক্ষতা ও খামখেয়ালিপনাই এর জন্য দায়ী। বেেঁচ যাওয়া যাত্রীদের একজন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মাঝপথেও একবার বোটটি দুর্ঘটনায় পড়তে যাচ্ছিল। যাত্রীরা চালককে সাবধানে চালাতে বললেও সে তাতে কর্ণপাত করেনি। কাঁঠালবাড়ি ঘাটে এসে সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ফলে বোটটি সজোরে ধাক্কা দেয় ঘাটে থাকা বাল্কহেডটিকে। ঘটে প্রাণঘাতী ওই দুর্ঘটনা। সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত স্পিডবোটটির ধারণ ক্ষমতা ছিল সর্বোচ্চ বারোজন। কিন্তু তাতে যাত্রী বহন করা হচ্ছিল ত্রিশজন। দুর্ঘটনার পর বোটের মালিক ও চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কিন্তু মামলা হওয়াটাই শেষ কথা নয়। দুর্ঘটনায় যারা প্রাণ হারাল, তারা তো আর ফিরে আসবে না। স্বজনহারা মানুষগুলোর বেদনার উপশম কি কোনোভাবে সম্ভব?
পদ্মায় সংঘটিত ওই দুর্ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে আবারো দেখিয়ে দিল দেশে আইন বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। যেখানে সরকার ঘোষিত ‘সর্বাত্মক’ লকডাউন চলছে, বাস-মিনিবাস, ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমার, ফেরিসহ সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে, সেখানে শিমুলিয়ার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরঘাট থেকে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে স্পিডবোটটি ছেড়ে গেল কীভাবে? শুধু ওটাই নয়, লকডাউনের এই সময়ে প্রতিদিন এভাবে হাজার হাজার মানুষ নদী পারাপার হচ্ছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় সবকিছু চললেও তারা দেখেও না দেখার ভান করে চলেছেন। পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, শিমুলিয়া কাঁঠালবাড়ি রুটে যেসব স্পিডবোট এবং ট্রলার চলাচল করে সেগুলোর কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই, নেই কোনো বৈধ অনুমোদন। স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় চলে এ অবৈধ ব্যবসা।
এদিকে দুর্ঘটনার পরদিনও শিমুলিয়া ঘাটের চিত্র বদলায়নি বলে পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে। একদিন বন্ধ থাকার পর মঙ্গলবার পুরোদমে স্পিডবোট-ট্রলার চলেছে এপার-ওপার। ৫ মে সমকালের ‘২৬ মৃত্যুতেও বদলায়নি পদ্মার চিত্র’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বজনহারাদের কান্না থামার আগেই লকডাউনের বিধিনিষেধের মধ্যেই স্পিডবোটে যাত্রী পারাপার চলছে। ৩ তারিখের দুর্ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়লেও স্পিডবোট, ট্রলার চলেছে পুরোদমে। অবশ্য শিমুলিয়া ও কাঁঠালবাড়ি ঘাটের নৌ পুলিশ ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা তা অস্বীকার করেছেন। তবে এলাকাবাসী জানিয়েছে, মূল ঘাট থেকে বোট ও ট্রলার না ছাড়লেও আশপাশের চর এলাকা থেকে তা চলাচল করছে। আর কর্তৃপক্ষ থাকছে চোখ বুজে।
আমাদের নৌপথের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই বিষয়টি সামনে আসে। এই সময়ে নৌ দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায়। বর্ষা মৌসুম ছাড়াও এখন এন্তার নৌ দুর্ঘটনা ঘটছে। মাত্র কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জে একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ডুবে গেল একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ। তাতে সলিল সমাধি ঘটল বেশ কয়েকজন মানুষের। এর আগে কয়েক মাস আগে বুড়িগঙ্গায় একটি বড় লঞ্চের ধাক্কায় ডুবে গেল আরেকটি অপেক্ষাকৃত ছোট যাত্রীবাহী লঞ্চ। তাতেও প্রাণ হারাল বেশ কয়েকজন মানুষ। এছাড়া ট্রলার ডুবি, স্পিডবোট ডুবির ঘটনা আকছার ঘটছে আমাদের দেশে। নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইন আছে। তবে তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে। যেসব যান্ত্রিক জলযান চলাচল করে সেগুলোর অধিকাংশের হয় লাইসেন্স নেই, না হয় নেই ফিটনেস সার্টিফিকেট। কোনো কোনোটি চলছে বৈধ রুট পারমিট ছাড়াই। একটি দেশ, যেখানে সংবিধিবদ্ধ আইন রয়েছে সেখানে এভাবে যে যার ইচ্ছেমতো নৌযান চালাতে পারে এটা কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশ বলে কথা!। অন্য দেশে যেটা কল্পনা করা যায় না, আমাদের দেশে সেটাই স্বভাবিক ঘটনা। আইন অমান্য করাটা এখানে যেন অনেকের অধিকার। অনিয়মই এখানে পরিণত হয়েছে নিয়মে। ফলে বিচারের বাণী এখন আর নীরবে কাঁদে না, চিৎকার করে তার অসহায়ত্বের কথা জানান দেয় প্রতিনিয়ত।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, যখনই কোনো একটি দুর্ঘটনা ঘটে, আইন-কানুন, নিয়ম-নীতির কথা আলোচনার টেবিলে আসে। গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। কিন্তু কিছুদিন যেতেই সব হয়ে পড়ে সুনসান। তদন্ত কমিটি কী কদন্ত করে, কী সত্য উদঘাটন করে, কী সুপারিশ করে তা আর আমজনতার গোচরে আসে না। আরেকটি দুর্ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত আর কোনো আলোচনা হয় না। এবারো কাঁঠালবাড়ি দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটনে একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। তারা নাকি তদন্ত শুরুও করেছেন। সে তদন্ত রিপোর্ট কবে প্রকাশিত হবে, কিংবা আদৌ প্রকাশিত হবে কিনা আমরা জানি না। তবে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এটা গ্যারান্টি দিয়েই বলা যায়, তদন্তে যা-ই পাওয়া যাক, কমিটি যে সুপারিশই করুক, তা কখনোই বাস্তবায়ন হবে না। সবই চলবে আগের মতো। স্পিডবোট-ট্রলার বৈধতা চাড়াই চলবে, অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চলাচল করবে, পকেট ভারি হবে ঘাট ইজারাদার, বোট-ট্রলারের মালিক আর স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের। আইন আর নিয়মকানুনের কথা সীমাবদ্ধ থাকবে কাগজে-কলমে। এরকমটি চলে আসছে সুদূর অতীত থেকে, চলবে আগামীতেও। আমরা সাধারণ মানুষ হৈ-হল্লা করতে পারব, চিৎকার চেঁচামেচি করে হট্টগোল করতে পারব। তবে ‘সকলই গড়ল ভেল’। পরিস্থিতির উন্নতির কোনো আশা করা যাবে না। কেননা অনিয়মের হোতারা জনগণের চেয়ে ঢের বেশি সংঘবদ্ধ, শক্তিশালী। ওদের সম্মিলিত শক্তির কাছে খোদ সরকারও অসহায়। জনস্বার্থে প্রণীত আইনও সরকার সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারে না ওই সংঘবদ্ধ শক্তির চাপের মুখে।
