ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৫ সালে বর্ষবরণে প্রকাশ্যে দিবালকেই যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। সেসময় ছাত্র ইউনিয়ন নেতা লিটন নন্দী, সুমন সেনগুপ্ত, অমিতসহ কয়েকজন যৌন নিপীড়নের শিকার নারীকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। তারা একপর্যায়ে দুর্বৃত্তদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন শুরু করে, যা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ এই ঘটনা অস্বীকার করায় আন্দোলন আরো জোরালো হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনের সূত্র ধরেই একই দিনে দেশব্যাপী ঘটে যাওয়া আরো অসংখ্য যৌন নিপীড়নের ঘটনা সামনে আসতে থাকে।
এরই মধ্যে তৎকালীন পুলিশ প্রধান শহীদুল হক ঘটনাটিকে কিছু দুষ্টু ছেলের দুষ্টামি বলে আখ্যায়িত করেন। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন নারীর নিরাপত্তায় কারো ওপর নির্ভর না করে, প্রতিরোধের দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। সেটিই হলো ‘প্রীতিলতা ব্রিগেড’। এভাবেই প্রীতিলতা ব্রিগেড প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্প বলছিলেন প্রীতিলতা ব্রিগেডের সমন্বয়ক সুমাইয়া সেতু।
সারা দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমনকি পাড়ামহল্লায় প্রীতিলতা ব্রিগেড গড়ে তুলে নারীকে সবদিক থেকে স্বাবলম্বী করাই এই ব্রিগেডের উদ্দেশ্য। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূর্য সৈনিক প্রীতিলতার নামে এই ব্রিগেডের নাম করা হয়, যেন তার আদর্শ সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
প্রীতিলতা ব্রিগেডের সমন্বয়ক সুমাইয়া সেতু বলেন, প্রীতিলতা সমাজের অন্য দশটা নারীর মতো ঘরে বসে থাকেননি। সশস্ত্র সংগ্রাম করতেও ভয় পাননি তিনি। সেই সাহস সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই এই ব্রিগেডের এমন নামকরণ।
তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লাকী আক্তার এই ব্রিগেডের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। এই ব্রিগেড শুরুতে পঠন-পাঠনের কাজ করতেন। সমাজের মহীয়সী নারীদের জীবনী নিয়ে নিয়মিত পাঠচক্রের আয়োজন করতেন, যেন লড়াই সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস সকলে জানতে পারে।
এরই মধ্যে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ধর্ষিত হয় সোহাগী জাহান তনু। আবারও স্লোগান ওঠে ‘জলপাই বনে বোনের লাশ, রাষ্ট্র কি করে ধর্ষক চাষ?’ ২০১৬ সালের ২ এপ্রিল এই আন্দোলনে প্রথম তনুদের লাঠি মিছিল নামে রাজপথে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে প্রীতিলতা ব্রিগেড। সেখানেই আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণের ঘোষণা দেওয়া হয়। ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৬ সালের ৮ এপ্রিল প্রীতিলতা ব্রিগেডের উদ্যোগে সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যে শুরু হয় আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ, যার নাম ছিল ‘তনুদের আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ’। শুরুতে তায়কোয়ান্দো ব্ল্যাকবেল্ট জেসমিন আক্তার রুমার প্রশিক্ষণে ১৭ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রশিক্ষণটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে পরের সেশনে আবারও আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। ধাপে ধাপে এখনো এই প্রশিক্ষণ চলমান। আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীরা অংশগ্রহণ করছেন। এ ছাড়া অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে নারীর প্রতি বিভিন্ন নিপীড়নের বিচারের দাবিতে কর্মসূচি পালন, প্রতি বছর ব্রিগেড ক্যাম্পের নামে প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকে। সারা দেশে ২৫টি জেলা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রীতিলতা ব্রিগেডের কমিটি রয়েছে।
প্রীতিলতা বিগ্রেডের সমন্বয়ক সুমাইয়া সেতু বলেন, একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাককালে যে নারীরা ডামি অস্ত্র হাতে মহড়া দিয়েছিল ঢাকার রাজপথে, প্রীতিলতা ব্রিগেড তারই উত্তরসূরিদের সংগঠন। তাই সারা দেশে প্রীতিলতা ব্রিগেড গড়ে তুলে নারীদের প্রশিক্ষিত বাহিনীতে পরিণত করার এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।





