করোনা সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় আগামীকাল সোমবার থেকে সারা দেশে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। গতকাল শনিবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ার পর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
লকডাউন বিষয়ে গতকাল বিকালে জরুরি বৈঠক ডাকেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসসহ সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব ও সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও লকডাউন বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থা ও দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে লকডাউনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। চূড়ান্ত করা হয়েছে লকডাউন বাস্তবায়নের কৌশল। এছাড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হলে সেখানে শ্রমিকরা কীভাবে কারখানায় আসবে এবং কীভাবে কাজ করবে তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা শেষ করে তার জন্য কৌশলও চূড়ান্ত হয়েছে।
সোমবার থেকে এক সপ্তাহের জন্য সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা করছে সরকার সেতুমন্ত্রীর এই ব্রিফিংয়ের পর জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানান, লকডাউনের মধ্যে জরুরি সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব ধরনের সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা থাকবে শিল্পকারখানা।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানুষের চলাফেরা যাতে কমাতে পারি সেজন্য আমরা আপাতত এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন দিচ্ছি। জরুরি সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান, ডিসি অফিস, ইউএনও অফিস, ফায়ার সার্ভিস অফিস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অফিস, সংবাদপত্র অফিস খোলা থাকবে। লকডাউনের মধ্যে শিল্পকারখানা খোলা থাকবে। তবে সেখানে একাধিক শিফট করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাতে শ্রমিকরা কাজ করেন-সেটা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে তো আবার গত বছরের মতো শ্রমিকদের বাড়ি যাওয়ার ঢল শুরু হয়ে যাবে।
এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি অফিস-আদালত বন্ধ থাকবে। সব ধরনের মার্কেট বন্ধ থাকবে। গণপরিবহন বন্ধ থাকবে কি না জানতে চাইলে ফরহাদ হোসেন বলেন, আমরা যখন এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করব সেখানে তা স্পষ্ট করে বলা হবে। এখনই এ বিষয়ে বলছি না। মানুষের চলাচল যাতে একেবারে সীমিত করে ফেলা যায় আমরা সেই পদক্ষেপ নেব। কেউ অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে পারবে না। অনেক লোক বিভিন্ন স্থানে গিয়ে আটকে থাকতে পারে, তাদের সেই সুযোগটা দিয়ে একদিন পর লকডাউন দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী।
উল্লেখ্য, গত বছরের মার্চে দেশে প্রথমবার করোনা শনাক্ত হওয়ার পর বেশকিছু দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। সেই ছুটির পর ধাপে ধাপে কার্যক্রম স্বাভাবিক হয় দেশে। ওই বছরের শেষ দিকে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমতে থাকলেও এ বছরের মার্চের শেষ দিক থেকেই তা হুট করে বাড়তে থাকে। গত কদিনে সংক্রমণ শনাক্তে আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুও হচ্ছে অর্ধশতসংখ্যক। সংক্রমণে লাগাম দিতে গত ২৯ মার্চ সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়সহ সকল ক্ষেত্রে সব ধরনের জনসমাগম সীমিত করাসহ ১৮ দফা নির্দেশনা জারি হয়। এরপর সেগুলো বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ও কড়াকড়ির ঘোষণা আসতে থাকে।
খোলা থাকবে গার্মেন্টস : করোনা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হওয়ায় আগামীকাল থেকে এক সপ্তাহের জন্য সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা করছে সরকার। তবে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখার লক্ষ্যে গার্মেন্টস কারখানাগুলো চালু থাকবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ড. রুবানা হক। গতকাল তিনি বলেন, সরকারের সব সিদ্ধান্ত মেনে গার্মেন্টস কারখানা চালু থাকবে। শ্রমিকরা যাতে করোনায় আক্রান্ত না হয় সেজন্য কারখানাগুলোতে সামাজিক দূরত্ব মানতে বাধ্য করা হবে। এদিকে রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, সরকারের সব সিদ্ধান্ত মেনে আমরা গার্মেন্টস কারখানা খোলা রাখবো। তার মতে, শ্রমিকরা কারখানায় যতটা নিরাপদ, কারখানার বাইরে ততটা নিরাপদ নয়। এ কারণে আমরা আগের মতোই কারখানা খোলা রাখবো। তবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করার ক্ষেত্রে আমরা আগের চেয়ে বেশি সতর্ক থাকবো। তিনি বলেন, শ্রমিকরা বাসায় বা বাজারে বা মাঠে-ঘাটে নিরাপদ নয়। অফিসেই তারা বেশি নিরাপদ। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, গত বছরও গার্মেন্টস সেক্টর তথা রপ্তানিখাত লকডাউনের আওতামুক্ত ছিল। আশা করছি, এ বছরও সরকার গার্মেন্টসখাতকে লকডাউনের আওতা মুক্ত রাখবে। তিন মাস বা চার মাস আগে যেসব অর্ডার এসেছে, সেই পণ্য তৈরি করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানা ও সর্বোচ্চ সতর্ক থাকায় গতবারও গার্মেন্টস সেক্টরে তেমন কোনো দুর্যোগ হয়নি। এ বছরও যেমন দুর্যোগ হবে না আশা করছি।
লেনদেনে সমস্যা হবে না : মহামারী সামাল দিতে লকডাউনের ঘোষণা এলেও দেশের বিনিয়োগকারীদের লেনদেনে কোনো সমস্যা হবে না বলে জানিয়েছেন দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ব্যাংক চললে পুঁজিবাজারও চলবে বলে গতকাল শনিবার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রুখতে সরকার এক সপ্তাহ লকডাউন ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ নিয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, বাংলাদেশে ব্যাংকের কার্যক্রম চালু থাকলে পুঁজিবাজার খোলা থাকবে। আর এখন বিনিয়োগকারীদের কোনো সমস্যা হবে না, যেহেতু সব অটোমেটেড বিনিয়োগকারীরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বা ফোনে লেনদেন করতে পারবেন। নিয়ম মেনে ব্রোকারেজ হাউজগুলো খোলা থাকবে। ব্রোকারেজ হাউজ ট্রেডাররা নিয়ম মেনে বসবে, বিনিয়োগকারীরা লেনদেন চালিয়ে যেতে পারবেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মহামারীকালসহ যে কোনো সময় ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু থাকলে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে পুঁজিবাজারের সকল লেনদেন চালু থাকবে। এ ব্যাপারে বিনিয়োগকারীদের কোনো রকম গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছে ডিএসই। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) পক্ষ থেকেও একই কথা বলা হয়েছে।
চলবে টিকাদান কর্মসূচি : লকডাউনে করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকাদান কর্মসূচি চলবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন। বলেন, আগামী ৫ এপ্রিল থেকে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া বন্ধ হচ্ছে। দ্বিতীয় ডোজ আগামী ৮ এপ্রিল থেকে শুরু হবে। যারা টিকা নেবেন তারা কাছের টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে কার্ড দেখিয়ে নেবেন।
ব্যাংক নিয়ে সিদ্ধান্ত আজ : এক সপ্তাহের লকডাউন দেওয়া হলে ব্যাংক কীভাবে চলবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত রোববার (আজ) আসছে বলে জানিয়েছেন আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম। বলেন, এক সপ্তাহের লকডাউনে ব্যাংকগুলো বন্ধ থাকবে, নাকি খোলা থাকবে; খোলা থাকলেও কতক্ষণ-কীভাবে লেনদেন হবে-এ সব বিষয়ে জানা যাবে রোববার। বলেন, আজ (শনিবার) ছুটির দিন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বন্ধ। অবশ্য ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে চলতে বলবে, ব্যাংকগুলো সেভাবেই চলবে। এ প্রসঙ্গে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আশা করছি, রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে আমাদের একটি নির্দেশনা বা গাইডলাইন দেবে। সোমবার থেকে যেহেতু লকডাউন, সেহেতু আমরা সেদিন থেকেই সরকারের ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মানতে পারবো। এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, লকডাউন হয়ে গেলে ব্যাংকে গ্রাহক আসবে কোত্থেকে। ফলে সাত দিন ব্যাংক বন্ধ রাখা যেতে পারে। তবে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে যেখানে খুব প্রয়োজন সেখানে ব্যাংক সীমিত আকারে চালু রাখা যেতে পারে।
যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ : আগামীকাল সোমবার থেকে পরবর্তী সাত দিন যাত্রীবাহী সব ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করবে। গতকাল সন্ধ্যায় বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার শাহাদাত আলী এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
প্রজ্ঞাপনের পর গণপরিবহন সিদ্ধান্ত : লকডাউন সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপনের পর গণপরিবহন চলাচলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)। গতকাল বিকালে বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, আমরা প্রজ্ঞাপনের জন্য অপেক্ষা করছি। সেটি হাতে পাওয়ার পর গণপরিবহন চলাচলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, গণপরিবহনে বর্ধিত ভাড়ায় অর্ধেক যাত্রী বহনের বিষয়ে আমরা কঠোর নজরদারি করছি। আটটি ম্যাজিস্ট্রেট দল কাজ করছে।
বাজারে ভিড় : রমজান আসছে বলে কিছু কিছু পণ্যের দাম বাড়ছিল, এবার লকডাউনের ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরো অস্থির হয়ে উঠেছে নিত্যপণ্যের বাজার। সরকারের কোনো হুমকি-ধামকি কাজে আসেনি। স্বভাবগতভাবেই একশ্রেণির ক্রেতার যেমন ভিড় লেগেছে বাজারসহ পাড়ামহল্লার দোকানে, সেই সুযোগটি লুফে নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরাও। চলছে চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্য কেনাকাটার ধুম। লকডাউন শুরু হলে সব কিছু বন্ধ হয়ে যাবে- এ আশঙ্কায় নিত্যপণ্য মজুতের যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, দুপুর থেকেই ক্রেতারা শুকনো পণ্য- পেঁয়াজ, আলু, ডিম বেশি করে কেনা শুরু করেছেন। বর্তমানে পণ্যগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে। ক্রেতারা যেভাবে পণ্য কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন, তাতে যে কোনো মুহূর্তে এসব পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। তবে ক্রেতারা অস্বাভাবিক আচরণ না করলে দাম বাড়ার তেমন সম্ভাবনা নেই।





