রতন বালো
রাজধানী ঢাকা ঘিরে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীর সীমানা নির্ধারণের পিলারও এবার প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে। সেখানে তারা বিভিন্ন প্লাস্টিক কারখানা ও ভাঙারির দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করছে। অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখলেও এই চার নদী চিহ্নিত সীমানা পিলারের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে পারছে না। ফলে দিন দিন এ দখল বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে ৩৬টি সীমানা পিলার দখল এবং ২৬৪টি পিলার ক্ষতিগ্রস্ত ও ভাঙা পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে সরকারে নদীর সীমানার পিলার স্থাপন প্রকল্পের ২৭ কোটি টাকা এখন পানিতেই চলে যেতে বসেছে।
জানা গেছে, চার নদীর সীমানা নির্ধারণের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয় বিআইডব্লিউটিএ। দুই দফায় পিলার স্থাপনের জন্য ২৭ কোটি টাকা ব্যয় ধার্য করা হয়। প্রথম দফায় ২০১১-২০১৫ সাল পর্যন্ত গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পিডব্লিউডির মাধ্যমে ছয় হাজার ৮৪৩টি পিলার স্থাপনের কথা ছিল। কিন্তু পাঁচ বছরের স্থাপন করা হয় চার হাজার ৬৩টি পিলার। তবে বিআইডব্লিউটিএ বলছে, তারা ওই হিসাব থেকে ৩৬টি পিলার কম পেয়েছে। অর্থাৎ মোট চার হাজার ২৭টি পিলার স্থাপন করা হয়েছে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও ধলেশ্বরী নদীর সীমানা নির্ধারণে। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে ২১টি মৌজায় এক হাজার আটটি, তুরাগ নদীর পাড়ে ৩৫টি মৌজায় দুই হাজার ১৪টি, বালু নদীর পাড়ে ১৮টি মৌজায় ৫৮৯টি ও ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে চারটি মৌজায় ৪১৬টি পিলার স্থাপন করা হয়।
আবার এসব পিলারের মধ্যে ৮৯৪টি পিলার বিষয়ে আপত্তি ছিল বিআইডব্লিউটিএর। তারা বলছে, ২৬৪টি পিলার ক্ষতিগ্রস্ত ও ভাঙা পাওয়া গেছে। এছাড়া পিলার স্থাপনের কথা বলা হলেও সরেজমিনে দৃশ্যমান পাওয়া যায়নি ২০৮ পিলার। আর ৪২২টি পিলার সঠিক স্থানে স্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ বিআইডব্লিউটিএর।
এরপর দ্বিতীয় দফায় ২০১৮ সালে ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার ১১০ কিলোমিটার নৌ-পথে সৌন্দর্যবর্ধন ও নদীর সীমানা চিহ্নিত করে সাত হাজার সীমানা পিলার স্থাপন ও ৫২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করে নৌ-মন্ত্রণালয়। প্রথমে প্রকল্পের ব্যয় ছিল সাড়ে ৮০০ কোটি টাকা। তা বাড়িয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ১৮১ কোটি ১০ লাখ ৩১ হাজার টাকা। ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তা বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সাড়ে চার হাজার পিলার স্থাপন করা হয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়।
জানা গেছে, আদি বুড়িগঙ্গা নদীর মুখ থেকে কামরাঙ্গীরচরের লোহার সেতু পর্যন্ত নদীর সীমানা চিহ্নিত করে ২৮টি পিলার স্থাপন করা হয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি। এখন স্থাপিত পিলারের মধ্যে নদীর তীরে মাত্র ১৩টি পিলার দৃশ্যমান। বাকি ১৫টি পিলার অদৃশ্য হয়ে গেছে। গত ৩০ জানুয়ারি আদি বুড়িগঙ্গা নদীর তীর এলাকায় ঘুরে দেখা গেল, কামরাঙ্গীরচরের আশ্রাফাবাদ এলাকায় ছাতি মসজিদের দেয়াল ঘেঁষে একটি সীমানা পিলার তৈরি করা হয়েছে। কাছে গিয়ে দেখা গেল পিলারের গায়ে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও বাংলাদেশ সরকারের লোগোসহ লেখা রয়েছে ‘বাগচান খাঁ, পিলার নম্বর-২, বুড়িগঙ্গা নদী’। কিন্তু তিন নম্বর পিলারটি আর দেখা যাচ্ছে না।
ওই পিলারটির বিষয়ে জানতে চাইলে শরিফুল ইসলাম নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, মাস তিনেক আগে এই পিলারগুলো বসানো হয়েছে। এক নম্বর পিলারটি লোহার ব্রিজের কাছাকাছি আছে। দুই নম্বর তো এটা। তিন নম্বর পিলার মনে হয় এই দোকানপাটের নিচে চাপা পড়েছে।
একটু সামনে গিয়ে দেখা গেল ভাঙারির দোকানের শাটারের নিচে ঢাকা পড়েছে তিন নম্বর পিলারটি। জানতে চাইলে নূরু নামের স্থানীয় এক কর্মচারী বলেন, এই দোকানে ভাঙারির কাজ করি। মালিকের দোকান আমরা শুধু কাজ করছি। পিলারের ওপর অনেক কিছু রাখা হয়। এটা সরকারি লোকেরা তৈরি করেছে। আমরা এটার বিষয়ে কিছু জানি না। দোকানের মালিকের নাম জানতে চাইলে তা বলতে চাননি তিনি।
এভাবে বুড়িগঙ্গা নদী ৩-১৭ নম্বর পিলার দৃশ্যমান নয়। এসব পিলার ঢেকে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন প্লাস্টিক কারখানা ও ভাঙারির দোকানসহ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা। তবে কামরাঙ্গীরচরের নূরবাগ এলাকার মাদবরের বাজার বেড়িবাঁধের পাশের পিলারগুলো অনেকটা দৃশ্যমান। কিন্তু পিলারের গা ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে ইট, বালু, পাথর ও সিমেন্ট বিক্রয় কেন্দ্র।
নূরবাগ এলাকার বাইতুল রহমান মসজিদের পাশে বুড়িগঙ্গা নদীর ৬৮ নম্বর পিলার ঘেঁষে মায়ের দোয়া এন্টারপ্রাইজ নামে সিমেন্ট, ইটের খোয়া ইত্যাদি বিক্রির দোকান করেছেন জহিরুল ইসলাম বাবু। তিনি বলেন, নদী সীমানা পিলার বিষয়ে তেমন কিছু বলতে পারবো না। কারণ আমি এই এলাকার লোক নই। এই জায়গার মালিক হাজী মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান। আমি তার কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছি।
বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক মো. গুলজার আলী বলেন, আদি বুড়িগঙ্গা এলাকায় প্রাথমিকভাবে ৭৪টি অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ উচ্ছেদ করা হয়েছে। এখন আবার নতুন করে আরো ৭২টি অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকা অনুযায়ী উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। নদীর পিলার ঢেকে যদি কেউ স্থাপনা তৈরি করে অবশ্যই তা উচ্ছেদ করা হবে। কামরাঙ্গীরচর এলাকায় যদি এ রকম হয়ে থাকে তাহলে দুই-একদিনের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে প্রকল্পের উপ-পরিচালক (ডিপিডি) মতিউর ইসলাম বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় সাত হাজার ৫৬২টি সীমানা পিলার, ৫২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, আরসিসি সিঁড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে ৮০টি, কি ওয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে ১০ কিলোমিটার, ওয়াকওয়ে ড্রেন তিন কিলোমিটার, হাঁটার সেতু ৩৯৫ মিটার, নদীতীরে বসার বেঞ্চ নির্মাণ করা হচ্ছে ২৯১টি, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে ৮৫০ মিটার, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা তিন কিলোমিটার ৫০০ মিটার, জেটি নির্মাণ ১৪টি ও ২৩ হাজার বর্গমিটার পার্কিং ইয়ার্ডসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
এই কর্মকর্তার বক্তব্য বিরোধিতা করেন কামরাঙ্গীরচরের লোহার সেতু এলাকার বাসিন্দা আয়নাল ফকির, রজ্বব আলী, মো. আশরাফ ও জয়নাল আবেদিন। তারা বলেন, নদী রক্ষায় নদীর সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়। কিন্তু তারা বলছেন ৩৬টি পিলার দখলে গেছে। বাস্তবে বেশিরভাগই দখলে চলে গেছে এবং যাচ্ছে। তারা বলেন, সরকারিভাবে এদিকে অভিযান শুরু করে, আবার কিছু দিন পরেই অবৈধ দখলে চলে যায়। আবার ভূমি বিভাগের কর্মকর্তাদের হাত করে ভুয়া কাগজ তৈরি করে। এই কাগজের বলে তারা কোর্টে মামলা দায়ের করে সরকারের উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করে দেয়। এভাবে ওয়াকওয়ে, আরসিসি সিঁড়ি, ওয়াকওয়ে ড্রেনও দিনে দিনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।





