রাজধানীবাসীকে আধুনিক গণপরিবহনের নিশ্চয়তা দিয়ে শুরু হয়েছিল বাস র্যাপিড ট্রানজিট-৩, ঢাকা এলিভেডেট এক্সপ্রেসওয়ে ও ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ। কিন্তু বড় পরিসরের এসব প্রকল্প সমাপ্ত করা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে সেতু কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ রেলওয়ের সাথে সমন্বয়ের অভাবে ঢাকা-টঙ্গী রেলপথে তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণ প্রকল্পের প্রস্তাবিত ট্র্যাকের ওপর দিয়ে নকশা করা হয়েছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের পিলার।
ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে দেশের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটির মগবাজার রেলক্রসিং থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত তৃতীয় ধাপের কাজ। একই সঙ্গে অর্থের উৎস নিশ্চিত না করে বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতিতে থাকা ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি লিমিটেডকে কাজ দেওয়ায় বিলম্বিত হয়েছে বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত মোট ৪৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি। এদিকে প্রকল্প মূল্য থেকে ২৪ শতাংশ কম দামে চায়না গেজুবা কোম্পানি লিমিটেডকে কাজ দিয়ে এখন তাদের পেছনে ঘুরছে সেতু কর্তৃপক্ষ। বার বার তাগাদা সত্ত্বেও প্রকল্প নির্মাণে প্রয়োজনীয় টাকা খরচ করছে না কোম্পানিটি। ফলে ঝুলে গেছে দেশের প্রথম বাস র্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) নির্মাণ। মাত্র ২০ মিনিটে গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর আসার ব্যবস্থা করতে নেওয়া প্রকল্পটির কাজ শেষ না হওয়ায় জনভোগান্তি উল্টো বাড়ছে। অন্যদিকে ২০১৭ সালে সিএমসির সাথে চুক্তি হলেও দীর্ঘ তিন বছরে কাজ শুরু হয়নি আশুলিয়া থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের। নভেম্বরে এক্সিম ব্যাংক থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএমসি ঋণ অনুমোদন করাতে পারলেও গত ৬ মাস ধরে ব্যাংকের সাথে চুক্তি না হওয়ায় এখনো কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। বিআরটি : চার বছরের মধ্যে নির্মাণ সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০.৫
কিলোমিটার বাস রেপিড ট্রানজিট (বিআরটি) লাইন নির্মাণ প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০১২ সালে। প্রকল্পের টঙ্গী থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার এলিভেটেড অংশ নির্মাণের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। এ অংশের ব্যয় ৬৫৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,২২৫ কোটি টাকায়।
প্রকল্প মূল্য ১,২২৫ কোটি টাকা হলেও ২৪ শতাংশ কম দামে ৯৩৫ কোটি টাকায় ২০১৭ সালের শেষের দিকে কাজ দেওয়া হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না গেজুবা কোম্পানি লিমিটেডকে। এ পর্যন্ত অগ্রগতি ৫৪ শতাংশ। আর সম্পূর্ণ প্রকল্পের অগ্রগতি ৫৫ শতাংশ।
তবে সরেজমিনে বিমানবন্দর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায় শতাধিক স্প্যান ফেলে রাখা হয়েছে রাস্তার মাঝখানে। আশপাশের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক বছরের অধিককাল ধরে এগুলো পড়ে আছে রাস্তার ওপর। এতে কার্যত ব্যস্ততম মহাসড়কটির দুটি লেন একেবারেই যানবাহন চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এদিকে টঙ্গী ব্রিজের উত্তর পাশে গার্ডার বসানোর জন্য যে জায়গা নেওয়া হয়েছে তাতে রাস্তার উভয় দিকে একটি করে লেন সচল রয়েছে।
বিবিএ অংশের প্রকল্প পরিচালক সুপারিনটেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার লিয়াকত আলী ঠিকাদারের রিসোর্সের ঘাটতি ও প্রকল্প দীর্ঘায়িত হওয়ায় জনভোগান্তির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, কন্ট্রাক্টরের কিছু গাফিলতি আছে। তাদের রিসোর্সের ঘাটতি আছে। যদি ওদের হেড অফিস ওদের সাপোর্ট করত তাহলে ওরা দ্রুত কাজটা সম্পন্ন করতে পারত। হেড অফিসে চিঠি লিখছি বার বার। গত সপ্তাহেও চিঠি লিখেছি।
এ ছাড়া নির্মাণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে জানান লিয়াকত আলী, ‘রিসোর্স ঘাটতি ছাড়াও নির্মাণ কাজে মূল সমস্যা তীব্র যানজট। আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যাস লাইন, আন্ডারগ্রাউন্ড বিদ্যুৎ লাইন, অপটিক্যাল ফাইবার, টেলিফোন লাইন, সুয়ারেজ লাইন সবই আছে প্রকল্প এলাকায়। এগুলো একেবারে জালের মতো ছড়ানো। পাইলিং করে করে এগোতে হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ইউটিলিটি রিলোকেশন করছে না সময়মতো। ডেসকোর লাইন সরাতে অনেক দেরি হয়।’
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে : এক্সপ্রেসওয়ে ও র্যাম্পসহ ৪৬.৭৩ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি ভিত্তিতে নির্মাণ করতে ২০১১ সালে কেবিনেট কমিটি অন ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্সের অনুমোদন পায়। তিন ভাগে ২০১৬ সালে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
প্রথম ধাপে বিমানবন্দর থেকে বনানী রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত ৭.৪৫ কিলোমিটারের ৬২.৫৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে বনানী থেকে মগবাজার রেলক্রসিং পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ১৪.৯১ শতাংশ আর তৃতীয় ধাপে মগবাজার থেকে চট্টগ্রাম রোডের কুতুবখালী পর্যন্ত কোন কাজ এখনো হয়নি।
তৃতীয় ধাপে মগবাজার রেললাইন থেকে কুতুবখালী যাওয়ার পথে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের পূর্বদিকে জায়গা নিয়ে রেলওয়ের ‘ঢাকা-টঙ্গী রেলপথে তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়েল গেজ লাইন নির্মাণ’ প্রকল্পের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়েছে ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক এএইচএমএস আকতার বলেন, তেমন কোনো সমস্যা হবে না। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সহজেই বিষয়টি সমাধান হবে। নির্মাণকাজও নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে।
ওদিকে তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন নির্মাণ প্রকল্প পরিচালক আফজালুর রহমান বলেন, আমরা বলেছি মালিবাগ থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য জায়গা দেওয়া সম্ভব না। আমাদের যে কার্যক্রম চলছে তাতে আসলে কাউকেই দেওয়ার মতো জায়গা নেই। ‘দুটি প্রকল্প প্রায় একই সময়ে নেওয়া হয়েছে,’ বলেন তিনি।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে : জি-টু-জিভিত্তিক প্রকল্প ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে একনেকে অনুমোদন হয় ২০১৭ সালে, ২৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ এক্সপ্রেসওয়ে আশুলিয়া থেকে শুরু হয়ে বিমানবন্দরে গিয়ে মিলবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সাথে।
৬,৯০১ কোটি টাকার প্রকল্পটিতে ১০,৯৫০ কোটি টাকা অর্থায়ন করবে চায়না এক্সিম ব্যাংক আর বাকি ৫৯৫১ কোটি টাকা দিবে বাংলাদেশ সরকার। চায়না কনস্ট্রাকশন ফার্ম সিএমসির সাথে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ১২,৫০০ কোটি টাকায় চুক্তি করে সেতু বিভাগ। চুক্তি অনুযায়ী চায়না এক্সিম ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ ম্যানেজ করবে ঠিকাদার। কিন্তু ঠিকাদার ঋণ ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হয়।
সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী ফেরদৌস বলেন, এক্সিম ব্যাংকের সাথে বাংলাদেশ সরকারের একটি চুক্তি প্রয়োজন হবে। ড্রাফট তৈরি হয়ে গেছে। আমরা কমেন্ট দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। অল্প দিনের মধ্যে চুক্তি হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, একটা প্রকল্পের উপর আরেকটা প্রকল্প চলে যায়, এটা ফিজিবিলিটি স্টাডিতে (সম্ভাব্যতা যাচাই) আসে না কেন! একই জমিতে দুই প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশন ধরতে পারে না কেন। যতদিন পর্যন্ত সঠিক ফিজিবিলিটি স্টাডি না হবে, যতদিন পর্যন্ত পরিকল্পনা কমিশন সমন্বিতভাবে প্রজেক্টগুলোকে বিশ্লেষণ না করবে ততোদিন পর্যন্ত এ দুরবস্থা থাকবে। একই সাথে জবাবদিহিতা ও শাস্তির ব্যবস্থা না হলেও অবস্থা উন্নতি হবে না।
অনেক বেশি দামে যেমন কাজ দেওয়া ঠিক না, তেমনি কম মূল্যেও কাজ নেওয়া ঠিক নয়; ২৪ শতাংশ কম দামে বিআরটির কাজ দেওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করে তিনি বলেন, দেশে একটি আইন রয়েছে যেখানে ১৫ শতাংশের বেশি কম বা বেশি মূল্যে কোন ঠিকাদার কাজ দেওয়া যাবে না।





