জাতীয়

ফের বেপরোয়া কুকি-চিন

  • প্রকাশিত ৪ এপ্রিল, ২০২৪

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে নতুন সশস্ত্রগোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। অশান্ত হয়ে উঠছে পাহাড়ি এলাকা। নিজেদের নতুনকরে জানান দিতে গত দুই দিনে তিনটি ব্যাংকে হামলা করেছে সশস্ত্র কুকি-চিনের সদস্যরা। এই হামলার তিন সপ্তাহ আগে এক ফেসবুক পেজ থেকে বদলা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল পাহাড়ি বিচ্ছিন্নবাদী এই সংগঠন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক কুকি-চিনের দুই সদস্যকে আটকের প্রতিবাদে তারা এ ঘোষণা দিয়েছিল বলে জানা গেছে।

বান্দরবানের রুমায় সোনালী ব্যাংকে ডাকাতির সময়ে নামাজ পড়তে থাকা ব্যাংকটির ম্যানেজার শাখা ব্যবস্থাপক নিজাম উদ্দিনকেও তুলে নেওয়া হয়েছে। এর ঠিক ১৬ ঘণ্টা পর গতকাল বেলা ১টার দিকে থানচির সোনালী ও কৃষি ব্যাংকে ডাকাতি হয়েছে। এর আগে তারা একটি বিদ্যুৎ সাব স্টেশন ও উপজেলা কার্যালয় থেকে অস্ত্র লুট করে। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বান্দরবানের ছয়টি উপজেলার সকল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, হঠাৎ করে শুনলাম পাহাড়ে ব্যাংক ডাকাতির একটা প্রচেষ্টা হয়েছে। আমাদের কাছে যা তথ্য আসছে কুকি-চিন যে গ্রুপটি রয়েছে, যারা আগেও বান্দরবানে একটি জায়গায় অবস্থান করে জঙ্গি বাহিনীর সঙ্গে আঁতাত করে একটা ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। র‌্যাব ও আর্মি সেই ঘাঁটি সরিয়ে দিয়েছে। ইদানীং কুকি-চিন আবার বিভিন্নভাবে তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আইজিপি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে অবস্থান করছেন। রুমাতে সোনালী

ব্যাংকে ঢোকার আগে বৈদ্যুতিক যে সাব-স্টেশন ছিল সেটাকে বন্ধ করে তারা ব্যাংকের দিকে অগ্রসর হন। সেখানে পুলিশ মোতায়েন ছিল। পুলিশ ও ব্যাংকের ম্যানেজার সবাই তারাবির নামাজে ছিল। সেই সময় তারা ঢুকে দুই পুলিশকে আহত করে দুটি এসএমজি ও আটটি চাইনিজ রাইফেল লুট করে। উপজেলা কমপ্লেক্সে আনসারদের শর্টগানগুলোও তারা নিয়ে নেয়।

তিনি বলেন, তারা সোনালী ব্যাংকের একটা ভল্ট ভাঙেন, আরেকটা মনে হয় ভাঙতে পারেনি। অফিসিয়াল নিউজ এখনও পাইনি। আমরা যতটুকু শুনেছি, তাই বলছি। সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজারকে জিম্মি করে নিয়ে গেছে। কত টাকা নিয়েছে, সেটা এখনও অফিসিয়ালি আসেনি।’

আসাদুজ্জামান খান আরও বলেন, আজকে দিনের বেলায় আমরা দেখলাম, থানছিতে কৃষি ও সোনালী ব্যাংকে আক্রমণ করেছে। এই অপারেশনটা এখনো চলছে। আমাদের পুলিশ সেখানে গোলাগুলি করছে। সেখান থেকে কত টাকা নিয়েছেন বা ক্ষয়ক্ষতি কী পরিমাণ তা এখন জানাতে পারব না। এ বিষয়ে আমাদের যা যা করার, আমরা করব। এখানে যারা জড়িত বা করেছে আমরা সবগুলোর ব্যবস্থা নেব।

সরকারের যথেষ্ট পরিমাণ ফোর্স রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সেখানে পুলিশ ও বিজিবি রয়েছে। প্রয়োজনে সেখানে সেনাবাহিনীও যাবে। আর এ বিষয়টি আমাদের কাছে একেবারে নতুন। থানছি একটি শান্তিপূর্ণ এলাকা। এটা পর্যটকদের জন্য ভ্রমণের মূল জায়গা। রুমাও শান্তিপূর্ণ জায়গা ছিল, সেখানে বেশকিছু দিন ধরে শান্তি বিরাজ করছিল। সেই জায়গা তারা কেন বেছে নিল, সেই সবকিছু দেখার বিষয় রয়েছে। এগুলো দেখে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব, ইনশাআল্লাহ।

বান্দরবানের রুমা উপজেলার সোনালী ব্যাংকের শাখা থেকে কোনো টাকা লুট হয়নি। ওই ব্যাংকের ভল্টে থাকা সব টাকা অক্ষত আছে।

গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার শাহনেওয়াজ খালেদ এ কথা জানান।

শাহনেওয়াজ খালেদ বলেন, সিআইডির চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার ইউনিটের দুটি দল রুমায় গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। পরে ব্যাংকের ভল্ট খুলে সব টাকা গুনে দেখা হয়। দেখা যায় যে মঙ্গলবার রাখা ১ কোটি ৫৯ লাখ ৪৬ হাজার টাকার পুরোটাই সেখানে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দুটি চাবি একসঙ্গে দিয়ে ভল্ট খুলতে হয়। কোনো কারণে অস্ত্রধারী ব্যাক্তিরা হয়তো ভল্ট খুলতে পারেননি।

স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানিয়েছে, কেএনএফ সদস্যরা ব্যাংকের নিরাপত্তায় থাকা পুলিশ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবনে পাহারায় থাকা আনসার সদস্যদের কাছ থেকে ২টি এসএমজি (লাইট মেশিনগান) ও ৬০টি গুলি, ৮টি চীনা রাইফেল ও ৩২০টি গুলি এবং ৪টি শটগান ও ৩৫টি কার্তুজ নিয়ে গেছেন।

বান্দরবানের রুমার পর থানচি উপজেলার দুটি ব্যাংক থেকে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিনদুপুরে ডাকাতি হয়েছে। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলা সদরের সোনালী ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকের দুই শাখায় এ ঘটনা ঘটেছে।

থানচি থানা থেকে ব্যাংক দুটির দূরত্ব ২০০ গজ। উপজেলা পরিষদের দূরত্ব ৩০০ গজ। থানার কাছে দিনদুপুরে ডাকাতির ঘটনায় স্থানীয় লোকজন হতভম্ব।

সোনালী ব্যাংক থানচি শাখার ব্যবস্থাপক ফয়সাল হুদা বলেন, অস্ত্রধারী পাঁচ থেকে সাতজন লোক ব্যাংকে ঢোকে। ক্যাশিয়ারের সামনে পাওয়া সব টাকা তারা নিয়ে নেয়। আনুমানিক ১৫ লাখ টাকা হতে পারে। ব্যাংকের বাইরে অস্ত্রধারী ১০ থেকে ১২ জন ছিল। পরে তারা ফাঁকা গুলি ছুড়ে চলে যায়।

সোনালী ব্যাংকের পাশে কৃষি ব্যাংক থানচি শাখা। এ শাখার ব্যবস্থাপক হ্লা শৈ থোয়াই বলেন, ব্যাংকে চার থেকে পাঁচজন অস্ত্রধারী ঢোকে ক্যাশিয়ারের সামনে থাকা আড়াই লাখ টাকা নিয়ে যায়। পরে তারা ফাঁকা গুলি ছুড়ে চলে যায়। এই ঘটনায় থানায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় মহম্মদ আরমান বলেন, তিনি সোনালী ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যান। বের হওয়ার সময় দেখেন অস্ত্রধারী লোকজন ব্যাংকে ঢুকছে। তারা ক্যাশিয়ারের সামনে থেকে টাকা লুট করে নিয়ে যায়।

থানচি সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অং প্রু ম্রো বলেন, বেলা একটার দিকে থানচি সদরের শাহজাহানপুরের দিক থেকে তিনটি চাঁদের গাড়িতে করে সন্ত্রাসীরা গুলি করতে করতে বাজার এলাকায় প্রবেশ করে। এরপর থানচি উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন সোনালী ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ভেতরে ঢুকে নগদ টাকা যা পেয়েছে তা নিয়ে চলে যায়। এরপর তারা আবার ওই তিন গাড়িতে করে শাহজাহানপুরের দিকে চলে যায়।

সোনালী ব্যাংক বান্দরবান অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, সোনালী ব্যাংক রুমা শাখায় ব্যবস্থাপক নিজাম উদ্দিনকে কেএনএফ সন্ত্রাসীরা নিয়ে গেছে বলে শোনা যাচ্ছে। রুমা শাখায় এক কোটি ৬০ লাখ টাকা থাকার কথা। সেগুলো ভল্ট ভেঙে নিয়ে গেছে। এই ঘটনার পর এ অঞ্চলের ব্যাংকের সব শাখায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। বান্দরবানের রুমায় নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সদস্যরা সোনালী ব্যাংকের শাখায় ডাকাতির আগে স্থানীয় মসজিদ থেকে ব্যাংকের শাখাটির ব্যবস্থাপককে ধরে নিয়ে যায়। এরপর ব্যাংকে ঢুকে ভল্টে থাকা টাকা নিয়ে যায় তারা।

রুমা উপজেলা মসজিদের ইমাম নুরুল ইসলাম বলেন, অস্ত্রধারী ২০ থেকে ২৫ জন মসজিদে ঢুকে পড়ে। তখন আমরা সবাই এশার নামাজে ছিলাম। ফরজ নামাজ শেষ করে দেখলাম সবার মুঠোফোন নিয়ে নিচ্ছে তারা।

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর চট্টগ্রামের উপ-মহাপরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ রাসেল ঘটনাস্থলে বলেন, তাদের দায়িত্বরত আটজন আনসার সদস্যের মধ্যে চারজন আহত হয়েছেন। তাদের ৪টি শটগান ও ৩৫টি গুলি লুট করে অস্ত্রধারীরা। তিনি আরও বলেন, আনসার সদস্যরা ব্যাংকের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন না। ব্যাংকে হামলা চালালে আনসার সদস্যরা প্রতিরোধ করতে পারেন, সে জন্য অস্ত্রধারীরা আগেই আনসার সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের অস্ত্র ও গুলি লুট করে।

বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে গত দুদিনে তিনটি ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় সদর উপজেলা বাদে জেলার ছয়টি উপজেলার সব ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বান্দরবান সোনালী ব্যাংকের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ওসমান গণিতিনি বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, আলীকদম, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সব ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন ব্যাংক্যের পাশাপাশি মসজিদও পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি ব্যাংক কর্মকর্তা ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে থানচির ব্যাংক ডাকাতি নিয়েও কথা বলেন আইজিপি। তিনি বলেন, আমরা একটু আগেই বিষয়টি শুনেছি। আমরা সতর্ক ছিলাম বলেই তারা এসে পালিয়ে গেছে। আমরা এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছি। প্রতিটি ঘটনার বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে পুলিশ-প্রধান বলেন, যারা দুষ্কৃতকারী তাদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খোঁজ মেলেনি ব্যাংক ব্যবস্থাপকের :

ব্যাংক কর্মকর্তাকে অক্ষত উদ্ধার এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তার দাবিতে আজ বুধবার বেলা ১১টার দিকে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে রুমা উপজেলা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিষদ। তারা ব্যাংক কর্মকর্তাকে অক্ষত উদ্ধার এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তার দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে।

উল্লেখ্য, কেএনএফ ২০২২ সালের মাঝা-মাঝি থেকে তৎপরতা শুরু করে। পাহাড়ে তাদের আস্তানায় সমতলের নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কীয়ার সদস্যরা সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছিল বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতিপূর্বে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। সেই আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গত বছর অভিযান চালিয়ে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কীয়া ও কেএনএফের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। কেএনএফ সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা মারমার নেতৃত্বে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা’ কমিটি গঠন করা হয় গত বছরের মে মাসে। ওই কমিটির সঙ্গে ৫ মার্চ দ্বিতীয় দফা বৈঠক হয় বেথেল পাড়ায়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads