জাতীয়

মধ্যম আয়ের দেশের পথে বাংলাদেশ

সুবিধা ধরে রাখার চেষ্টা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৯ নভেম্বর, ২০২০

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের পথে-আগামী বছরের প্রথম দিকে এ ঘোষণা দেওয়ার কথা জাতিসংঘের। এ ছাড়া তিন বছর পর অর্থাৎ ২০২৪ সালে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মধ্যম আয়ের দেশ হবে বাংলাদেশ। এটি আমাদের জন্য একদিকে যেমন বড় প্রাপ্তি, তেমনি কিছুটা আশঙ্কারও। কেননা মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার কারণে তখন বিশেষ বাজার প্রবেশাধিকার, অল্প সুদে ঋণসহ আরো কিছু সুবিধা পাবে না। তাই এ সুবিধাগুলো অব্যাহত রাখতে জেনেভায় বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় গত অক্টোবরে একটি প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ। যদি সব রাষ্ট্র ওই প্রস্তাব মেনে নেয় তাহলে বাংলাদেশসহ সব স্বল্প আয়ের দেশ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার ১২ বছর পরও আগের সব সুবিধা পাবে।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধাকরা ২০২৪ সালের পরও একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুবিধাগুলো অব্যাহত রাখতে ব্যাপক চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ বিষয়ে রাষ্ট্রদূত মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের প্রস্তাব যদি সব রাষ্ট্র মেনে নেয় তাহলে এ সুবিধা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং সব স্বল্পোন্নত দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে। সব এলডিসির পক্ষে এ প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। এ প্রস্তাবে বাংলাদেশ ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে কাজ করছে। আশা করছি ডিসেম্বরের সাধারণ অধিবেশনে বিষয়টি আলোচনা হবে। যদি আমরা সেখানে একটি সিদ্ধান্ত পায় তবে আগামী মন্ত্রিসভায় এটি পাসের জন্য উপস্থাপন করা হবে। সব স্বল্পোন্নত দেশ এ প্রস্তাব সমর্থন করেছে। উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে বিভিন্নভাবে আমরা আলোচনা করছি। এ বিষয়ে আমরা আশাবাদী। এ সুবিধা ১২ বছরের জন্য থাকবে নাকি কমে যাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি আলোচনা শেষে বলা যাবে। আমরা দাবি করেছি, এ সুবিধা ১২ বছর পর্যন্ত হলে স্বল্পোন্নত দেশগুলো সবদিক থেকে সুবিধা পাবে। তবে অন্য দেশগুলোকে এ প্রস্তাবে রাজি করানো কঠিন। এ বিষয়ে জেনেভাতে কমার্শিয়াল কাউন্সিলর দেবব্রত চক্রবর্তী জানান, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নির্বিঘ্ন ও টেকসই গ্র্যাজুয়েশনে সহায়তার আহ্বান জানিয়ে ২০০৪ এবং ২০১২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দুটি রেজুলেশন গৃহীত হয়। এ ছাড়া চতুর্থ জাতিসংঘ এলডিসি সম্মেলন বা ইস্তানবুল প্রোগ্রামের বৈশ্বিক একটি লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা। কিন্তু সেই রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ফলে এখন যে দেশগুলো আগামীতে গ্র্যাজুয়েশন করবে তাদের নির্বিঘ্ন গ্র্যাজুয়েশন নিশ্চিত করা এবং অন্য এলডিসিদের গ্র্যাজুয়েশনের পথে উৎসাহিত করতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় বর্তমানে এলডিসিদের প্রাপ্য বিশেষ সুবিধাসমূহ গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী আরো কয়েক বছর অব্যাহত রাখা দরকার। আগামী বছরের ডব্লিউটিও মিনিস্টারিয়াল এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসবে বলে আমরা আশা করছি।  বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তির আওতায় এলডিসিগুলোর সাধারণ অব্যাহতির বর্ধিত মেয়াদ ২০২১ সালের জুলাইতে শেষ হবে। এখানেও আমরা দর কষাকষি করছি যাতে নির্দিষ্ট অল্প কিছু সময়ের বদলে সাধারণ অব্যাহতির মেয়াদ এলডিসি হিসেবে পুরোটা সময় এবং গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী আরো কিছু বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

উল্লেখ্য, ট্রিপস চুক্তির আওতায় বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ওষুধ শিল্প ২০৩৩ সালের ১ জানুয়ারি বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে তার আগে এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েশন হলে সুবিধাটি থাকবে না। কিন্তু যদি ট্রিপস চুক্তির সাধারণ অব্যাহতির মেয়াদ ২০২১ সালের ১ জুলাইর পর না বাড়ে তবে বাকি সব সুবিধাও ২০২১-এর জুলাইর পর রদ হবে। তখন বই, সফটওয়্যার থেকে শুরু করে মেধাস্বত্ব আছে এমন সেবা ও পণ্যের ক্ষেত্রে ট্রিপসের বাধ্যবাধকতা বলবৎ হবে। তিনি আরো বলেন, ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার জন্মলগ্ন থেকে ১০ বছরের জন্য স্বল্পোন্নত দেশগুলো ট্রিপসের আওতায় বিশেষ অব্যাহতির সুবিধা ভোগ করছে, যা ২০২১ সালের জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

প্রসঙ্গত, মধ্যম আয়ের দেশ-এ শ্রেণীকরণটি মূলত বিশ্বব্যাংকের। কোন দেশকে কী পরিমাণ ঋণ দেওয়া হবে, সেটি নির্ধারণ করতেই তারা দেশগুলোকে চার ভাগে ভাগ করে। মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিএনআই) মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে দেশের বিভাজন হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে নিম্ন আয়-কমপক্ষে ১০৪৫ ডলার, নিম্ন মধ্যম আয় ১০৪৬ থেকে ৪১২৫ ডলার,  উচ্চ মধ্যম আয় ৪১২৬ থেকে ১২৭৪৫ ডলার, উচ্চ আয় ১২৭৪৬ ডলারের বেশি। প্রতি বছরের ১ জুলাই বিশ্বব্যাংক এ শ্রেণীকরণের তালিকা প্রকাশ করে। এ তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২০১৯-২০ সালের অর্থবছরে ২০০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। তবে মধ্যম আয়ের দেশ ও স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে পার্থক্য আছে। মধ্যম আয়ের দেশ হলেই কোনো দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হবে না।

মূলত, মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া একটি মর্যাদা। জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকের ভিত্তিতে বিশ্বের দেশগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করে। যেমন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি), উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশ। বাংলাদেশ একটি এলডিসি। এলডিসি ধারণাটি প্রথম আলোচনা হয় ১৯৬০ সালে। তবে প্রথম এলডিসির তালিকা করা হয় ১৯৭১ সালের ১৮ নভেম্বর। আর বাংলাদেশ এলডিসিতে অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৭৫ সালে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসোক) উন্নয়ন নীতিমালাবিষয়ক কমিটি বা কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) তিনটি সূচকের ভিত্তিতে তিন বছর পর পর এলডিসির তালিকা করে। যেহেতু বিশ্বব্যাংক সাহায্য দেওয়ার সুবিধার জন্য এ শ্রেণীকরণটি করে, এর ফলে এলডিসির তালিকাভূক্ত দেশগুলো উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ থেকে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাজার-সুবিধা পেয়ে থাকে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads