ফিচার

সাত সাহসের গল্প

  • প্রকাশিত ৭ অগাস্ট, ২০২১

নাছির উদ্দিন


প্রায় দেড় বছর যাবৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় স্কুল পড়ুয়া কিশোরীদের নিয়ে গ্রামীণ পরিবারগুলোতে দেখা দিয়েছে একধরনের অনিশ্চয়তা। এছাড়া বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসীদের দেশে ফেরা, সমাজ বাস্তবতায় প্রবাসে কাজ করা ছেলের ‘পাত্র’ হিসাবে চাহিদা বেশি’ এবং দেরিতে মেয়েদের বিয়ের প্রস্তাব আসা মানে প্রতিবেশী মহিলাদের খোটার শিকার হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে করোনাকালীন সময়ে বেড়ে গেছে বাল্যবিয়ে। কিন্তু ৭ জন কিশোরীর বেলায় ঘটেছে ভিন্ন ঘটনা। বাল্যবিয়ে বৃদ্ধির পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় করোনার চলতি (২০২১) বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৭ জন কিশোরী রক্ষা পেয়েছেন বাল্যবিয়ে থেকে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে উপজেলার ব্রাক্ষন্দী ইউনিয়েনের মারুয়াদি গ্রামের আবুল হোসেনের মেয়ে বৃষ্টি, ফেব্রুয়ারিতে ফতেপুর ইউনিয়নের লতব্দী গ্রামের আমানউল্লার মেয়ে তানজিলা, মার্চে উচিৎপুরা ইউনিয়নের জাঙ্গালিয়া গ্রামের আলমগীরের মেয়ে নাদিয়া, জুনে দুপ্তারা ইউনিয়নের সত্যভান্দী গ্রামের মানিক মৃধার মেয়ে সানজানা আক্তার চৈতি, জুলাইয়ে সাতগ্রাম ইউনিয়নের পুরিন্দা গ্রামের আলমগীর মোল্লার মেয়ে মাইশা আক্তার আলো, আগস্টে মাহমুদপুর ইউনিয়নের শ্রীনিবাদী গ্রামের কামাল হোসেনের মেয়ে আনিকা আক্তার ও গহরদী গ্রামের নজরুল ইসলামের মেয়ে মাইশা আক্তার নামের ৭ কিশোরী বাল্যবিয়ের হাত থেকে রক্ষা পায়।

জাঙ্গালিয়া গ্রামের শিক্ষার্থী শোভন (ছন্দনাম)। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের কারণে গ্রামেই আছেন দীর্ঘদিন যাবৎ। গ্রামের বাজারে যাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন তার পাশের গ্রামে এক স্কুল পড়ুয়া কিশোরীর বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। সাথে সাথে উপজেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট থেকে নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করে বাল্যবিয়ের বিষয়টা জানান। পরে বাল্যবিয়ের হাত থেকে রক্ষা পায় স্কুল পড়ুয়া কিশোরী নাদিয়া। শোভন জানায়, স্কুলে পড়ার সময়ই বাল্যবিয়ের বিভিন্ন কুফল সম্পর্কে জেনে আসছি। তখন ছোট ছিলাম বলে চোখের সামনে বাল্যবিয়ে হলেও কিছুই করতে পারতাম না। বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক ব্যাধি থেকে সমাজকে বাঁচাতে পারলে সমাজ সুস্থ হয়ে উঠবে বলেই বাল্যবিয়ে বন্ধের প্রতিজ্ঞা নিয়েছি।

মাহমুদপুর ইউনিয়নের সোহরাব ((ছন্দনাম) একজন সচেতন তরুণ শ্রমিক। খেলার মাঠে হঠাৎ জানতে পারে তার গ্রামেরই ৮ম শ্রেণির এক কিশোরীর বাল্যবিয়ে হচ্ছে। সরাসরি উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টা জানান। পরে অষ্টম শ্রেণির কিশোরী বাল্যবিয়ের হাত থেকে রক্ষা পান। সোহরাব জানান, বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার কারণে একটি সুস্থসবল সমাজে বসবাস করতে পারছি না। দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি, অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হওয়ার কারণে তারা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারছে না। সেজন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাল্যবিয়ের হাত থেকে গ্রামের অল্পবয়সী মেয়েদের বাঁচাতে হবে। একটি সুস্থসবল সমাজে বসবাস করার ও মেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত দেখার জন্যই এমন উদ্যোগ নিয়েছি বলে তিনি জানান।

সাইফুল্লাহ সুমন (ছন্দনাম) ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। উপজেলার বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রোগ্রামে যাওয়া-আসার কারণে ও শিক্ষার্থী হিসেবে বাল্যবিয়ের কুফল, সরকারি আইন সম্পর্কে অবগত। বাল্যবিয়ে একটি অপরাধ। এই অপরাধ যেন কেউ না করে, সেজন্য গ্রামে গ্রামে ও বন্ধু-বান্ধবদের সচেতন করেন। একদিন এক বন্ধু জানায়, তার গ্রামে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী এক কিশোরীর বিয়ে হচ্ছে। প্রশাসনকে জানালে বিয়ে বন্ধ হয়। রক্ষা পায় একজন কিশোরীর জীবন। বাল্যবিয়ে মুক্ত একটি সমাজ ও উপজেলা চাওয়ার অঙ্গিকার সামনে নিয়ে তিনি বাল্যবিয়ের হাত থেকে কিশোরীদের রক্ষা করার পথে পা বাড়িয়েছে বলে জানান।

বাল্য বিয়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া নাম না প্রকাশের শর্তে স্কুল পড়ুয়া এক কিশোরী জানান, কিছুদিন আগে আমগো বাড়িতে কয়েকজন লোক আসে। আমারে অন্য রুম থেকে ডেকে এনে দেখে। কিছুক্ষণ পরই চলে যাই। তারপর লোকজন মা-বাবার সাথে কথা বলে চলে যায়। পরে রাতে মায় আমারে বলে শুক্রবার তোর বিয়া।

অভিভাবক কামাল হোসেন জানান, আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। বিদেশ ফেরত ছেলে পেয়েছি বলে বিয়ে দিতে চেয়েছি। করোনায় এমনেই কাজকর্ম নাই, আবার মেয়ে পালমু কেমনে।

উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাসরিন সুলতানা বলেন, বিভিন্ন এলাকায় আমাদের নেটওয়ার্কের ও স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে অত্র এলাকাগুলোতে উপস্থিত হয়ে বাল্য বিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিয়ে বন্ধ করে ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিয়ে দেবেন না এই মর্মে অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহাগ হোসেন বলেন, কোথাও বাল্য বিয়ের খবর পেলে আমরা সরাসরি উপস্থিত থেকে সে বিয়ে পণ্ড করে দিচ্ছি।

সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে বাল্যবিয়ে সম্পূর্ণ নিরোধ হতে পারে বলে মনে করেন জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান বেগম চেমন আরা তৈয়ব। পাশাপাশি যে মেয়েটির বাল্যবিয়ে হচ্ছে তারও সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads