নরসিংদী শহরের বীরপুর এলাকায় দু’চালা টিনের ঘরে বাস তাদের। অধিকাংশের পেশাই অটো, সিএনজি অটোরিক্সা চালক, গৃহপরিচায়ক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে কর্মহীন হয়ে কষ্টে দিনাতিপাত করা নিম্ন আয়ের সেইসব মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে খাদ্য ও ওষুধ সহায়তা দিচ্ছেন এক তরুণ ব্যাংকার। অভাবের দিনে এই সহযোগিতা তাদের কাছে বাঁচার অবলম্বন।
বাড়ি বাড়ি ঘুরে খাদ্য ওষুধ সহায়তা দেয়া সেই তরুণের নাম আবদুল্লাহ আল মামুন রাসেল। সে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের নরসিংদী শাখার কর্মকর্তা। রাসেল নরসিংদী শহরের পূর্ব ব্রাহ্মন্দী এলাকার গোলাম হোসেন ছেলে।
দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর গত ২৮ মার্চ থেকে রাসেলের এই মহৎ উদ্যোগ চলছে। রাসেলের এমন উদ্যোগে হাসি ফুটেছে ৫০০ গরীব ও দুস্থ পরিবারের। জরুরি ওষুধসহ খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ৫ কেজি চাল, এক কেজি আলু, এক লিটার তেল, এক কেজি ডাল, এক কেজি পেঁয়াজ, একটি ডেটল সাবান ও একটি মাস্ক।
মঙ্গলবার সকালে শহরের বীরপুরে হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল পরিবারের মধ্যে জরুরি ওষুধ সামগ্রী বিতরণ করেন আবদুল্লাহ আল মামুন রাসেল। ওই সময় আবদুল্লাহ আল মামুন রাসেলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছাত্রাবস্থায় থেকেই সে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এরই ফলশ্রুতিতে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত হন। অসহায় মানুষের জন্য তাঁর মন সব সময় কাঁদে। এজন্য চাকরি হওয়ার পর থেকে অসহায় মানুষের জন্য বেতনের কিছু টাকা আলাদা করেই রাখেন রাসেল। প্রয়োজনে বন্ধুদের সহযোগীতা নেন। ইতিমধ্যে নরসিংদী রেল স্ট্রেশনের ছিন্নমূল শিশুদের ভিক্ষা বৃত্তি থেকে দূর করতে পাঠশালা চালু করেছে।
এবার সারাবিশ্বের ন্যায় দেশে প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের প্রার্দুভাব দেখা দিলে সরকার ঝুঁকি মোকাবেলায় ও জরুরি সুরক্ষায় সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গণজমায়েত, গণপরিবহন এবং জনসাধারণ চলাচল বন্ধ করে দেয়। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে নিম্ম আয়ের মানুষ। তাদের কষ্টের কথা ভাবায় তরুণ রাসেলকে। এরই ফলশ্রুতিতে নিজের বেতনের জমানো ৬০ হাজার টাকা নিয়ে তাদেরকে খাদ্য সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তার সঙ্গে যোগ হয় বড় ও ছোট দুই বোন, বোন জামাতা ও বন্ধুদের সহযোগীতা।
গত ২৮ মার্চ থেকে শুরু হয় হতদরিদ্র মানুষদের মধ্যে রাসেলের খাদ্য সহযোগিতা বিতরণ। এক্ষেত্রে সে প্রথমেই বেঁচে নেয় রিক্সা ও ভ্যান চালককে। পরবর্তীতে তা হাজিপুর, দত্তপাড়া, বীরপুর, দাসপাড়া, পূর্ব ব্রাহ্মন্দী ও নামা পাড়া, ভরতেরকান্দীর বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার অসহায় মানুষ ও পথ শিশুদের মধ্যে বিস্তৃত হয়।
সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে ও জনসমাগম এড়াতে রাসেল বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করছেন। রাসেলের এমন উদ্যোগে হাসি ফুটেছে ৫০০ গরীব ও দুস্থ পরিবারের।
রাসেলের দেয়া খাদ্য সামগ্রী পাওয়া অটো রিক্সাচালক জাকির মিয়া বলেন, করোনার কারণে ৩ সপ্তাহ যাবত ঘর থেকে বের হতে পারি না। রুটি-রোজগার বন্ধ হওয়ায় ভীষণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। রাসেল ভাইয়ের ত্রাণ পেয়ে আগামী কয়েকটা দিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে চলতে পারবো। সবাই যদি রাসেল ভাইয়ের মতো মন নিয়ে সবাই গরীবদের সাহায্য করতো তাহলে এই করোনা দুর্যোগে কোনো মানুষ খাবার জন্য কষ্ট পেত না।
দীর্ঘদিন রাসেলকে কাছ থেকে দেখেছেন ব্রাহ্মন্দী এলাকার ফেমাস ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষ মো. হানিফা। তিনি বলেন, সে একজন দক্ষ সংগঠক ও প্রগতিশীল লোক। সাংস্কৃতিক ও সেবামূলক কাজে তাঁর ভূমিকা অন্য তরুণদের উৎসাহিত করছে।
জানতে চাইলে আবদুল্লাহ আল মামুন রাসেল বলেন, গরীব ও অসহায় মানুষের কষ্ট আমাকে সব সময় ভাবায়। তাই সব সময় চেষ্টা করি নিজের অবস্থান থেকে তাদের পাশে দাঁড়াতে। বর্তমানে সারাদেশে প্রাণঘাতি করোনার যে সংকট চলছে প্রত্যেকের নিজের অবস্থান থেকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাহলেই অর্থের অভাবে কাউকে না খেয়ে থাকতে হবেনা। করোনা সংকটে হতদরিদ্রদের খাদ্য জোগাতে আমার এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।





