মুক্তমত

মহামারীতে বেড়েছে অতিদরিদ্রের হার

  • প্রকাশিত ১৭ মে, ২০২১

মো. রাফছান

 

 

এক নিদারুণ পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা, ভবিষ্যৎ নয়- চারদিকে শুধু বেঁচে থাকার হাপিত্যেশ! আইসিইউ নেই, চিকিৎসক সংকট, ভালো হাসপাতাল নেই, উন্নত চিকিৎসার জন্য সাধারণের নেই প্রয়োজনীয় অর্থ। এরকম হাজার নাই-এর মধ্য দিয়ে দ্রুতবেগে এগিয়ে চলেছে করোনায় মৃত্যুর মিছিল, ক্রমাগত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে লাশের সারি। সবকিছুর বিনিময়েও জীবননাশী করোনা ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। পর্যাপ্ত অক্সিজেন আর সঠিক চিকিৎসার অভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অতি সহজেই মৃত্যুকে আপন করে নিচ্ছে অসহায় মানুষ। উন্নত আইসিইউ, প্রশিক্ষিত ডাক্তারদের চোখের সামনেই মানুষ মারা যাচ্ছে একের পর এক। কি অবলীলায় একের পর এক ব্যর্থ হচ্ছে করোনাভাইরাস মোকাবিলার হাজারও প্রচেষ্টা। মৃত্যুর সংখ্যায় হ্রাস টানতে যথেষ্ট হচ্ছে না ভ্যাকসিনেশন কিংবা কঠোর লকডাউনও। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে রোগাক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমে এলেও এই মহামারী এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে ভারতের দিল্লিতে করোনা মহামারীর প্রকোপে প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছে ২ হাজারেরও বেশি মানুষ। মৃতের সংখ্যা প্রায় ১২ হাজারে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশেও। চীনের করোনা ভ্যাকসিন দেশে আসার কথা রয়েছে খুব শিগগির।

করোনার ভয়াবহতায় গত বছরের ২৬ মার্চ থেকেই দেশে আনুষ্ঠানিক লকডাউনের শুরু, সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে। সংকট মোকাবিলায় মে মাসের শেষের দিকেই তুলে দেওয়া হয়েছিল লকডাউন, স্বল্প পরিসরে খুলে দেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন ধরনের গার্মেন্টসহ সব ধরনের সরকারি দপ্তর। করোনার প্রকোপে বার বার লকডাউন দেওয়া এবং তুলে নেওয়ার মাঝেই পেরিয়ে গেছে পুরো একটি বছর। অস্থিতিশীল অবস্থা মোকাবিলায় করোনার বিস্তার কমাতে ১৪ এপ্রিল থেকে পুনরায় ঘোষণা করা হয়েছে সাত দিনের ‘কঠোর লকডাউন’। এ সময় জরুরি সেবা ব্যতীত সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিতসহ সব ধরনের অফিসের পাশাপাশি কল কারখানা ও যান চলাচল বন্ধ থাকবে। করোনা পরিস্থিতির অবনতির দরুন ফের বেড়েছে লকডাউনের দৈর্ঘ্য। মন্ত্রিপরিষদের এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী লকডাউন তথা বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে আগামী ১৬ মে মধ্যরাত পর্যন্ত। এই লকডাউনে জেলার মধ্যে গণপরিবহন চলবে বৃহস্পতিবার, ৬ মে থেকে। এই সময় বন্ধ থাকবে আন্তঃজেলা বাস, বন্ধ থাকবে ট্রেন, লঞ্চও। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আগের মতোই শিল্প-কারখানা, দোকান ও শপিংমল খোলা থাকবে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, স্বাস্থ্যবিধি না মানা হলে বন্ধ করে দেওয়া হবে মার্কেট কিংবা শপিংমল। এছাড়া জরুরি সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান ছাড়া যথারীতি বন্ধ থাকবে সরকারি-বেসরকারি অফিসও। সীমিত পরিসরে ব্যাংকে লেনদেন করা যাবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত।

