মাঘ থেকে ফাল্গুন। বোরো ধান লাগানোর সময়। এছাড়া এই সময় শীতের সবজি থাকে মাঠ জুড়ে। ফসলে পোকার আক্রমণ হয়। পোকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসল। ফসল বাঁচাতে কৃষক কীটনাশক ছিটানো শুরু করেন। এতে সাময়িক পোকা দমন হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে ফসল ও প্রকৃতিতে। উপকারী পোকা মারা যায়। মাছের বংশ বৃদ্ধি বন্ধ হয়। পাখির খাবার কমে যায়। এই অবস্থা দেখে এগিয়ে আসেন স্থানীয় শিক্ষক মতিন সৈকত। তিনি মাঠে নেমে মানুষকে বুঝাতে শুরু করেন জমিতে বিষ প্রয়োগ না করতে। পরবর্তীতে তিনি একজন ঢোল বাদক নিয়ে মাঠে ঘাটে প্রচারণা শুরু করেন।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, তিনি ঢোল বাদক নিয়ে মাঠে নামলে পেছনে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো শিশু কিশোরদের ভিড় লেগে যায়। ঢোলের শব্দ শুনে মাঠ থেকে কৃষক জমির আইলে উঠে আসেন। হাতে পায়ে কাদা নিয়ে দাঁড়িয়ে তার কথা শোনেন। কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার আদমপুর,পুটিয়া,সিঙ্গুলাসহ আশ পাশের গ্রামের দৃশ্য এটি। ৩০বছর ধরে তিনি এই প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। কোথাও মাঠে নেমে ঝাটা জিংলা পুতে দিচ্ছেন। সেখানে এসে পাখি বসে। পাখি এসে পোকা খেয়ে ফেলে। এছাড়া সবজির জমিতে সেক্স ফেরোমেন ফাঁদ দিতে বলেন।
উপজেলার সিঙ্গুলা গ্রামের কৃষক মানিক দাস বলেন, তিনি আড়াই বিঘা জমিতে এবার ধান চাষ করছেন। কীটনাশক ব্যবহার করলে কি ক্ষতি হয় তা তিনি মতিন সৈকত থেকে জেনেছেন। এখন তিনি প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা দমন করেন।
দাউদকান্দির আমিরাবাদ এলাকার মো. হানিফ খান বলেন, মতিন সৈকতের প্রচারণার কারণে ওই এলাকার মানুষ জমিতে কীটনাশক ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে। এতে পরিবেশ সুরক্ষিত থাকছে। সাথে মানুষ নিরাপদ খাবার পাচ্ছে।
মতিন সৈকত বলেন, তিনি নিজেও কৃষক। শৈশবে যে নিরাপদ খাবার আর নির্মল পরিবেশ পেয়েছেন। তা হারিয়ে যাওয়ার পথে। বাতাসে এক সময় খুব কীটনাশকের ঘ্রাণ ভেসে বেড়াতো। ৩০ বছর ধরে ঢোল বাজিয়ে প্রচারণা করছেন। প্রথমে মানুষ পাত্তা দিতো না। এখন আগ্রহ নিয়ে শুনতে চায়। পরামর্শ নেয়। ধীরে ধীরে কীটনাশকের ব্যবহার কমছে। এছাড়া তিনি পরিবেশ বিষয়ে গবেষণা এবং জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিবেশ স্কুলের প্রতিষ্ঠা করেছেন।
দাউদকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সারোয়ার জামান বলেন, কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে মতিন সৈকত দারুণ ভূমিকা রাখছেন। প্রত্যেক উপজেলায় তার মতো উদ্যোমী একাধিক মানুষ থাকলে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার কমে আসতো।
দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম খান বলেন, দাউদকান্দি এলাকায় পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছেন মতিন সৈকত। এরকম নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো মানুষের সংখ্যা সমাজে কম।
পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপ-পরিচালক শওকত আরা কলি বলেন, মতিন সৈকতের পরিবেশ রক্ষায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি গ্রামে বাস করেও বহুমুখী কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত। সমাজে তার মতো মানুষের সংখ্যা বাড়লে পরিবেশ আরো বেশি সুরক্ষিত থাকবে।





