কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
দিনে সুনসান নিরবতা, রাত হলেই ড্রাম ট্রাকে করে বালু লুটের মহোৎসব চলছে। গভীর রাতে এভাবেই সরকারি বালু হরিলুট করছে একদল বালুদস্যু। তাও আবার নদীর উপরে রাস্তা তৈরি করে। নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার চাঁদখানা-বাহাগিলী সন্ন্যাসীপাড়া সংলগ্ন নদী থেকে এভাবেই রাতে বালু লুটের মহোৎসবে মেতেছে একদল বালু দস্যুরা।
সরেজমিনে গত রবিবার রাতে দূর থেকে দেখা যায় বৈদ্যুতিক বাতির আলোয় আলোকিত এলাকাটি। যান্ত্রিক শব্দ হচ্ছে আর কিছু প্যান্ট পরিহিত ব্যক্তি চলাচল করছে। আর ভেকু বালু উত্তোলনে ব্যস্ত। প্রায় ৮টি ড্রাম্প ট্রাক বালু বহনের জন্য সারিবদ্ধ। দেখে মনে হবে কোন বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। আরও কাছে গিয়ে দেখা যায়- নদী এলাকায় একটি টিনের ঘর করা হয়েছে। সেখানে সাগর নামে একজন খাতায় লিখছে কয়টি ড্রাম্প ট্রাক বালু নিয়ে যাচ্ছে, তার হিসাব। আর একটু দূরেই গেলে দেখা যায়- ভেকু দিয়ে ড্রাম্প ট্রাকে বালু তোলা হচ্ছে। বালু ভর্তি হলেই ড্রাম্প ট্রাকটি ছুটছে তার গন্তব্য এলাকায়। সেখানে আরও ৮টি ড্রাম্প ট্রাক বালু বহনে সারিবদ্ধ রয়েছে। এভাবেই গভীর রাতে সন্ন্যাসীপাড়া সংলগ্ন নদী থেকে বালু হরিলুটের মহোৎসব চলছে।
অন্যদিকে নদীর উপরে তৈরি করা হয়েছে একটি রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন রাতে ড্রাম্প ট্রাক করে বালু দস্যুরা বালুগুলো বহন করছে। এসময় স্থানীয় সাংবাদিকরা তাদের ওই টিনের ঘরে গিয়ে পরিচয় দিলে বালু লুটের দায়িত্বে থাকা সাগর নামের লোকটি অপর আরও দুই জন বালু কেনার একটি ট্রেজারি চালানের কপি দেখান। এসময় বালু উত্তোলনের কার্যাদেশ দেখতে চাইলে সাগর বলেন- এ বালুগুলো রিপন নামে একজন কিনেছে। তার কাছ থেকে আমি কিনেছি। রিপন আবার মোজাহিদুল ইসলাম সুরুজ নামে একজনের কাছে এ বালুর লট কিনে নিয়েছেন। তাই কার্যাদেশটি আমি এখনও নেইনি। আবার পরেই বলছে আমি ভুল বশতঃ কার্যাদেশের কপি বাসায় রেখে এসেছি। এরকম অসংলগ্ন আচারণে সন্দেহ হলে খোঁজ নিয়ে জানা যায় সরকারি এ বালুর লটটির কোন কার্যাদেশ দেয়া হয়নি। মোজাহিদুল ইসলাম সুরুজের নামে একটি চালান দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এ বালু দস্যুরা জনগণের চোখে বালু দিয়ে সরকারি বালু লুটের মহোৎসবে মেতেছে।
এসময় স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকদের জানান- আমাদের চাষাবাদের জমি নষ্ট করছে ড্রাম্প ট্রাকগুলো। এছাড়া তারা আমাদের জমি থেকেও বালু উত্তোলন করছে। তারা বেশ প্রভাবশালী হওয়ায় আমরা আমাদের চাষাবাদের জমি গুলো নিয়ে চিন্তিত। তারা গভীর রাতে এ বালু গুলো নিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে সোমবার বিকালে বালু লুটের এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেকা যায়- একটি ভেকু টিন সেটের পাশে ঘুমাচ্ছে। চারদিকে বৈদ্যুতিক তার। নদীর মাঝ দিয়ে একটি রাস্তা। এলাকাটি জনশূন্য। কিন্তু রাত যতই গভীর হয় তখন ভেকুটির ঘুম ভাঙ্গে আর বালু তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ট্রাম্প ট্রাকের সারি বাঁধে এলাকাটিতে। এভাবেই প্রতিদিন রাতে সরকারি বালু কৌশলে লুট করছে এ বালু দস্যুরা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়- কিশোরগঞ্জ উপজেলাধীন নদনদী, খালবিল ও সরকারি জলাশয়ে খননকৃত বালি ও মাটি নিলামে বিক্রয়ের নোটিশ প্রদান করা হয়। ২০২৩ সালের ১৮ জুলাই উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের ৭৪৬ নং স্মারকে নোটিশটি জারী করা হয়। এতে মোজাহিদুল ইসলাম সুরুজ নামের একজন চাঁদখানা-বাহাগিলী সন্ন্যাসীপাড়া সংলগ্ন কয়েকটি স্থানে স্তুপকৃত বালু নিয়ে লট নং ১৬ টেন্ডারে পায়। তবে তিনি নিয়ম মেনে ট্রেজারি চালান না দেয়ায় তাকে কার্যাদেশ দেয়া হয়নি। ফলে ওই স্থান থেকে বালু তোলা অবৈধ। সরকারি শর্তমতে রাতে বালু উত্তোলন করা যাবে না। এছাড়া ট্রাম্প ট্রাক চলাচল নিষেধ রয়েছে।
এ ব্যাপারে মোজাহিদুল ইসলাম সুরুজের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান- কিশোরগঞ্জ উপজেলাধীন নদনদী, খালবিল ও সরকারি জলাশয়ে খননকৃত বালি ও মাটি নিলামে বিক্রয় হয়। আমি ১৬ নং লটটি টেন্ডারে পেয়েছি। তবে আমাকে এখনও কোন কার্যাদেশ দেয়া হয়নি। লটটি আমি রিপন ও সাগর নামে দুই জন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেছি। তাদের কাছ থেকে কিছু টাকাও নিয়েছি।
অন্যদিকে গভীর রাতে বালু তোলার নিয়ম নেই, স্থানীয় রাস্তায় ড্রাম্প ট্রাক চলাচল নিষেধ থাকা সত্ত্বেও রাতে বালু তুলছেন আর ড্রাম্প ট্রাক চালাচ্ছেন কিভাবে মুঠোফোনে এ প্রশ্নে সাগর জানান অনমুতি রয়েছে। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে কার্যাদেশ দেখতে চাইলে কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। তিনি আরও বলেন- কার্যাদেশ অনুযায়ী এখনও ৩ মাস সময় রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- এ এলাকায় স্তুপকৃত বালুর লটের কোন কার্যাদেশ দেয়া হয়নি। বালু দস্যুরা ট্রেজারি চালানটিকে পুঁজি করে অবৈধভাবে বালু লুটের উৎসবে মেতেছে। এজন্য দিনের বেলায় এলাকাটি সুনসান থাকলেও, রাতের বেলায় বালু লুটে মাতোয়ারা হয় উঠেছে ওই বালু দস্যুরা। প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিতেই ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে বালু দস্যুরা বালু লুটের মহোৎসবে মেতেছেন।
অপরদিকে বালু দস্যুরা সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিতেই কৌশল করে গভীর রাতে বালু লুট করছে বলে অনেকেই জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এম এম আশিক রেজার সাথে কথা হলে তিনি জানান- চাঁদখানা-বাহাগিলী সন্ন্যাসীপাড়া সংলগ্ন বালু স্তুপ নিয়ে ১৬ নং লটটির কোন কার্যাদেশ দেয়া হয়নি। ওই এলাকা থেকে গভীর রাতে বালু লুটের মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। আমি ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বিষয়টি জানিয়েছি। এছাড়া আমি থানায় বিষয়টি অবহিত করেছি। থানাও এরকম অভিযোগ পেয়েছে যে রাতে কিছু অসাধু লোকজন ড্রাম্প ট্রাকে করে বালু লুট করছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে ।





