সালটোলিন ইনহেলার ব্যবহার করেন সিদ্দিকুর রহমান। একসময় এই ইনহেলার তিনি কিনেছেন ১৯৫ টাকায়। পরে দাম বাড়িয়ে করা হয় ২১৫ টাকা। এখন এ ইনহেলার কিনতে রোগীদের লাগছে ২৩০ টাকা। সিদ্দিকুর রহমান বলেন, শীতকালে ফার্মেসিগুলো কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে দাম আরো বেশি রাখবে। একইভাবে শীত এলেই মনটিন ১০ ও ডক্সিভার সরবরাহ নেই জানিয়ে নির্ধারিত মূল্যের থেকে বেশি অর্থ দাবি করবে অসাধু ফার্মেসিগুলো। ওষুধের দাম যেন বাজারের ভোগ্যপণ্যের মতোই। নিয়ন্ত্রণ নেই।
অপরদিকে আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে চাইলেও সব ওষুধের দাম নির্ধারণ করতে পারছে না ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। নিধিরাম সর্দারের ভূমিকা পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বেসরকারি হিসাব বলছে, বাংলাদেশে উৎপাদিত ওষুধ বর্তমানে বিশ্বের ১৬০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ওষুধের প্রায় ৯৮ শতাংশই জোগান আসছে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ওষুধ থেকে। উন্নত দেশগুলোর বাজারেও যাচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ। ফলে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে ওষুধের রপ্তানি। কিন্তু দেশের বাজারে সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ মূল্যে ওষুধ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ সরকার সবার জন্য নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চায়। এ জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে অবশ্য বিনামূল্যে রোগীদের ওষুধ সরবরাহ করা হয়।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করলেই হবে না। ওষুধের দাম যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে তার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এটি শক্ত তদারকির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ফার্মেসিগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে। যেসব ফার্মেসির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে সেগুলো নবায়নে বাধ্য করতে হবে। নবায়ন করতে অযোগ্য হয়ে পড়লে সেগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মত, ভোগ্যপণ্যে বিকল্প খোঁজার উপায় আছে সাধারণ মানুষের কাছে। কিন্তু ওষুধের বেলায় তা নেই। ২০১৯-২০ সালের বাজেট ঘোষণার পর বাজেটের অজুহাতে, অতি দরকারি কয়েকটি ওষুধের দাম বেড়েছে বেশ খানিকটা।
ওষুধ দোকানিরা বলছেন, বিশেষ করে গ্যাসের ওষুধের দাম বেড়েছে। গত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ওষুধের কিছু কাঁচামালের শুল্ক বাড়িয়েছেন। অবশ্য একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাঁচামালে শুল্ক কমিয়েছেন। ওষুধ খাতের জন্য নগদ প্রণোদনাও ঘোষণা করেছেন। তবে অর্থমন্ত্রীর বাজেটের প্রভাবে দাম বাড়লেও কমেনি একটি ওষুধের। সরকার ক্যানসার ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে বড় ছাড় দিলেও বাজারে এখনো তার প্রভাব পড়েনি বলে জানা গেছে।
মনসুর আহমেদ নামে একজন জানান, ফিনিক্স ট্যাবলেট খাচ্ছেন তিনি। তিন সপ্তাহ আগেও তিনি এক পাতা ওষুধ একশ টাকায় নিলেও এখন প্রায় ১৩৫ টাকার নিচে কোনো ফার্মেসি দিচ্ছে না।
হঠাৎ দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে রাজধানীর আল-রাজী হাসপাতাল সংযুক্ত ফার্মেসির এক কর্মচারী জানান, ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি দাম বাড়িয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন ফার্মেসি ঘুরে জানা গেছে, ওষুধ প্রস্তুতকারক কয়েকটি কোম্পানি তাদের নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের দাম বাড়িয়েছে। ওষুধগুলো বেশিরভাগই প্রেসার ও গ্যাস্ট্রিকের। এর মধ্যে আছে অ্যাসিফিক্স ২০ এমজি, বাইজোরান ৩/২০ ও ৩/৪০, ওলমেজান ২০ এমজি ও ৪০ এমজি, ফিনিক্স ২০ এমজি এবং ম্যাক্সপ্রো। অ্যাসিফিক্স ১০ ট্যাবলেটের এক পাতা আগে বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকায়। দাম বেড়ে বর্তমানে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ম্যাক্সপ্রো ২০ এমজি ১৪টি ট্যাবলেটের এক পাতার দাম আগে ছিল ৬৫ টাকা। এখন এর দাম ৯০ টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওষুধের প্যাকেটে খুচরা মূল্য থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই দামে বিক্রি হয় না। তবে রাজধানীর কিছু মডেল ফার্মেসি অবশ্য বিভিন্ন হারে ছাড় দিয়েও ওষুধ বিক্রি করছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে অনুমোদিত ফার্মেসির সংখ্যা এক লাখ ১৫ হাজার ৬০৬টি। কিন্তু অনুমোদনহীন ফার্মেসির সংখ্যা আরো অনেক। ফলে সবমিলিয়ে ফার্মেসির সংখ্যা আরো বেশি হবে। কিছু সূচক বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসন ঢাকাসহ সারা দেশে কিছু ফার্মেসিকে মডেল ওষুধ শপ ও ফার্মেসি ঘোষণা করেছে। মানসম্পন্নভাবে ওষুধ বিক্রি এবং সঠিকভাবে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে মডেল মেডিসিন শপ বা মডেল ফার্মেসিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। মডেল মেডিসিন শপ বা মডেল ফার্মেসিতে ফার্মাসিস্টদের বাধ্যতামূলকভাবে অ্যাপ্রন পরতে হবে। ফার্মাসিস্টরা রোগীকে কাউন্সেলিং করবেন। অ্যান্টিবায়োটিক মেডিসিন বিক্রি করতে হচ্ছে নির্ধারিত রেজিস্ট্রার হিসাব রেখে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, আমরা নিয়মিতভাবে নজরদারি করছি, যাতে সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূল্যে ওষুধ পায়।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, সরকার শুধু ওষুধ নয়, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। এরই মধ্যে এসব কর্মকাণ্ডের সুফল সাধারণ মানুষ পেতে শুরু করেছে। ওষুধের দামও কিছু ক্ষেত্রে হয়তো বেশি। তবে আমরা সব সময় নজর রাখছি, যাতে শৃঙ্খলা নষ্ট না হয়।
জানা গেছে, অনেক রোগী কিংবা রোগীর স্বজনরা ওষুধের সঠিক দাম জানেনও না। এ ছাড়া দাম যাচাই করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে অনেক সময় তারা ফার্মেসিগুলোর প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
বেশ কয়েকটি ফার্মেসির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশি ওষুধের দামে বেশি তারতম্য দেখা যায়। ওষুধের দাম নির্ধারণে সরকারের ভূমিকাও আইনের মাধ্যমে কমিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমানে অত্যাবশ্যকীয় তালিকাবহির্ভূত ওষুধের দাম উৎপাদক প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে থাকে। ফলে ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানগুলো। অথচ ১৯৮২ সালের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশে যেকোনো ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সরকারের ছিল। কিন্তু এখন কোম্পানিগুলো দাম নির্ধারণ করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে জানিয়ে দেয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওষুধের মান, দাম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে। কিন্তু সংস্থাটি আইনি সীমাবদ্ধতায় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।





