রাজধানীসহ সারা দেশে কার্যকর হয়েছে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮। তবুও ঢাকার সড়কগুলো আগের মতোই বিশৃঙ্খলায় ভরে আছে। নিয়মিত ঘটছে নানান দুর্ঘটনা। গণপরিবহনগুলো আগের মতোই বেপরোয়া। চালকরা প্রতিযোগিতা করে বাস চালাচ্ছে, মানছে না কোনো ট্রাফিক আইনও। আবার সড়কের মাঝখানে যাত্রী ওঠানামাও আগের মতোই চোখে পড়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই পাল্লা দিয়ে বাস চালাতে গিয়ে বিমানবন্দর সড়কে নির্মমভাবে দুই শিক্ষার্থীকে হত্যা করে জাবালে নূর পরিবহনের চালক। বাসচাপায় শিক্ষার্থীদের এ হতাহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে ওইদিনই রাস্তায় নামেন রমিজ উদ্দিনসহ আশপাশের কয়েকটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। রাজধানীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এ আন্দোলনের ঢেউ। সারা দেশের রাস্তায় নামেন লাখো লাখো শিক্ষার্থী। সেখান থেকে সূত্রপাত হয় নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের।
শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলনে তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবি তোলে। রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। গণপরিবহনসহ ব্যক্তিগত গাড়ির কাগজ চেক করাসহ সব ধরনের যানবাহনকে নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। শুরুতে এ আন্দোলনে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নিলেও পরে যুক্ত হন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
এরপর ৬ আগস্ট মন্ত্রিসভায় একটি খসড়া ট্রাফিক আইনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যায় মৃত্যুদণ্ড ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে কারও প্রাণহানি ঘটালে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। আন্দোলনকারীদের ৯ দফা দাবির মধ্যে কয়েকটি পূরণ ও বাকিগুলো পূরণের আশ্বাসে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।
এরপর শিক্ষার্থীরা ফিরে যান শ্রেণিকক্ষে। এতে ৮ আগস্টের মধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
জানা যায়, ওই আন্দোলনের পরে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও ২ সিটি করপোরেশনের তরফে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন চলাকালেই ট্রাফিক সপ্তাহ শুরু করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। চলে ৫ আগস্ট থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত। সেপ্টেম্বরজুড়ে সচেতনতা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। এরপর ২৪ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পালন করা হয় ট্রাফিক সপ্তাহ। এসব উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে সার্বিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব বেশি হয়নি। ফলে চলতি বছর আবার নতুন করে ট্রাফিক আইন বিষয়ে সচেতনতা ও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে লাগাতার কর্মসূচি হাতে নেয় পুলিশ। ১৫ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পালন করা হয় ট্রাফিক শৃঙ্খলা পক্ষ। ১৭ মার্চ থেকে শুরু হয় ট্রাফিকের বিশেষ অভিযান, চলে ৩১ মার্চ পর্যন্ত। এরই মধ্যে ২৪ মার্চ থেকে ঢাকায় নামে স্পেশাল টাস্কফোর্স। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে কাজ করে ১০ মে পর্যন্ত। তারপরও সড়কে দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে না।
গতকাল রোববার রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে সরেজমিনে দেখা যায়, গণপরিবহনগুলো এখনো প্রতিযোগিতা করে বাস চালাচ্ছে। এসব বাস মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়েই যাত্রী নামাচ্ছে আবার দ্রুতগতিতে ছুটতে থাকে।
বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির (এনসিপিএসআরআর) এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চালকদের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, দৈনিক চুক্তিতে চালক, কন্ডাক্টর বা হেলপারের কাছে গাড়ি ভাড়া দেওয়া, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক নিয়োগ, সড়কে চলাচলে পথচারীদের অসতর্কতাসহ ১০টি কারণে দুর্ঘটনা ঘটে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, সড়কে নিরাপত্তা আনতে মালিক-চালক-পথচারী সবাই জড়িত। সুতরাং আমরা কাজ করছি। নানা উদ্যোগ নিয়েছি, এটা চলমান থাকবে।
জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, পথচারী চলাচল ও চালকদের মধ্যে শৃঙ্খলা আনাটাই এই সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা চালক ও পথচারীদের সচেতন করতে ক্যাম্পেইন করছি। এটা চলমান প্রক্রিয়া। ক্রমে অবস্থার উন্নতি হবে।





