অপরাধ

পাহাড়ে হঠাৎ বেড়েছে সেনাটহলে আক্রমণ

  • এ এইচ এম ফারুক
  • প্রকাশিত ২৭ অগাস্ট, ২০১৯

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তির পর দীর্ঘ প্রায় দুই যুগের মাথায় এসে হঠাৎ বেড়ে গেছে নিরাপত্তা বাহিনীর টহলে আক্রমণের ঘটনা। গত ৯ দিনে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে এমন তিনটি ঘটনায় এক সেনাসদস্য ও ৪ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছেন। নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতকালে পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সংগঠনের ব্যানারে থাকা অস্ত্রধারীরা সেনাটহলে গুলি চালাচ্ছে। অপরদিকে আঞ্চলিক সংগঠনের নেতাদের দাবি, তাদের নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে।

আইএসপিআর, নিরাপত্তা বাহিনী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দলের নেতাদের দেওয়া তথ্যে এসব জানা গেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের অংশ হিসেবে দীর্ঘ দুই যুগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান ঘটনাতে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি নামে পরিচিত পার্বত্য চুক্তি সম্পাদন হয়। পাহাড়ের তৎকালীন একমাত্র আঞ্চলিক সংগঠন জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সরকার এ চুক্তি করে।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, চুক্তির পর প্রায় দুই যুগ হয়ে গেলেও পাহাড়ে থামেনি আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানি। নিয়মিতই ঝরছে রক্ত। এ থেকে স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালিসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও বাদ যাচ্ছে না।

গত ১৮ আগস্ট রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলায় সেনাবাহিনীর একটি টহল দলের ওপর গুলি করে সন্ত্রাসীরা। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মো. নাসিম (১৯) নামে এক সেনাসদস্য। পরে ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালাতে গিয়ে মাটিতে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরিত হয়ে ক্যাপ্টেন মেহেদি ও সৈনিক মুহসীন আহত হয়েছেন।

এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে একই জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম এলাকায় টহলে গেলে গত ২৩ আগস্ট সেনাটহলের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা ঘটে। এ সময় পাল্টা গুলিতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র শাখার সদস্য সুমন চাকমা ওরফে কসাই সুমন চাকমা (৪০) নামে একজন নিহত হন। এ সময় তার সঙ্গে থাকা দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছুফিউল্লাহ জানিয়েছেন, নিহত সুমন চাকমা রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা হত্যা মামলার আসামি। তবে ইউপিডিএফ এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তাদের সাবেক এই কর্মীকে বিনা উসকানিতে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল সোমবার খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার বড়াদম ইউনিয়নের গহীন এলাকায় সেনাটহলে ফের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় সেনাবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনায় ৩ জন নিহত হয়েছেন। পরে তল্লাশি চালিয়ে ১টি আমেরিকান এম ফোর অটোমেটিক কার্বাইন, ২টি পিস্তল, ১৩ রাউন্ড গুলি, চাঁদা আদায়ের রসিদ বই ও নগদ টাকাসহ বিভিন্ন নথিপত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী সূত্র।

নিরাপত্তা বাহিনী, পুলিশ ও ইউপিডিএফ নিহত ওই ৩ জনকে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-প্রসীত গ্রুপ) কর্মী বলে জানিয়েছে। নিহতরা হলেন মেরুং বেতছড়ি গ্রামের ধন্যসেন চাকমার ছেলে নবীন জ্যোতি চাকমা (৩৮), হাচিনসনপুর গ্রামের সুজিত প্রিয় চাকমার ছেলে রুচিল চাকমা ওরফে রাসেল (২৬) ও ইন্দ্রমুনি পাড়ার তঙ্যারাম চাকমার ছেলে ভূজেন্দ্র চাকমা (৫০)।

ঘটনার পর পুরো এলাকায় জনমনে ভীতির সঞ্চার হয়েছে বলে জানান বড়াদম এলাকার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরন চাকমা প্রেরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে খাগড়াছড়ি জেলা সংগঠক অংগ্য মারমা দাবি করেন, রোববার রাতে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক তাদের বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। পরে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সোমবার সকালে সেনাবাহিনীর টহল দল নিয়মিত অভিযানে গেলে একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী তাদের লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলি চালায়। এ সময় সেনাবাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই তিন সন্ত্রাসী নিহত হয়। এরা সবাই প্রসীত খীসাপন্থি ইউপিডিএফের সদস্য। এ সময় তল্লাশি চালিয়ে ১টি আমেরিকান এম ফোর অটোমেটিক কার্বাইন, ২টি পিস্তল, চাঁদা আদায়ের রসিদ বই ও নগদ টাকাসহ বিভিন্ন নথিপত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রমতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর টহলে প্রথম হামলা হয় ১৯৭৭ সালে। ১৯৭৩ সালে এমএন লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) প্রতিষ্ঠালাভ করে। তারপর প্রতিষ্ঠিত হয় সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনী। তৎকালীন শান্তিবাহিনী ১৯৭৭ সালের ৬ মে বান্দরবানের সাঙ্গু নদীতে হামলা চালিয়ে ৫ সেনাসদস্যকে হত্যা করে। ওই বছরের ২৫ অক্টোবর বান্দরবানেই হত্যা করা হয় আরো ৬ জন সেনাসদস্যকে।

এরপর পর্যায়ক্রমে ১৯৭৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সাঙ্গু নদীতে টহলে হামলায় এক সেনাসদস্যকে হত্যা করে গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে যায়। ওই বছরের ৫ জুলাই কাপ্তাই উপজেলার নতুন বাজার থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা দুই আনসার সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে হত্যা করে। ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় সেনাটহলের ওপর হামলা চালিয়ে হত্যা করে সেনাবাহিনীর এক নন-কমিশন অফিসারকে। একই বছরের ১৪ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সদরে শান্তিবাহিনীর হামলায় নিহত হয় আরো ৫ সেনাসদস্য।

১৯৮০ সালের ২৩ জানুয়ারি খাগড়াছড়ি সদরে সেনাটহলের ওপর হামলা চালালে নিহত হয় ৩ সেনাসদস্য। ওই ঘটনায় আরো ৫ জন আহত হন। একই বছরের ১ মার্চ রাঙামাটির থাচিতে টহলে গেলে অ্যামবুশ করে হামলা চালালে নিহত হন মেজর মহসীন আলমসহ ২২ সেনাসদস্য। ২১ এপ্রিল ফালাউংপাড়া নামক স্থানে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় ১১ রাইফেল ব্যাটালিয়নের ২০ সদস্যকে।

১৯৮৬ সালের ১৯ জুলাই সেনাটহলে হামলায় নিহত হয় ১ সেনাসদস্য, আহত হয় ৭ জন। একই বছরের ৭ আগস্ট ২ আনসার সদস্যকে অপহরণ করে হত্যা করে শান্তিবাহিনী।

১৯৮৭ সালের ২১ জুন দীঘিনালার নাড়াইছড়ির অদূরে সেনাটহলে হামলায় নিহত হন ৩ সেনাসদস্য।

১৯৮৯ সালের ২ নভেম্বর শিলছড়িতে সেনাটহলে হামলায় নিহত হন ২ সেনাসদস্য। একই বছরে বান্দরবানের থানচিতে ১১ সেনাসদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে হত্যা করে শান্তিবাহিনী।

১৯৯২ সালের ২৯ জুন খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে রাঙামাটি সড়কে নিরাপত্তা বেঞ্চের ওপর অতর্কিত হামলা চালালে নিহত হন ২ সেনাসদস্য।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads