মো. বাবুল আক্তার:
দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই গত কয়েক দিন ধরে বিপজ্জনকভাবে তাপপ্রবাহ বইছে। এরমধ্যে তীব্র তাপপ্রবাহ বইছে ৯টি অঞ্চলে। এসব অঞ্চলে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪০ ডিগ্রির উপরে। অতিরিক্ত গরমের কারণে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। গরম জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশের সব হাসপাতালে বাড়ছে রোগী। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক মানুষ বেশি অসুস্থ হচ্ছেন। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত ৫ দিনে হিটস্ট্রোকে মারা গেছেন ৩৭ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপপ্রবাহর কারণে বডির টেম্পাচার বাড়তে বাড়তে ১০৫ এর ওপর উঠলে ঘাম হয় না, মাথাব্যথা, অস্থিরতা, বুক ধরফর, ক্লান্তি, অবসাদ হয়। এক সময় অজ্ঞানও হওয়ার মতো অবস্থা হয়, অজ্ঞানও হয়ে যায় অনেকে। এটি বিপজ্জনক। এটি খুবই সিরিয়াস, সাথে সাথে চিকিৎসা না দিলে রোগী মারাও যেতে পারে, যাকে বলা হয় হিটস্ট্রোক।
এদিকে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় তাপমাত্রা বাড়ছে। তুনলানমূলকভাবে রাজধানী ঢাকায় দিন দিন তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) করা ২০১৭ ও ২০২৪ সালের ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার তাপমাত্রার তারতম্যের মূল্যায়ন সম্পর্কিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এ তথ্য।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) আওতাধীন এলাকায় ২০১৭ সালে গড় তাপমাত্রা ছিল ৩৩ দশমিক ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২৪ সালে সেটি হয়েছে ৩৭ দশমিক ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অপরদিকে ২০১৭ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিভিন্ন এলাকায় গড় তাপমাত্রা ছিল ৩৩ দশমিক ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২৪ সালে এসে বেড়ে হয়েছে ৩৬ দশমিক ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এদিকে হিটস্ট্রোকে প্রতিদিন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। গত ২০ এপ্রিল থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত ৫ দিনে সারাদেশে হিটস্ট্রোকে মারা গেছে ৩৭ জনের বেশি।
প্রাণঘাতী এই অসহ্য গরমে সবাই এখন চাতকের মতো তুমুল বৃষ্টির জন্য অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। উন্মুক্তপ্রান্তরে সালাতুল ইসতেস্কা পড়ছে মুসলমানরা। সিলেটসহ কিছু স্থানে বিক্ষিপ্ত যে বৃষ্টিপাত হচ্ছে, তাতে পথের ধুলোর মরণ হলেও মোটেই স্বস্তি মিলছে না। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, টানা ভারী বর্ষণ ছাড়া এই দাবদাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য মতে, পটুয়াখালীর বাউফলে হিটস্ট্রোকে মোহাম্মদ শাহ-আলম (৫০) নামের এক পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। তিনি ঢাকায় পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ছিলেন। তিনি ছুটিতে গ্রামের বাড়ি বাউফল যান। গত সোমবার রাত ৯টায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বাউফল হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখান থেকে তাকে বরিশালে পাঠানো হয়। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তিনি মারা যান।
রাজধানীর গুলিস্তান টোল প্লাজার পাশের রাস্তায় মো. আলমগীর শিকদার (৪৫) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোকে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সোমবার বেলা ১১টার দিকে অচেতন অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সিরাজগঞ্জের তাড়াশে কৃষক আফসার আলী ও মো. হাসান আলী, নাটোরের বড়াইগ্রামে কৃষক বকুল হোসেন, জামালপুরে মরিচ ব্যবসায়ী গোলাম রাব্বানী, বরগুনার আমতলীতে অজিতুন নেসা, কুমিল্লার বুড়িচংয়ে শ্রমিক মুজিবুর রহমান ও খুলনার আড়ংঘাটায় ৬০ বছরের অজ্ঞাত একজন মারা গেছেন।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে হিটস্ট্রোকে মো. নূর ইসলাম (৭৫) নামে অবসরপ্রাপ্ত এক শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মো. নূর ইসলাম উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন।
বরগুনার তালতলীতে পুকুর খননের সময় হিটস্ট্রোকে মো. নয়া মিয়া ফকির (৫০) নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের খোট্টার চর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শ্রমিক খোট্টার চর গ্রামের বাসিন্দা।
বরগুনার আমতলীতে অতিরিক্ত গরমে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের চালিতাবুনিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। অজিতুন নেছা ওই গ্রামের আমজেদ প্যাদার স্ত্রী।
খুলনায় হিটস্ট্রোকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির (৬০) মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নগরীর আড়ংঘাটা থানা এলাকার খুলনা রিজিওনাল ক্যান্সার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সামনে তার মৃত্যু হয়।
হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গতকাল চার নির্দেশনা জারি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশে তীব্র তাপপ্রবাহ বিদ্যমান আছে। এ অবস্থায় সুস্থ থাকতে সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই।
নির্দেশনাগুলো হলো : ১. তীব্র গরম থেকে দূরে থাকুন, মাঝে মাঝে ছায়ায় বিশ্রাম নিন। ২. প্রচুর পরিমাণে নিরাপদ পানি পান করুন। হেপাটাইটিস এ, ই, ডায়রিয়াসহ প্রাণঘাতী পানিবাহী রোগ থেকে বাঁচতে রাস্তায় তৈরি পানীয় ও খাবার এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে একাধিকবার গোসল করুন। ৩. গরম আবহাওয়ায় ঢিলেঢালা পাতলা ও হালকা রঙের পোশাক পরুন, সম্ভব হলে গাঢ় রঙিন পোশাক এড়িয়ে চলুন। ৪. গরম আবহাওয়ায় যদি ঘাম বন্ধ হয়ে যায়, বমি বমি ভাব দেখা দেয়, তীব্র মাথাব্যথা হয়, শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, প্রস্রাব কমে যায়, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হয়, খিঁচুনি ও অজ্ঞান হওয়ার মতো কোনো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে অবিলম্বে হাসপাতালে যান এবং ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আজিজুর রহমান জানান, এপ্রিলে দাবদাহ কমছে না। বৃষ্টির সম্ভাবনাও নেই। মে মাসের শুরুতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হতে পারে। তখন তাপমাত্রা কমে আসতে পারে।
অন্যদিকে চলমান দাবদাহ থেকে পরিত্রাণ পেতে বৃষ্টির জন্য গত দুই দিন রাজধানীসহ দেশের বহু এলাকায় সালাতুল ইসতিস্কা আদায় করা হয়। প্রখর রোদ ও গরমের মধ্যে খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে চোখের পানিতে বৃষ্টির জন্য মুসল্লিরা ফরিয়াদ করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ এমন হচ্ছে। আমরা যেটা বুঝতে পারি, এখন আবহাওয়া এক ধরনের অনিয়মিত অবস্থায় চলে গেছে। বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। আগে আমরা ঋতু ধরে বলতে পারতাম কখন কী হবে। কিন্তু এখন সেটা বলা সম্ভব না। এটা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে না, সারা বিশ্বেই এমন অবস্থা। এটার জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। আমরা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছি। আরেকটা বিষয় হলো শিল্পায়নের আগে যে তাপমাত্রা ছিল, শিল্পায়নের পর তাপমাত্র এক ডিগ্রি বেড়ে গেছে। ফলে আমরা যে উষ্ণতার দিকে যাচ্ছি, সেটা তো আগে থেকেই ধারণা করা হয়েছিল। এখন সেটাই হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ও ব্র্যাকের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির পরিচালক গওহাব নঈম ওয়ারা বলেন, আবহাওয়ার কিছু পরিবর্তন তো আছেই। আর আমরাই আসলে এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী। গাছ কেটে আমরা কংক্রিটের শহর বানাচ্ছি। ঢাকা শহরে যে গাছগুলো দেখা যাচ্ছে সেগুলো ইউক্যালেকটাস বা শিমুল কাছ। এগুলো তো আমাদের গাছ না, আমাদের নিজেদের যে গাছ সেগুলো থাকলেও পরিস্থিতির উন্নতি হতো। আবার দেখেন, কিছুদিন ধরে আমরা লক্ষ্য করছি, চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হচ্ছে। এর কারণ কী জানেন? তাপমাত্রা মাপার যে যন্ত্র সেটা চুয়াডাঙ্গাতে বসানো হয়েছে, সে কারণে ওখানের তাপমাত্রা বেশি দেখাচ্ছে। পাশের জেলা মেহেরপুরের তাপমাত্রা কি কম? আসলে না। এমন অনেক অসঙ্গতি আছে। তবে আবহাওয়ার এ অনিয়মিত অবস্থার জন্য আমরাই দায়ী।
ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেছেন, চিকিৎসা শাস্ত্র অনুযায়ী, প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ায় শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে শরীরের তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে গেলে ঘাম বন্ধ হয়ে যায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে, তাকে হিটস্ট্রোক বলে। শিশু ও বৃদ্ধদের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কম থাকায় হিটস্ট্রোকের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এ ছাড়া বয়স্ক ব্যক্তিরা যেহেতু প্রায়ই বিভিন্ন রোগে ভোগেন যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস, কিডনি, লিভার বা হার্টের রোগী, স্ট্রোক বা ক্যানসারজনিত রোগে যারা ভোগেন, এমনকি যেকোনো কারণে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম কিংবা নানা ওষুধ সেবন করেন, যা হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে গরমের দিনে কিছু সতর্কতা মেনে চললে হিটস্ট্রোকের বিপদ থেকে বেঁচে থাকা যায়।





