কাণ্ডারিবিহীন প্রায় এক যুগ পার করল বিএনপি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় নানামুখী কারণে এলোমেলো হয়ে পড়েছে দলটি। রাজনৈতিক দাবি আর দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চয় করতে এবার মাঠে নেমেছে বিএনপি। ব্যক্তিস্বার্থ আর বাধা উপেক্ষা করে ঘর থেকে রাজপথে মাঠে আসতে শুরু করেছে দলটির তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। ফেরারি থেকে তারা এখন মাঠে-ময়দানে। বিষয়টি নিয়ে তদারকি করছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ইতোমধ্যে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ছাত্রদলের কমিটি গঠনসহ সারা দেশে ছয়টি সমাবেশের মধ্য দিয়ে।
বিএনপিপন্থি বোদ্ধাদের হিসাব-নিকাশে বলে রাজনীতির সুদূরপ্রসারী চিন্তাকে মাথায় রেখে দুই ফসল এক করতে পারলেই দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, ক্ষমতাসীনদের অতীত ও বিরাজমান নেতিবাচক কর্মের ফসলকে ব্যাপকভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা আর অন্যটি ঝুঁকি নিয়ে সফল আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলা। এই দুটির যোগফলই তাদের দলীয় প্রধানকে কাছে এনে দিতে পারে-এমন ভাবনা বিএনপি ও তাদের মিত্র দলগুলোর শীর্ষ নেতাদেরও।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার কারাবন্দির ৬০০ দিন পার হলো। নানামুখী রোগে আক্রান্ত হয়ে দিনে দিনে গুরুতর অবস্থার দিকে যাচ্ছেন কারাবন্দি খালেদা জিয়া। বিএনপি ও খালেদা জিয়া তার পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য বারবার আবেদন করলেও তাতে সায় দিচ্ছে না সরকার। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে না-এমনটি স্পষ্ট করেছেন তার আইনজীবীরা।
অন্যদিকে তার মুক্তির জন্য বিএনপি এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। যে আন্দোলনের চাপে সরকার তাদের দলীয় প্রধানকে জামিনে মুক্তির চিন্তা করবে। খালেদা জিয়ার মুক্তি আর মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে কিছু কর্মসূচি পালন করেছে তাতে সরকারের টনক নাড়াতে পারেনি। বরং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের প্রচার-প্রকাশনাবিষয়ক সম্পাদক তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদসহ দলটির অনেক সিনিয়র নেতাই বলেছেন, বিএনপি এমন কী পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পেরেছে বা দেশে এমন কী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে যে এতিমের লুটের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে আর মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে হবে? উল্টো দলীয় প্রধানের মুক্তির ইচ্ছাশক্তি নিয়ে বিএনপি নেতাদের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন তারা।
আলাপকালে বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক বাংলাদেশের খবরকে জানান, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ করে বিএনপি সুদূরপ্রসারী চিন্তা নিয়ে এগোচ্ছে। সুশৃঙ্খল সংগঠন, দলীয় কাউন্সিল আর যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে তারা আগামী দিনে আন্দোলন করতে চায়। কারণ আইনি লড়াইয়ে বিএনপি-প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে না-এ বার্তা তাদের কাছে স্পষ্ট। রাজপথে আন্দোলনের বিকল্প নেই।
গত জুলাই থেকে দেশের আট বিভাগে সমাবেশের সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। শুরু করে খুলনা বিভাগ দিয়ে। পরে বরিশাল, চট্টগ্রাম সমাবেশ করার পর দেশে ডেঙ্গু মহামারী আকার ধারণ করায় সমাবেশ স্থগিত করে। ফের সমাবেশ শুরু করেছে সিলেট বিভাগ দিয়ে। ময়মনসিংহের পর গত রোববার রাজশাহীতে সমাবেশ করেছে বিএনপি। এসব সমাবেশে জনতার ঢল দেখা গেছে। তাতে উজ্জীবিত হয়েছে নেতার-কর্মীরা। বিভাগীয় সমাবেশের পর ঢাকায় সমাবেশ করে আগামী ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্ত আন্দোলনের চিন্তাভাবনা করছে নীতিনির্ধারকরা। ছাত্রদলসহ দলের বেশ কয়েকটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠন করেছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের বাসাবাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হচ্ছে। এ টাকা দুর্নীতি, লুটপাটের। সুইস ব্যাংকে তাদের দলীয় নেতা-মন্ত্রী-এমপিদের হিসাব রয়েছে। তাদের কিছুই হচ্ছে না। অন্যদিকে টাকার জায়গায় টাকা আছে, দুই কোটি টাকা বেড়ে ছয় কোটি হয়েছে। টাকা চোখে যিনি দেখেনইনি সেই খালেদা জিয়া আজ ২০ মাস ধরে কারাগারে। তাহলে বোঝার বাকি নেই নেত্রীর মুক্তির জন্য রাজপথের বিকল্প নেই। সারা দেশে মাত্র ছয়টি সমাবেশ হয়েছে তাতে জনতা জেগে উঠেছে। বিএনপির নেতারা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করলে আওয়ামী লীগকে ঘরে পাঠানো সম্ভব।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেন, সারা দেশে এক লাখ মামলায় বিএনপির প্রায় ১৬-১৭ লাখের বেশি নেতা-কর্মী আসামি। মামলার টাকা জোগাড় করতে না পেরে অনেকেই ফেরারি জীবনযাপন করছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা যখন মাঠে নেমেছে, কর্মীদের ডাক দিয়েছে, তখন সব ভীতি উপেক্ষা করে তারা রাস্তায় নেমে আসছে।
বিএনপিপন্থি বোদ্ধাখ্যাত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বিএনপি সাহস করে রাস্তায় নামলে দেশের ক্ষুব্ধ জনগণ তাদের সঙ্গে নেমে আসবে। বিএনপির প্রতি তার পরামর্শ, বর্তমান সরকারের অনিয়ম, দুর্নীতির চিত্র জনগণের কাছে তুলে ধরতে হবে। জনগণের ক্ষোভকে পুঁজি করে আন্দোলনের মাধ্যমে বড় ধরনের ধাক্কা দিলে সরকারের পতন অনিবার্য বলে মনে করেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।