সবকিছু উপেক্ষা করে একপ্রকার বাধ্য হয়েই পেটের দায়ে জীবন হাতে নিয়ে জনশূন্য শহরের এদিক-ওদিক ছুটছে একদল খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। দীর্ঘসময় ধরে চলমান কঠোর লকডাউন আর করোনার অস্থিতিশীলতায় চরম বিপাকে পড়েছে তারা। আর্থিক দীনতা আর প্রয়োজনীয় খাবারের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন দেশের বিভিন্ন অংশের এই চাকরিচ্যুত, খেটে খাওয়া প্রান্তিক জনগণ। চাকরি নেই, কাজ নেই, বাহিরে যাওয়ারও সুযোগ নেই, অনেকাংশেই মিলছে না সরকারি ত্রাণ কিংবা অর্থ সুবিধাটুকুও। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী করোনাভাইরাস সৃষ্ট লকডাউনের কারণে ২০২০ সালের সর্বশেষ নাগাদ অনুযায়ী, নিম্ন-আয় ও মধ্য-আয়ের দেশের প্রায় ২৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যাভাবের মুখোমুখি হয়েছে। মে মাসে প্রকাশিত ব্র্যাকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনা মহামারী কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৩৬ শতাংশ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, কাজের সুযোগ হারিয়েছেন পুরো দেশের ৬২ শতাংশ দিনমজুর। জীবন-জীবিকা পরিচালনার এই কঠিন প্রশ্নে পিছলে গেছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভীত। করোনা সংকটের আগে ৭.৫-৮% জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এগুচ্ছিল ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে। ফলাফল স্বরূপ দারিদ্র্যের হার কমে আসার পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন সূচকেও এসেছিল ইতিবাচক পরিবর্তন। খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুসারে, ২০১০ সালে যেখানে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ১৭.৬ শতাংশ, ২০১৬ সালের তা নেমে এসেছিলো ১২.৯ শতাংশে (প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ মানুষ)। কিন্তু সম্প্রতি ব্র্যাকের একটি জরিপে বলা হয়েছে, মহামারীর এই অস্থিতিশীলতায় অতি দারিদ্র্য বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ, লকডাউনের পর দেশে অতি দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ।

প্রকৃতির এই করুণ খেয়ালে ধসে পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি। করোনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান খাত গার্মেন্ট শিল্পে ধ্বস নেমেছে। করোনাকালীন এই দুঃসময়ে একমাত্র বৈদেশিক রেমিট্যান্সের পরিমাণই ঊর্ধ্বমুখী। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট এক হাজার ৮২০ কোটি ৩০ লাখ (১৮.২০ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসী শ্রমিকরা। যা ছিল গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি। তবে দেশীয় পরিবহন, উৎপাদন এবং রপ্তানিমুখর শিল্পেও ক্রমাগত নিম্নমুখী হচ্ছে রাজস্ব আয়ের হিসেব। তথাপিও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার শর্তে গার্মেন্টস, শিল্প খুলা রেখে ভঙ্গুর অর্থনীতির বেহাল অবস্থা দূরীকরণে পুরোদমে কাজ করছে সরকার। করোনাভাইরাসের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইতোমধ্যেই ৭২ হাজার কোটি টাকারও বেশি আর্থিক প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বর্তমান সরকার। যার মধ্যে শিল্প ঋণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ২০ হাজার কোটি, রপ্তানিমুখর শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে বরাদ্দ হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষ ও কৃষকের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি উন্নয়ন ফান্ড ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, প্রিশিপমেন্ট ঋণ ৫ হাজার কোটি টাকা, গরিব মানুষের নগদ সহায়তা ৭৬১ কোটি টাকা, অতিরিক্ত ৫০ লাখ পরিবারকে দশ টাকা কেজিতে চাল দেওয়ার জন্য ৮৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় স্বাস্থ্যখাতে অতিরিক্ত ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

করোনায় আতঙ্কিত নয়, সতর্ক হওয়া প্রয়োজন আমাদের করণীয় কর্মকাণ্ডে, কর্তব্যে, প্রয়োজনে। জেনে নেওয়া দরকার সঠিক করণীয় কিংবা কোনটা করা উচিত। সর্বত্র মাস্ক ও স্যানিটাইজার ব্যবহার এবং সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করার পাশাপাশি মানতে হবে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সতর্কতা। সময় অসময়ের কিছু পছন্দ, শখ, আর ভালো লাগার বলিদান দিতে হবে মানবতার প্রয়োজনে। আত্মসাৎ, স্বার্থসিদ্ধি, চাটুকার, অপচয়, হিংসার নষ্টামি বন্ধ করে করোনা মোকাবেলায় আমাদের কাজ করতে হবে হাতে হাতে। ধনী-গরিব আর বর্ণবৈষম্য ভুলে হাঁটতে হবে সমবায়, সমান, সমতার পথে। করোনার এই ক্রান্তিপর্বে ডানা মেলুক বেঁচে থাকার নতুন কোনো দুর্বোধ্য সমীকরণ। বিবেকের আইসিইউতে আরো একবার পরিশুদ্ধ হোক কৃষ্ণকায় নষ্ট হূদয়। লকডাউনের এই দুর্বিষহ করুণ সময় নতুন করে জানতে শিখাক প্রয়োজনবোধ, শিখিয়ে দিক অস্থিতিশীল দুরবস্থায় টিকে থাকার কোনো অভাবনীয় কলাকৌশল। দুঃসময় পেরিয়ে বেঁচে থাকুক নির্বিবাদী, সত্যনিষ্ঠ অসহায় প্রতিবেশী সমাজ।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, মেরিন সায়েন্স

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads