বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের সিলেট জোনের কুলাউড়া উপজেলায় অবস্থিত ভাটেরা রাবার বাগানটি প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। গাছ চুরি, চুরি করে কষ পাচার, অনিয়ম দুর্নীতি, বাগান ধ্বংসমুলক কর্মকাণ্ড ও বাগান স্বার্থ বিরোধী কর্মকান্ড ঘটছে প্রতিনিয়ত। রক্ষকরাই অবতীর্ন হয়েছেন ভক্ষকের ভুমিকায়। সম্প্রতি গাছ চুরির ঘটনায় সরেজমিন ভাটেরা রাবার বাগানে গেলে কেঁচো খুড়তে বেরিয়ে আসে সাপ।
১৯৬৫ সালে ১৮শ একর জায়গা নিয়ে ভাটেরা রাবার বাগানটি সৃজিত হয়। উচ্চ ফলনশীল ও উৎপাদনশীল বাগান হিসেবে সিলেটে বিভাগের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু বাগানটি উৎপাদনে আসার পর থেকে অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ক্রমে বাগানটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনিত হয়েছে।
গত ১৯ অক্টোবর ভাটেরা রাবার বাগান থেকে প্রায় লক্ষাধিক টাকা মুল্যমানের আগর গাছ পাচারকালে স্থানীয় লোকজন গাছগুলো আটক করে। আগর গাছ ক্রেতা বড়লেখা উপজেলার রতুলীর বাসিন্দা অলি মিয়া জানান, তার কাছে ৩টি আগর গাছ বিক্রি করা হয়। যার একটি রেষ্ট হাউজের কাছ থেকে কেটে নেয়ার সময় আটক হয়। আরও দু’টি গাছ অফিস সংলগ্ন মসজিদের পাশে বাসার নিকট এখনও আছে। শুধু আগর গাছ নয় বাগান থেকে মুল্যবান শাল, মেহগনি ও কাঠাল গাছ পাচার হয় প্রতিনিয়ত।
বাগান সুত্রে জানা যায়, গাছ পাচারের ঘটনা ধামাচাপায় দিতে বাগান কর্তৃপক্ষ বাবুর্চি তপুকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। কিন্তু ঘটনার সাথে জড়িত মুল হোতারা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আগর গাছ পাচারের ঘটনা সরেজমিন জানতে ভাটেরা রাবার বাগানে গেলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সুত্র জানায়, মুলত বাগানের বড়কর্তার যোগসাজশে ৩ শ্রমিক নেতা এই ঘটনার সাথে জড়িত। শুধু গাছ পাচার নয়, সকল অপকর্মেই এদের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে বলে জানা গেছে।
সকল অপকর্মেই যাদের মদদ থাকে এরা হলেন- ভাটেরা রাবার বাগান শ্রমিক কর্মচারি ইউনিয়নের সভাপতি লিলু মিয়া, সেক্রেটারি বাদশা মিয়া ও সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল হান্নান। তাদের অপকর্মকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নিরবে সমর্থন করেন যিনি ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন। কাজ বাস্তবায়নে কেবল মাঠে যে শ্রমিক থাকেন তিনি হন বলির পাঠা।
সভাপতি লিলু মিয়া পেশায় ভারপ্রাপ্ত টেপিং সুপারভাইজার, সাধারণ সম্পাদক বাদশা মিয়া টেপিং সুপারভাইজার ও সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর হান্নান টেপার। অপকর্মের হোতা এসব শ্রমিক নেতারা সবাই স্থানীয় বাসিন্দা বলেই এদের খুঁটির জোর বেশি। তাছাড়া সরকারি চাকুরি বিধি লঙ্ঘন করে এরা গত ২০-৩০ বছর থেকে একই কর্মস্থলে হওয়ায় একেকজন দুর্নীতির বটবৃক্ষ হয়ে আচেন। কোন শ্রমিকই কিংবা কর্মকর্তা তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে টিকে থাকা দুষ্কর। তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্তে আসা কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে তারা স্বপদে টিকে যান। এরা নেতা হওয়ার সুবাদে তাদের বাগানে কাজ করতে হয় না। বাগানে অফিস সংলগ্ন এলাকায় এরা সারাদিন ঘুরঘুর করে। তাদের স্থলে দৈনিক মজুরিতে শ্রমিক নিয়োগ করে তারা অফিস এলাকায় অবস্থান করে নান অনৈতিক কাজ বাস্তবায়নের চিন্তায় মত্ত থাকেন। কাজ না করে সরকারি বেতন ভাতা উত্তোলন করে এবং তাদের স্থলে কর্মরত শ্রমিকদের দিয়ে কষ পাচার করে মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করেন। এদেরই অপর এক সহযোগি টেপিং সুপার আজিজুল ইসলাম। গত ১৯ মার্চ তৎকালীন ম্যানেজার মো. আরিফ হোসেন ৭নং কষ সেন্টারের কষ পাচারের প্রমাণ পান। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে অন্য জোনে বদলীর জন্য বশিউক সদর দফতরের মহাব্যবস্থাপক (রাবার) কে লিখিতভাবে জানান ম্যানেজার মো. আরিফ হোসেন। কিন্তু স্থানীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে টেপিং সুপারভাইজার আজিজুল ইসলাম মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে স্বপদে বহাল আছেন। ৮নং টেপিং এরিয়া বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উচ্চ ফলনষীল ও উৎপাদনশীল এলাকা। কিন্তু ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ এই দুই বছরের কর্ষ রেকর্ড ও বর্তমান কষ রেকর্ড পর্যালোচনা করলে কষ পাচারের সত্যতা প্রমানিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে ভাটেরা রাবার বাগান শ্রমিক কর্মচারি ইউনিয়নের সভাপতি লিলু মিয়া, সেক্রেটারি বাদশা মিয়া ও সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল হান্নান তাদের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাদের পক্ষে লিলু মিয়া জানান, গাছ পাচার, কষ পাচার বা কোন অনৈতিক কাজের সাথে তারা জড়িত নন। তারা বাগানে রাজনীতির শিকার। তবে কর্মঘন্টায় অফিস এলাকায় অবস্থানের কোন সদুত্তর দিতে পারেন নি।
বাগান ম্যানেজার একেএম হুমায়ুন কবির জানান, তিনি বাগানে নতুন যোগদান করেছেন। রাবার গাছ ছাড়া অন্য কোন মুল্যবান গাছ নেই বাগানে। আগর গাছ চুরির বিষয়টি তদন্তধীন আছে। এঘটনায় জিএম অফিসের শ্যামল কান্তি দে’কে প্রধান করে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি এবং স্থানীয়ভাবে শাহাবুজ্জামান চৌধুরীকে প্রধান করে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আমার চাকরি জীবনে কোনদির আগর গাছের নাম শুনিনি। এর সম্পর্কে কোন ধারণাও ছিলো না।





