রাজাকারের তালিকা প্রত্যাহার

প্রতীকী ছবি

জাতীয়

রাজাকারের তালিকা প্রত্যাহার

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৯

অবশেষে ত্রুটিপূর্ণ রাজাকারের তালিকা স্থগিত করেছে সরকার। একই সঙ্গে তালিকা সংশোধন করে আগামী বছরের ২৬ মার্চ নতুন করে এটি প্রকাশ করার কথা জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে তালিকাটি সরিয়ে নেওয়া হয়। গত ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার সপক্ষের অনেকের নাম এ তালিকায় আসায় তুমুল বির্তক শুরু হয়।

বিজয় দিবসের প্রাক্কালে ১০ হাজার ৭৮৯ রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর তালিকা ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এসব নাম প্রকাশ করা হয়। এরপর থেকে নানা ত্রুটিবিচ্যুতি বেরিয়ে আসতে থাকে। অবশেষে গতকাল বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত তালিকা প্রত্যাহারের কথা জানায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে তালিকা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য এসেছে সরকারের পক্ষ থেকে। 

এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা যাচাই-বাছাই ও সংশোধনের পর নতুন করে প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। গতকাল বুধবার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, এ বিষয়টা আমাদের নজরে এসেছে এবং এ বিষয়টি আমাদের নেত্রী এরই মধ্যে জানেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে ভুল সংশোধনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আমাদের নেত্রীও তাদের যাচাই-বাছাই করে এখানে যেন ভুল-ভ্রান্তি না থাকে, ভুল-ভ্রান্তি থাকলে সংশোধন করে তালিকা প্রকাশের নির্দেশনা দিয়েছেন।

অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে রাজাকার, আলবদর, আলশামসের তালিকা দেওয়া হয়নি। দালাল আইনে অভিযুক্তদের তালিকা দেওয়া হয়েছে। গতকাল সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক রাজাকারের তালিকায় ত্রুটির কথা স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এরই মধ্যে। গতকাল তিনি মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ওরা (বিএনপি-জামায়াত সরকার) ৩০ বছর ক্ষমতায় ছিল। ক্ষমতায় থাকার সময় হয়তো বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাখা কাগজপত্র কারসাজি করে রাজাকারদের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম লিখে রেখেছে। এটা আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল। সে কারণে ভুলটা হয়ে গেছে। আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।

মন্ত্রী বলেন, দুই-চারজন মুক্তিযোদ্ধার নাম রাজাকারের তালিকায় আসায় তারা দুঃখ পেয়েছেন। আমার নাম এই তালিকায় এলে যেমন কষ্ট পেতাম, তালিকায় তাদের নাম আসায় একই কষ্ট পাচ্ছি। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম থাকলে আমরা অচিরেই যাচাই-বাছাই করে সে নামগুলো প্রত্যাহার করে নেব। তবে রাজাকার, আলবদর ও আলশামসদের নাম থাকবেই। পরবর্তীতে যে তালিকা প্রকাশ করা হবে, সেগুলো জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে উদ্ধার করে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে। পরবর্তীতে আর যেন ভুল না হয়, তা আমরা যাচাই-বাছাই করে প্রকাশ করব।

প্রকাশকালে সরকারের দাবি ছিল, তালিকাভুক্ত সবাই মুক্তিযুদ্ধের সময় বেতনভোগী রাজাকার হিসেবে সরকারের নথিভুক্ত। ধাপে ধাপে আরো নাম প্রকাশ করা হবে। এদিকে তালিকা প্রকাশের পর পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, তদন্তে প্রমাণিত হলে তালিকাভুক্ত রাজাকারদের নিশ্চয়ই বিচার হবে। আমি এখনো এই তালিকা হাতে পাইনি। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্ত সংস্থা তদন্ত করে দেখবে যে কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, কাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। তারা যদি তদন্ত করে অপরাধ সংঘটনের প্রমাণাদি পায়, নিশ্চয়ই তালিকাভুক্ত রাজাকারদের বিচার হবে।

জানা যায়, একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় কয়েকটি রাজনৈতিক দল পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষ নিয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী। তখন যুদ্ধরত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে সহযোগিতা করতে রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়েছিল। আনসার বাহিনীকে এই বাহিনীতে একীভূত করা হয়েছিল এই কর্মকাণ্ডে। প্রথমে এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে গঠিত শান্তি কমিটির অধীনে থাকলেও পরে একে আধা সামরিক বাহিনীর স্বীকৃতি দিয়েছিল পাকিস্তান সরকার। একই রকম আধা সামরিক বাহিনী ছিল আলবদর বাহিনী ও আলশামস বাহিনী। তবে স্বাধীনতাবিরোধী এই বাহিনীগুলোকে সাধারণ অর্থে ‘রাজাকার বাহিনী’ হিসেবেই পরিচিত বাংলাদেশে।

প্রায় এক দশক আগে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর রাজাকারের তালিকা তৈরির দাবি জোরালো হয়। ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, রাজাকারের কোনো তালিকা সরকারের কাছে নেই। তবে তিনি বলেছিলেন, ১৯৭১ সালের খুলনায় আনসার হেডকোয়ার্টার্সে পাওয়া তালিকায় ৩০ হাজারের বেশি রাজাকারের তথ্য মিলেছিল। ওই তালিকাটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রয়েছে।

এরপর গত ২৫ অগাস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহে কাজ শুরু হওয়ার কথা জানানো হয়। ১৯৭১ সালের বেতনভোগী রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহের জন্য চলতি বছর ২১ মে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) চিঠি পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। পরে ওই তালিকা করার জন্য কয়েক দফা তাগিদ দেওয়া হয়।

কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য শাজাহান খান সে সময় সাংবাদিকদের বলেন, তালিকা হাতে আসা শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, এই ১৬ ডিসেম্বর থেকে যতটুকু আসবে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে।

বিজয় দিবসের আগের দিন ৬৫৯ পৃষ্ঠার প্রথম তালিকা প্রকাশ করতে এসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় অনেক নথি সুকৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে পরিপূর্ণ তালিকা পাওয়া কঠিন হচ্ছে।

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads