অপরাধ

সিঙ্গাপুরে পলাতক ওয়ান্ডারার্সের মালিক যুবলীগের সাঈদ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ। রাজধানীর ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন যুবলীগের এই প্রভাবশালী নেতা। ক্যাসিনোতে অভিযান চালানোর পরই বেরিয়ে এসেছে তার নাম।

গত বুধবার র্যাব অভিযান চালিয়ে ফকিরাপুলের ইয়াংমেনস ক্লাব, মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র এবং বনানীর গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ সিলগালা করে দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদকে। তারই ধারাবাহিকতায় গত রোববার রাজধানীর মতিঝিলে ক্লাবপাড়ায় মোহামেডান ক্লাব, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব ও ভিক্টোরিয়া ক্লাবে অভিযান চালায় পুলিশ। এসব অভিযানে বেরিয়ে আসছে একের পর এক ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের নাম ও পরিচয়।

ঢাকার ক্যাসিনো জগতের অন্যতম হোতা কাউন্সিলর সাঈদ। মতিঝিল ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ক্যাসিনোটি তার নিয়ন্ত্রণাধীন। এছাড়াও মতিঝিল এলাকার ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ত্রাস এই যুবলীগ নেতা। সাঈদ প্রতি মাসে মতিঝিল এলাকার প্রায় ৩০ হাজার ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাসে এক হাজার করে টাকা আদায় করতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কাউন্সিলর সাঈদ ছিলেন ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের যৌথ মালিক। তাছাড়াও তিনি বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের (বাহফে) সাধারণ সম্পাদকের পদেও রয়েছেন।

খেলার বদলে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে জুয়ার টাকায় জৌলুসের দৃশ্য ধরা পড়ার পরই তার সম্পর্কে খোঁজখবর নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে বেরিয়ে আসছে সাঈদের টেন্ডারবাজি, জুয়ার আড্ডা, চাঁদাবাজি আর দখলবাজির বিভিন্ন অভিযোগ।

জানা যায়, ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ক্যাসিনোর মালিক হলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা কাওসার মোল্লা এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ। অভিযানের খবরে দুজনই পলাতক। বিএনপির রাজনীতিতে প্রবেশ করা সাঈদ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মতিঝিল এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাঈদ বর্তমানে সিঙ্গাপুরে পলাতক রয়েছেন বলে বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র জানায়।

এ ছাড়াও ডিএসসিসির ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনিছুর রহমানসহ মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা ও পুরান ঢাকার আরো কয়েকজন কাউন্সিলরের খোঁজে মাঠে নেমেছেন গোয়েন্দারা।

আনিছের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি গোড়ান আদর্শ স্কুলের কাছে অবৈধভাবে দখল করা জমিতে ১০তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। এমনকি তার বিরুদ্ধে বনশ্রীর প্রজেক্টের ভেতরেও একাধিক জমি দখল ও বিভিন্ন ধরনের চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

অভিযানের পর তদন্তে জানা যায়, পাঁচ-ছয় বছর ধরে কাউন্সিলর সাঈদ ক্যাসিনোর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। র্যাবের অভিযানের আগে তার ধারণা ছিল তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবেন এবং ক্লাবগুলোর কাজকর্ম নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। এই ক্লাব খেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হলেও জুয়া ছিল মুখ্য। অথচ এই ওয়ান্ডারার্স পঞ্চাশ-ষাটের দশকে ঢাকার ফুটবলে পরাশক্তি ছিল। শীর্ষ ফুটবল লিগে চ্যাম্পিয়নও হয়েছে। বড় বড় ফুটবলার খেলতেন এই ক্লাবে।

কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পরেই গড়ে তোলেন ডিএসসিসির আওতাধীন হাটগুলোর টেন্ডার সিন্ডিকেট। যে কারণে কয়েক বছর ধরে সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী হাটগুলোর ইজারা ঘুরেফিরে একই ব্যক্তির হাতে চলে যায়। এসব নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন মমিনুল হক সাঈদ। যার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে এ বছর কোরবানিতে রাজধানীর অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা নেওয়ার সময়। সর্বোচ্চ দরদাতা মনোনীত হয়ে একাই দুটি হাটের ইজারা নিয়েছিলেন তিনি। অথচ সিটি করপোরেশন আইন-২০০৯ অনুযায়ী বলছে, কোনো জনপ্রতিনিধি করপোরেশনের সঙ্গে এ ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকার কথা নয়।

প্রতি বছরই কয়েকটি হাট নামে-বেনামে তিনি ভাগ করে নেন। এবারো সর্বোচ্চ ৭০ লাখ টাকার দর দিয়ে ব্রাদার্স ইউনিয়ন বালুর মাঠ এবং সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার দর দিয়ে কমলাপুর স্টেডিয়ামের পাশের হাটের ইজারা নেন সাঈদ।

এ ছাড়া সাঈদের নিয়ন্ত্রিত দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবেও চলে ক্যাসিনোর রমরমা বাণিজ্য। ২০১৭ সালে তার বিরুদ্ধে মতিঝিলের আরামবাগ এলাকায় রাতের আঁধারে প্রায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার এড়াতে  ইতোমধ্যে বিদেশে পালিয়ে গেছেন মমিনুল হক সাঈদসহ আরো অনেকে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, অনেক প্রভাবশালীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একে একে দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ যেই দলের হোক কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি অভিযুক্ত যে কেউ পালিয়ে দেশের বাইরে যেতে পারবেন না বলেও জানান।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads