ফিচার

ভিগানেলা : সূর্য যেখানে আয়নার প্রতিবিম্ব

  • ফিচার ডেস্ক
  • প্রকাশিত ১১ জুলাই, ২০২১

এমন একটি গ্রামে কে থাকতে পারে যে গ্রামে সূর্যের আলো দেখা যায় না? যদিও কেউ থেকেও থাকে তবে তারা কারা? অন্ধকারাচ্ছন্ন সেই গ্রামে থাকেন ইতালীয়-জার্মান বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা, আর সেই গ্রামের নাম ভিগানেলা।

গ্রামটি উপত্যকার গভীরে অবস্থিত হওয়ায় ওই এলাকার বাসিন্দারা কখনই সূর্যের আলো সরাসরি দেখতে পায় না। তাহলে কীভাবে সূর্যের আলো ওই গ্রামে প্রবেশ করে? চলুন জেনে নেওয়া যাক সেই সম্পর্কে। ভিগানেলা। ইতালির মধ্যে অবিস্থত ছোট্ট একটি গ্রাম যা মিলানের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার উত্তরে একটি গভীর উপত্যকার নিচে অবস্থিত। প্রায় আটশো বছর আগে এর গোড়াপত্তন হয়েছিল। কিন্তু সেখানে নিকটবর্তী খাড়া পাহাড়গুলো ১৬০০ মিটার উঁচু হওয়ার কারণে প্রতিবছর ছয় মাস পর্যন্ত সূর্যের আলো সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। বেশিরভাগ সময় দেখা যায় বছরের ১১ নভেম্বর থেকে সূর্য সর্ম্পূণভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। সেই সময়ে গ্রামটি অনেকটা সাইবেরিয়ার মতো হয়ে যায়। ওই গ্রামের লোকেরা কয়েক শতাব্দী ধরে এই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলেন। গ্রামবাসী সূর্যের আলো প্রবেশ করানোর জন্য কিছু বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করলেও সমস্যাটির স্থায়ী কোনো সমাধান খুঁজে পায়নি।

দীর্ঘদিন সূর্যের আলো না থাকায় তারা জমিতে কোনো চাষাবাদ করতে পারেন না। এতে তাদের খাদ্যের সঙ্কট সৃষ্টি হয়। ফলে তারা সে সময়টিতে মানবেতর জীবনযাপন করে থাকেন। অন্ধকার ওই মাসগুলোকে আলোকিত করার জন্য এক স্থানীয় প্রকৌশলী এক চমৎকার ধারণা নিয়ে আসেন। ধারণটি হলো গ্রামে সূর্যের আলো প্রতিবিম্বিত করে এমন এক আয়না স্থাপন করা। যা নিজস্ব সূর্যের মতো পুরো গ্রামটিকে আলোকিত করতে পারে। পরবর্তীতে ভিগানেলা নিজেদের অন্ধকার মুক্ত করার জন্য ২০০৬ সালে তার বিশাল কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত আয়নাটি তৈরি সম্পন্ন করেছিল। ভিগানেলারের মেয়র পিয়েরফ্র্যাঙ্কো মিডালির সহায়তায়, ২০০৫ সালে ১০ লাখ ইউরো ব্যয় করে আয়নাটি তৈরির কাজ শুরু করা হয়েছিল। আয়নাটি ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে তৈরি কাজ সর্ম্পূণ হয়। আয়নাটি আয়তনে ৪০ বর্গমিটার ও ওজনের ১.১ টন। সূর্যের আলো প্রবেশের জন্য আয়নাটিকে একটি পবর্তের ১ হাজার ১০০ মিটার উচ্চতায় স্থাপন করা হয়েছিল। যদিও পুরো গ্রামটিকে আলোকিত করার জন্য আয়নাটি ছিল খুব ছোট। আয়নাটি কম্পিউটার চালিত হওয়ায় সারা দিন সূর্যের পথ অনুসরণ করে ও সূর্যের আলোর প্রতিফলন ঘটায়। আয়নাটি প্রতিদিন অন্তত ছয় ঘণ্টার জন্য আড়াইশো বর্গমিটার অঞ্চল আলোকিত করে। এটি স্থাপনের পর ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের মেজাজ এবং আচরণের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ইতালির অ্যান্ত্রোনা উপত্যকা পেড়িয়ে ভিগানেলায় প্রবেশ করতে গেলেই দেখা যায় একটি সুবিশাল ব্যানার। যেখানে লেখা ‘ভিগানেলা ভি দা ইলে বেনভেন্তো’ যার অর্থ, ভিগানেলায় আপনাকে স্বাগত।

২০০৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর ভিগানেলায় সূর্যের আলো প্রতিবিম্বিত করার জন্য নিকটবর্তী পর্বত চূড়ায় অবস্থিত বিশালাকার আয়নাটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে ওই গ্রামের লোকেরা দিনটিকে ‘আলোর দিন’ হিসেবে  উদযাপন করেন। আয়নাটি স্থাপনের আগে ভিগানেলার দুই শতাধিক বাসিন্দা নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সূর্যের অভাবে অন্ধকারে নানা সমস্যায় ভুগতেন। তবে কম্পিউটারের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত আট বাই ছয় মিটার স্টিলের শীটটি এখন শীতের সময় সূর্যের রশ্মি প্রতিফলিত করে। প্রতিটি আয়না হিলিওস্ট্যাটস, কম্পিউটারচালিত মোটর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তারা দিগন্তজুড়ে সূর্যের গতিপথ ট্র্যাক করে। প্রতিবিম্বিত আলো যতটা সম্ভব সামঞ্জস্য রাখতে নিয়মিত আয়নাগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়।

প্রাচীন মধ্যযুগীয় নিজস্ব সূর্যের গ্রাম ভিগানেলা অত্যন্ত সুন্দরতম স্থান। এই গ্রামের গেট এবং পুরানো কেন্দ্রটি অসাধারণ। এখানে আপনি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ওয়াইন দেখতে পাবেন। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম, কারণ ভিগানেলাবাসী তার ভূমিকে সম্মান করে। তবে নিজস্ব তৈরিকৃত সূর্যের কারণে এটি অন্য দেশের চেয়ে ভিন্ন ও আকষর্ণীয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads