চাল নিয়ে দিশেহারা সরকার

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

চাল নিয়ে দিশেহারা সরকার

  • মোহসিন কবির
  • প্রকাশিত ২ এপ্রিল, ২০২১

গত ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুতের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ২১ হাজার টন, যার মধ্যে চালের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৩৭ হাজার টন। এরপর গত ৮ মার্চে সরকারি মজুতের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৬.২৬ লাখ টনে, যার মধ্যে চাল ৫.২৮ লাখ টন এবং গম ০.৯৮ লাখ টন। ২১ মার্চ মজুতের পরিমাণ দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার ৭১ টনে (চার লাখ ৭৭ হাজার ২৭ টন চাল এবং ৭৯ হাজার ৪৪ টন গম)। আর সবশেষে গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত সরকারের খাদ্যগুদামে মোট খাদ্যশস্য মজুত নেমে দাঁড়ায় মাত্র চার লাখ ৮৩ হাজার টনে। এর মধ্যে চার লাখ ১২ হাজার টন চাল এবং বাকি ৭১ হাজার টন গম। অর্থাৎ চালের মজুত ক্রমেই কমে আসছে। অথচ দেশের খাদ্যভান্ডারে নিরাপদ মজুত হিসেবে কমপক্ষে ১০ লাখ টন খাদ্যশস্য জমা থাকতে হয়। এর মধ্যে ৮ লাখ টন চাল এবং ২ লাখ টন গম। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১২ লাখ টন কম। এ অবস্থায় চালের মজুত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে সরকার। বেসরকারিভাবে কয়েকশ প্রতিষ্ঠানকে চাল আমদানির অনুমোদন দিলেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে চাল এখনো দেশে এসে পৌঁছেনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার জিটুজি পদ্ধতিতে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। গত ১০ মার্চ সরকার জরুরি ভিত্তিতে জিটুজি পদ্ধতিতে ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে তিন লাখ ৫০ হাজার টন সিদ্ধ ও আতপ চাল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। 

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়।

সভায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সোর্স থেকে চাল আনার চেষ্টা করছি। এর একটাই কারণ, কোনো জায়গায় ফেল করলে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। সে কারণে আমরা রিস্কটা মিনিমাইজ করার জন্য বা আরো কমিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন সোর্স থেকে কেনার ব্যবস্থা করছি।’ চালের মজুত বাড়ানো নিয়ে সরকার কতটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত তা ফুটে ওঠে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘চাল নিয়ে কোনো রিস্ক না নেওয়ার জন্যই ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কত দামে কেনা হবে সেটা পড়ে ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে আবার আসবে।’

মূলত চাল আমদানি নিয়ে বেশ জটিলতা তৈরি হওয়ার কারণেই সরকার উদ্বিগ্ন। এর অন্যতম কারণ হলো, যেসব চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে তার বেশিরভাগই এখনো আনা যায়নি। গত কয়েক মাসে এ পর্যন্ত বেসরকারি পর্যায়ে ১২ লাখ টন এবং সরকারিভাবে সাড়ে ৯ লাখ টন চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে সাত লাখ টন চাল সরকারের কাছে এসে পৌঁছেছে। পরিবহন জটিলতার কারণে বাকি চাল এখনো দেশে আনা সম্ভব হয়নি।

মজুত নিয়ে সরকারের দুশ্চিন্তার বিষয়টি স্বীকার করে খাদ্য সচিব ড. নাজমানারা খানুম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘যে পরিমাণে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সে হিসাবে চাল কমই এসেছে। যতটা আশা করেছিলাম সেভাবে আসেনি। ১ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় সরকারিভাবে ২ লাখ ৫৪ হাজার টন চাল এসেছে। এ ছাড়া বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে কয়েক হাজার টন। বেসরকারি পর্যায়ে ৫ লাখের কিছু বেশি এসেছে।’

মূলত ভারতের নদীগুলোতে নাব্য না থাকা এবং জাহাজ সংকটকে দায়ী করে যথেষ্ট পরিমাণে চাল আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান খাদ্য সচিব। তিনি বলেন, ‘জাহাজগুলো ছোট হওয়ায় পোষাতে পারছি না। প্রতিটি জাহাজে মাত্র সাড়ে ৮ হাজার, সাড়ে ৬ হাজার টন চাল পরিবহন করা যায়। মূলত বড় বড় জাহাজে যেভাবে গম আসে চালের জন্য সেরকম জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। গমের জাহাজগুলোতে ৫০ হাজার টনেরও বেশি পরিবহন করা যায়। কিন্তু ভারতের নদীগুলোতে নাব্য না থাকায় সেখান থেকেও বড় জাহাজে চাল আনা যাচ্ছে না। সর্বোচ্চ ৫ হাজারের কিছু বেশি আনা যাচ্ছে। তা ছাড়া সারা বিশ্বে জাহাজের কিছুটা সংকটও চলছে। বিশেষ করে কলকাতা থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করায় চালের জন্য জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। যেহেতু চাল দরকার সেজন্য আমরা বার্জে হলেও চাল আনার অনুমতি দিচ্ছি।’

অন্যদিকে চাল আমদানিতে নৌপথই সরকারের একমাত্র ভরসা। কারণ সড়ক এবং রেলপথে প্রতিদিন ভারত থেকে দেশে অন্যান্য বিভিন্ন পণ্য আমদানির কারণে চালের জন্য কোনো পরিবহন মিলছে না। এ প্রসঙ্গে সচিব নাজমানারা খানুম বলেন, ‘কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া আমরা স্থলপথে তেমন টেন্ডার দেইনি। যেগুলো দেওয়া হয়েছে সেগুলো এখনো এসে পৌঁছেনি। ট্রেনে চাল আমদানির বিষয়ে যে দুটি প্রতিষ্ঠানকে আমরা অনুমোদন দিয়েছি তাদের মধ্যে একটির সাথে কন্ট্রাক্ট হয়েছে। তারা ট্রেনে করে চাল আনার কথা বলেছে, যদিও সেটা পাওয়াও বেশ কঠিন। রেল র্যাকে অন্যান্য পণ্য আসে। সড়ক এবং রেলপথে পণ্য পরিবহন পাওয়া খুব কঠিন। এ কারণে আমরা সেভাবে চাইনি। রেলপথে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটি এখনো মেলেনি।’

এদিকে সরকার জিটুজি পদ্ধতিতে চাল আমদানির জন্য সাড়ে ৯ লাখ টন ধার্য করলেও চুক্তি হয়েছে মাত্র সাড়ে ৬ লাখ টনের। বাকি দুটি চুক্তি এখনো করা যায়নি। এ প্রসঙ্গে খাদ্য সচিব বলেন, ‘এখনো পাঞ্জাব ও থাইল্যান্ডের সাথে চুক্তি দুটি পেন্ডিং আছে। সে ক্ষেত্রে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে সাড়ে ৬ লাখ টনের। এর মধ্যে আমরা পেয়েছি ২.৫ লাখ টন।’

তবে যে মজুত আছে তাতে আগামী জুন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হবে না বলে জানান তিনি। একই সাথে গমের কাঙ্ক্ষিত মজুতও আগামী ৭-৮ দিনের মধ্যে নিশ্চিত হবে উল্লেখ করে ড. নাজমানারা খানুম বলেন, ‘গম চাহিদা অনুসারে পেয়ে গেছি আড়াই লাখ টনের মতো। এরই মধ্যে তিনটি জাহাজ চলে এসেছে। আরো ২টি জাহাজ ৭-৮ দিনের মধ্যে চলে আসবে।’

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, অভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদা পূরণের পরও চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, অতিবৃষ্টিতে কয়েক দফা বন্যায় ৩৫টি জেলার আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সারা বছরের উৎপাদন ও চাহিদা বিবেচনা করলে দেশে খাদ্য ঘাটতির ‘আপাতত  কোনো আশঙ্কা নেই’।

কিন্তু ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সেই পূর্বাভাস শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়নি। এরপর ধান-চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী চাল আমদানির অনুমতি দেন। এজন্য প্রথমদিকে চাল আমদানি শুল্ক ৬২.৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে কমিয়ে আনা হয়। কিন্তু পরবর্তীসময়ে ব্যবসায়ীদের দাবি এবং আমদানিতে উৎসাহী করতে শুল্ক ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads