শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত শিশুরা, দ্রুত প্রতিষ্ঠান খোলার দাবি

কোভিড-১৯ এর প্রভাবে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মোবাইলে গেমস খেলছে দুই শিক্ষার্থী

ছবি : মোঃ এমদাদ উল্যাহ

ফিচার

কোভিড-১৯ এর প্রভাব

শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত শিশুরা, দ্রুত প্রতিষ্ঠান খোলার দাবি

অনলাইন ক্লাসের আড়ালে স্মার্টফোনে আসক্তি

  • মো. এমদাদ উল্যাহ, চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা)
  • প্রকাশিত ২৯ অগাস্ট, ২০২১

আবু ওমর জিসান। চৌদ্দগ্রাম মডেল স্কুল এন্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। কোভিড-১৯ সংক্রমণের হার বেশি হওয়ায় ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাঁর পড়ালেখার ব্যস্ততা নেই। সারাদিন ব্যস্ত থাকে স্মার্টফোন নিয়ে। অনলাইন ভিত্তিক বিভিন্ন খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সমস্যা শুরু হয়েছে তাঁর চোখের। ডিভাইস নির্ভরতার কারণে তার ‘মাইওপিয়া’ নামক রোগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দেখালে জিসানকে ডিভাইস থেকে দূরে রাখতে পরামর্শ দেয়া হয়। এভাবে জিসানের মত সারাদেশের স্কুল ও মাদরাসায় পড়ৃয়া হাজার হাজার শিশু অনলাইন গেমস আসক্তিতে জড়িয়ে পড়েছে। পড়ালেখা বন্ধ থাকায় অনেকে জীবিকা অর্জনে বিভিন্ন ধরনের কর্ম বেছে নিয়েছে। আবার অনেকে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে। মূলত-করোনা ভাইরাসের নীরব শিকার শিশুরা। ফলে শিশুর মনোজগতের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

সরেজমিন অনুসন্ধান করে জানা গেছে, আবু ওমর জিসানের বাড়িতে কোভিড-১৯ নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হচ্ছে। বাবা-মা কিভাবে সংসার চলবে, টাকা পয়সা নেই, সেসব বিষয় নিয়ে সারাক্ষণ কথাবার্তা বলছেন। বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তায় তাঁরও উদ্বেগ বেড়েছে। আসলে তার মত শিশুরা বুঝতে পারছে না কোভিড-১৯ কি। এর ক্ষতি কি। কেন তাদের সারাক্ষণ ঘরেই থাকতে হচ্ছে। সরকারি নির্দেশনায় ছুটি থাকায় শিশুরা স্কুুলে যেতে পারছে না, বাড়ির বাইরে খেলতে পারছে না।

সম্প্রতি শিক্ষাব্যবস্থা সচল রাখার জন্য দেশের প্রায় অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা গুগল ক্লাসরুম, গুগল মিট, জুম অ্যাপস, ফেসবুক লাইভ ও ইউটিউবের মতো বিভিন্ন সাইট ব্যবহার করে তাদের শিক্ষকদের সঙ্গে ক্লাস করছে। কিন্তু শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে ডিভাইসের সামনে বসে ক্লাস করায় তাদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যা। অনেক শিশুর পিঠ, কোমর, চোখ ও ঘাড়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এতে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। আর অধিকাংশ সময় জুমে ক্লাস করা নিয়েও বিরক্ত হচ্ছে শিশুরা। ‘অনলাইন ক্লাস’ এর নামে শিশুরা স্মার্টফোনের প্রতি আসক্ত হয়েছে। অনলাইনে অনেক বেশি সময় কাটাচ্ছে। তাদের আবেগ ও আচরণের মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। স্কুল বন্ধের পর থেকে তাদের স্বাভাবিক রুটিন এলোমেলো হয়ে গেছে।

গত ১৪ আগস্ট শনিবার ‘কোভিড-১৯ এ শিক্ষার্থীর মানসিক সংকট উত্তরণে করণীয়’ শীর্ষক চৌদ্দগ্রামে এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুল জলিল চৌধুরী ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী শেখ ফরিদ বলেন, ‘করোনা মহামারীর কারণে গত ১৭ মাস ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি পাঠদান বন্ধ রয়েছে। প্রিয় বন্ধু সহপাঠীদের সঙ্গে খুনশুটি বা আনন্দ করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। এ কারণে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যারা শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী তাদের মানসিক সংকট তীব্র রূপ ধারণ করেছে। কারণ অবস্থা স্বাভাবিক থাকলে ইতিমধ্যেই শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তাদের শিক্ষা জীবন শেষ করে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারত। অনেকেই চাকরির বাজারে প্রবেশ করত। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা একটা সঙ্কটময় সময় অতিক্রম করছে। শিক্ষার্থীরা তাদের বহুবিদ সমস্যার কথা উপস্থাপন করে যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম সচল করার জন্য নীতিনির্ধারকদের কাছে অনুরোধ করেছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট নিরসনে ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থার গাইড লাইন যথাযথভাবে মেনে চলার উপর গুরুত্বারোপ করেন শিক্ষাবীদরা।

পল্লী চিকিৎসক ও অভিভাবক মোঃ আনিসুর রহমান বলেন, একটা শিশু যখন হাঁটতে শেখে, কথা বলতে, দৌঁড়াতে শেখে-এইসব শিশুর বিকাশের একটা অংশ। একটা শিশুর সময় কাটানোর জন্য আরেকটা শিশুর দরকার হয়। শিশুর সকল ধরনের বিকাশ কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়া অনেক পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির বেতন বন্ধ হয়ে গেছে বা কমে গেছে। অনেকের চাকরি চলে গেছে। এসব ঘরে ঠিকমতো খাবার আসছে না। শিশুর সুষম পুষ্টি পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শিশুর লম্বায় বড় হওয়া, ওজন বাড়া-এসব কমে যাচ্ছে। শিশু ঘরে বসে থেকে একাকীত্বে ভুগছে। তাদের বুদ্ধির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে করে বাবা-মায়ের উপরে তাদের ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, তাদের সাথে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইউনিসেফের মতে, প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকার আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় করোনা ভাইরাসের ‘সেকেন্ডারি ইফেক্ট’ পড়তে পারে শিশুদের ওপর। ক্ষুধা, অপুষ্টি ও একাকীত্ব ছাড়াও নানাভাবে শিশুরা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। দ্রুত স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিষ্ঠান খুলে শিশুদের মানসিক সমস্যা নিরসন ও শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে সংস্থাটি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বলছে, ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রমের হার কমেছিল ৯৪ শতাংশ। কিন্তু কোভিড-১৯ এর কারণে শিশুশ্রমের প্রবণতা উল্টো পথে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। লাখ লাখ শিশু আবারো শিশুশ্রমে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছে।

এ ব্যাপারে চৌদ্দগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ডাঃ মুহাম্মদ আবু মুসা আল আমিন বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিশুরা এখন টেলিভিশন, ভিডিও গেমস্ আর কম্পিউটারে সময় কাটায়। তারা মাঠে খেলাধুলার সুযোগ পাচ্ছে না। অনেক শিশু বিশেষ করে উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশুরা ফাস্টফুড, চকলেট, কোমলপানীয়, ফলের রস বেশি খায়। ফলে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে স্থুলতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তবে শিশুর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনে মা-বাবাসহ স্বজনদের সচেতনতাই বেশি প্রয়োজন’।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads