শহর জুড়ে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব

পাহাড়তলী হালিমা পাড়ায় পাহাড় কাটা অবস্থায় এক রোহিঙ্গা পরিবার

ছবি : বাংলাদেশের খবর

সারা দেশ

শহর জুড়ে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব

  • মাহাবুবুর রহমান, কক্সবাজার
  • প্রকাশিত ৭ ডিসেম্বর, ২০২০

কক্সবাজার শহর জুড়ে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব। শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রতি নিয়ত পাহাড় কাটছে বেশ কিছু প্রভাবশালী মহল, এতে ব্যবহার করা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের আবার রোহিঙ্গারাও প্রতি নিয়ত পাহাড় কেটে জমির মালিক বনে যাচ্ছে। আর সে সব পাহাড়ের মাটি যাচ্ছে শহরের বেশির ভাগ বাসা বাড়ি নির্মাণ সহ ভরাট কাজে। এছাড়া জেলায় চলমান বেশির ভাগ উন্নয়ন কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে পাহাড়ের মাটি। মাঝে মধ্যে নামে মাত্র অভিযান চালানো হলেও কোন ভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না পাহাড় কাটা। এতে জেলার অন্তত ৪০% পাহাড় কাটা পড়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া যারা পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে তারা জরিমানা দেওয়ার জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকে বলে জানান অনেকে। তাই শুধু জরিমানা নয় সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।

কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলী এলাকায় সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে,অন্তত ১০ টি পয়েন্ট চলছে পাহাড় কাটা। পাহাড়তলীর হালিমা পাড়া, সত্তরঘোনা, ইসুলুঘোনা, ইসলামপুর, সবুজবাগ, টেকনাফ পাহাড়, বার্মা পাড়া সহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে চলছে পাহাড় কাটা। কয়েক দিন আগে হালিমাপাড়া, সত্তরঘোনা এলাকায় পাহাড়কাটারত অবস্থায় হাসিনা বেগম নামের এক মহিলাকে হাতেনাতে পেলে তিনি জানান, আমার আগে এখানে সবাই পাহাড় কেটেছে তাই আমিও কাটছি। আমি স্থানীয় এক রোহিঙ্গা মৌলবী থেকে ২ শতক জমি কিনেছি এখন পাহাড় কেটে আর কিছু জমি বের করছি।

তিনি স্বীকার করেন মায়ানমার থেকে এসেছি বেশ কয়েক বছর হবে। এখন এখানেই স্থায়ী ভাবে থাকি। আমার মত পাহাড় কেটে বসাবাসকারী অন্তত ২০০ পরিবার রোহিঙ্গা এখানে থাকে।

এ সময় স্থানীয় বেশ কয়েকজন বলেন, রোহিঙ্গা হাফেজ আহামদ সহ বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা এখানে নেতা হয়ে গেছে তারা চাঁদা নিয়ে প্রতি নিয়ত পাহাড় কাটছে আর মাটি বিক্রি করছে। এদিকে লাইট হাউজ পাড়া এলাকা, উত্তরণ, চন্দ্রিমা, টিএন্ডটি পাহাড় এলাকায় ব্যাপক হারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। এখানে পাহাড় কাটতে গড়ে উঠেছে ছোট বড় গ্রুপ যারা এই পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি থেকে শুরু করে খাস জমি দখল তা আবার চড়া দামে বিক্রি করা থেকে উচ্ছেদ সব কিছুই করে। এছাড়া বাস টার্মিনাল, উত্তর ডিককুল, দক্ষিণ ডিককুল, মহুরী পাড়া, জেল গেইট এলাকায় ব্যাপক ভাবে পাহাড় কাটছে প্রভাবশালীরা। রাতের আধারে এসব পাহাড় কাটা হয় বলে জানান জানান সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে শহরের পার্শ্ববর্তী খুরুশকুলে অন্তত ১৫ টি ছোট বড় গ্রুপ পাহাড় কাটছে বলে বলে জানা গেছে। এখানে প্রতি দিন ৩০ টি পয়েন্টে চলছে পাহাড় কাটা। এছাড়া সদর উপজেলার ইসলামপুর, ঈদগাও, পিএমখালী, ঝিলংজা সহ অসংখ্য স্পটে চলছে পাহাড় কাটা।

এ ব্যপারে কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি আবদুল কুদ্দুস রানা বলেন, কক্সবাজার জেলা জুড়ে যে হারে পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ চলছে তা অতীতে কোন সময় দেখা যায় নি। বিশেষ করে পাহাড় কাটার অবস্থা ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। প্রশাসন অভিযানের নামে তাদের জরিমানা করে মনে হচ্ছে পাহাড় কাটার লাইসেন্স দিয়েছে। বরং জরিমানা দিয়ে পাহাড় কর্তনকারীরা আরো বেশ খুশি হয়েছে। কারন পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করেছে ১০ লাখ টাকা জরিমানা দিয়েছে ৫০ হাজার টাকা। এমনকি অনেকে জরিমানার টাকা সব সময় স্পটে রেখে পাহাড় কাটে বলে জানা গেছে।

জেলা জাসদের সভাপতি নঈমুল হক চৌধুরী টুটুল বলেন, যে কোন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহনের সময় সেখানে প্রয়োজনীয় মাটি কোথা থেকে আসবে সেটা আগেই নির্ধারণ করা উচিত। কারন ঠিকাদাররা উন্নয়ন প্রকল্পের কাছাকাছি পাহাড় বা নদী থেকে মাটি সংগ্রহ করে এতে সেই এলাকায় পরিবেশ একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়। আমার জানা মতে কক্সবাজারে যে সব উন্নয়ন প্রকল্প চলছে বিশেষ করে রেল লাইন প্রকল্পের সব মাটি স্থানীয় পাহাড় বন উজাড় করে সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে কক্সবাজারের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সহ সভাপতি অধ্যাপক অজিত দাশ বলেন,রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রন না থাকার কারনে প্রতি নিয়ত রোহিঙ্গারা শহরের আশেপাশে চলে আসছে অথবা পূর্বে আসা তাদের আত্বীয় স্বজন নতুন রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসছে এতে তাদের থাকার ঘরের জন্য নতুন করে পাহাড় কাটছে এভাবে শহরের বেশির ভাগ পাহাড় কাটা পড়ছে। তাই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান সহ পাহাড় কর্তনকারীদের তাৎক্ষনিক ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে একই সাথে এর সাথে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

এ ব্যপারে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাহজাহান আলী বলেন,জেলা ব্যাপী পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ড বাড়ছে সেটা খুবই দুঃখ জনক। আমরা ইতি মধ্যে উপজেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত পাহাড় কাটা সহ পরিবেশ নষ্ট করে এমন কাজ বন্ধ করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি। ইতি মধ্যে আপনারা দেখেছেন অনেক উপজেলার ইউএনওরা গভীর রাতেও অভিযান চালাচ্ছে। ভবিষ্যতে অভিযান আরো জোরদার করা সহ প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি প্রদান করা হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads