প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এদেশের কোনো মানুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করবে এটা বঙ্গবন্ধু কখনোই বিশ্বাস করতেন না। এদেশের মানুষ এমন একজনকে হত্যা করল, যিনি জাতিকে একটি দেশ দিয়েছেন। জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে রাতারাতি এ দেশ একটি খুনি রাষ্ট্রে পরিণত হলো।’
বঙ্গবন্ধুর ৪৪তম শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস পালন উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার বিকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণের উদ্যোগে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যখন একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তাকে হত্যা করা হয়। যে জাতি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের জন্য বিশ্বব্যাপী বিজয়ী জাতি হিসেবে সম্মান পেয়েছিল, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সেই জাতি একটি খুনি জাতি হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত হলো।’
তিনি বলেন, কারবালায় যেভাবে নির্মম হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যেন কারবালার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে। আমরা দুই বোন সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাই। এ হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১৫ দিন আগে আমি বিদেশে চলে যাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমিও কখনো ভাবতে পারিনি, বঙ্গবন্ধু যে জাতির পরিচয় দিয়ে গেলেন, একটি দেশ দিয়ে গেলেন, এরকমভাবে বাংলাদেশের মানুষ এমন একজন মানুষকে হত্যা করবে! বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপর আমরা দুই বোন দেশে আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি। আমাদের আসতে দেওয়া হয়নি, বাধা দেওয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনা বক্তব্যের শুরুতে ১৫ অগাস্টে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার তার মা-বাবা-ভাই এবং তাদের স্ত্রীসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের স্মরণ করেন। এ সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিএনপির নেতারা নতুন সাফাই গাইতে শুরু করেছেন বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার তদন্তে স্যার টমাস উইলিয়ামস এমপিকে বাংলাদেশে আসার ভিসা দেননি জিয়াউর রহমান। বিএনপি নেতারা এখন বলছেন, ’৭৫ সালে তো বিএনপি গঠনই হয়নি, তাহলে বঙ্গবন্ধু হত্যায় বিএনপি কীভাবে জড়িত হলো? কিন্তু বিএনপির যে প্রতিষ্ঠাতা, সেই জিয়াউর রহমান নিজেই খুনি। জিয়া শুধু খুনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, এই হত্যার বিচার যেন না হয়, সেই ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত ছিল, তাদের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীর বিচার বন্ধ করলেন। ট্রাইব্যুনাল বন্ধ করলেন। তিনি মন্ত্রিসভা যখন গঠন করলেন, সেখানে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত করলেন, স্বাধীনতাবিরোধীদের মন্ত্রিসভায় স্থান দিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির একটা কথা জানা উচিত, জিয়ার ক্ষমতা দখলকে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছে। এজন্য বিএনপির সৃষ্টিটাও অবৈধ হয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনীতিকে কলুষিত করেছে তারা। আদর্শের রাজনীতি ধ্বংস করে খুনের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, যারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল, তারাও পরে জিয়ার সঙ্গে গেছে। অনেকে এখনো বেঁচে আছে, বড় বড় কথাও বলে। রাজনীতিতে হত্যার সংস্কৃতি চালু করেছেন জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধুর খুনি ও একাত্তরে পরাজিত শক্তিকে পুনর্বাসন করেছে খালেদা জিয়া।
বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ১৫ আগস্ট শুধু একটা পরিবারকে হত্যা নয়। এর মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের ইতিহাস মুছে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে যার অবদান, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে যত আন্দোলন-সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর যে অবদান, তা মুছে দেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। তখন একটি মাত্র টেলিভিশন ছিল— বিটিভি। সেই বিটিভিতেও একটিবারের জন্যও বঙ্গবন্ধুর নামটি আসেনি। একেবারে ইতিহাস থেকেই মুছে ফেলার অপচেষ্টা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঁচাত্তরের পর যারাই ক্ষমতায় এসেছেন, তারাই ১৫ আগস্টের খুনিদের মদত দিয়েছেন। যেভাবে জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে খুনিদের দূতাবাসে চাকরি দিয়েছিলেন, সেভাবে খালেদা জিয়াও পুনর্বাসন করেছেন। এরশাদও খুনিদের মদত দিয়েছেন ও পুরস্কৃত করেছেন।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেই জনগণের আস্থা অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ। অথচ এই দলটিকে ধ্বংস করতে আইয়ুব খান থেকে শুরু করে খালেদা জিয়া পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন।
কঠিন সময়ে নেতাকর্মীরা দলকে শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন উল্লেখ করে আওয়ামী লীগপ্রধান বলেন, সে কারণেই আওয়ামী লীগকে কেউ ধ্বংস করতে পারবে না।
তিনি বলেন, জাতির পিতা বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়ন করতে আমি মৃত্যুকেও ভয় পাই না। জাতির পিতার অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণে আমি আমার শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত কাজ করে যেতে চাই।’