তেমনি একটি খবর বেরিয়েছে গত ১ মে সমকালে। ‘বহুল আলোচিত সড়ক আইন শিথিল হচ্ছে’ শীর্ষক ওই খবরে বলা হয়েছে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালে সড়ক পরিবহন আইনের ধারাসমূহে পরিবর্তন এনে কিছুটা কঠোর করা হয়। জাতীয় সংসদে তা পাস হওয়ার পর ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর আইনটি কার্যকার করার ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু আইনটি ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা এর বিরোধিতায় নামে। তারা আইনটিকে কঠোর ও শ্রমিক স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে আন্দোলন শুরু করে। তারা কঠোর আইনটি শিথিল করার দাবিতে ধর্মঘটে যায় এবং যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। ব্যাপক জনদুর্ভোগের মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের নেতৃত্বাধীন কমিটি আইনের ৯টি ধারা প্রয়োগ স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। এবার সেসব ধারা শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব শিথিলতা প্রণীত আইনটিকে যে নখদন্তহীন বাঘে পরিণত করবে সেটা না বললেও চলে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, একটি সংঘবদ্ধ অপশক্তির কাছে সরকারের নতি স্বীকার। জনগণের ভোটে ক্ষমতাসীন একটি সরকার একটি সংঘবদ্ধ শ্রেণির অন্যায় দাবির কাছ এভাবে মাথা নত করবে ভাবতেও অবাক লাগে। প্রশ্ন উঠেছে, ওরা কি সরকারের চেয়েও শক্তিশালী? অবস্থাদৃষ্টে এটাই মনে হয় যে, ওরা সরকারের দুর্বলতার খবর রাখে। এমনকি ওদের পেছনে সরকারের ক্ষমতাশালী কেউ কেউ মদতদাতা হিসেবে কাজ করছে এমন কথাও প্রচারিত আছে। মূলত স্বার্থান্বেষী ওই গুটিকয় ব্যক্তির কারণে সরকার জনস্বার্থে প্রণীত আইনের প্রয়োগে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এটা দেশে আইনের শাসন তথা সুশাসন কায়েমের পথে অন্তরায়। সমাজ চিন্তকরা বারবার বলে আসছেন, সড়ক-মহাসড়ককে নিরাপদ করতে হলে কঠোর আইনের প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। সরকার সে উদ্যোগ নিয়েও ছিল। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহল প্রভাব খাটিয়ে সরকারকে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। সচেতন ব্যক্তিরা মনে করেন, প্রণীত সড়ক পরিবহন আইনটি যদি শিথিল করা হয়, তাহলে তা হবে আইনের নামে প্রহসন। পরিণত হবে যে লাউ সে কদুতে। এত আন্দোলন, এত বিক্ষোভ সবকিছু অর্থহীন হয়ে যাবে পরিবহন সন্ত্রাসীদের হুমকির কাছে। খবরটি পড়ে ক্ষুব্ধ একজন নাগরিক মন্তব্য করলেন, এখন যদি সন্ত্রাসী, খুনি, চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারীরা সমিতি বানিয়ে দাবি তোলে আইন শিথিল করে তাদেরকে যা খুশি করার সুযোগ দিতে হবে, সরকার কি তাও মেনে নেবে?
কর্তব্যক্তিরা হরহামেশা বলে থাকেন আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। ভালো কথা। কিন্তু সে গতি নিয়ন্ত্রণ করে কারা? রাষ্ট্র নাকি সংঘবদ্ধ অপশক্তি। দেশে আইনের শাসন নেই বলে আমরা হা-হুতাশ করে থাকি। আক্ষেপ করে থাকি আইনের কঠোর প্রয়োগ নেই বলে। কেউ কেউ সরকারের সদিচ্ছার ওপর দোষ চাপিয়ে মনের ঝাল মেটাতে চেষ্টা করেন। তাদের ক্ষোভ, হতাশাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। ভেবে পাই না সরকারের দুর্বলতাটা কোথায়। যে কারণে জনদাবির প্রেক্ষিত জনস্বার্থে প্রণীত আইন শিথিল করে পরিবহন শ্রমিকদের যা খুশি করার লাইসেন্স দিচ্ছে?
হতাশার মেঘ ক্রমেই আমাদের প্রত্যাশার আকাশকে ছেয়ে ফেলছে। এ হতাশা থেকে মুক্তি কোন পথে কেউ জানি না। একটি অদৃশ্য জালে আমরা সবাই যেন বন্দি। সে জাল ছিন্ন করে প্রত্যাশিত অলোর দেখা পাওয়া যাবে কি-না একমাত্র বিধাতাই বোধকরি তা জানেন।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক





