জাফরুল ইসলাম
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা ওইসিডি হুঁশিয়ার করে দিয়েছে যে, বিশ্ব অর্থনীতির ওপর করোনা ভাইরাসের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে অনেক বছর সময় লেগে যাবে। ওইসিডির মহাপরিচালক এঞ্জেল গুরিয়া বলেছেন, এই মহামারী থেকে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, তার থেকে বেশি বড় হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এর আকস্মিকতা। তিনি বলেন, কেউ যদি ভাবে দেশগুলো দ্রুত তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি সামলে উঠতে পারবে তাহলে সেটা হবে একটা ‘স্তোক বাক্য’। ওইসিডি সরকারগুলোর কাছে আহ্বান জানিয়েছে তারা যেন তাদের ব্যয়নীতি ভুলে গিয়ে দ্রুত ভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে এবং ভাইরাসের চিকিৎসার পেছনে মনোযোগ দেয়।
কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর কি সেই সামর্থ্য আছে, থাকলেই বা কতটুকু? গত দশ মাস ধরে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশই করোনা মহামারীর কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলোতে। এসব দেশকে অর্থনীতির দিক দিয়ে চাঙা করার জন্য বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, চীনের অর্থনীতি ক্ষতির মধ্যে পড়েনি। তারা কৌশলে এই মহামারীকে প্রতিরোধ করতে পেরেছে। এ তো গেল অর্থনীতিতে মজবুত বিশ্বের একটি দেশের অর্থনৈতিক চিত্র। তাহলে এই সময় বাংলাদেশনামক নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন তা দেখে নেওয়া যাক।
গত শুক্রবার সিইবিআর তাদের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবল রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। যেখানে দেখানো হয়েছে, আগামী ১৫ বছরে বিশ্বের কোন দেশের অর্থনীতি কী কী হারে বাড়বে। যেখানে বলা হয়, মাত্র ৭ বছর পর চীন হবে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। ২০৩০ সালে ভারত হবে তৃতীয়। আর ২০৩৫ সাল নাগাদ ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হবে ২৫তম। বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। কীভাবে বাংলাদেশের এমন সাফল্য অর্জন হলো? যেখানে করোনানামক মহামারী প্রতিনিয়ত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে। বাংলাদেশের এমন সাফল্যের পেছনে দুটি বিষয়ে কাজ করছে। একটি হলো রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এবং তৈরি পোশাক। তবে এখানে পোশাকের চেয়ে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব বেশি। কারণ তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রায় ৪৪ ভাগ খরচ হয় এই কাঁচামাল আমদানিতে। অন্যদিকে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রাগুলো দেশেই থাকে। গেল বছর অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অংশ ৫.৫২ অর্থাৎ ১৮২০.৫০ কোটি ডলার, আর রপ্তানিতে ৩৩৬৭.৪০ কোটি ডলার।
অন্যদিকে বাংলাদেশের গত পাঁচ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১ শতাংশ হারে। এছাড়াও কোভিড-১৯ যেভাবে ছড়িয়েছে, সে তুলনায় বাংলাদেশে সীমিত রাখা গেছে অর্থাৎ ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশে মারা গেছে সাত হাজার ৫২ জন। প্রতি লাখে চারজন অতি নগণ্য। আর বাংলাদেশ ২০২০ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ৩.৮ শতাংশ এবং ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হবে ৫.৮ শতাংশ হারে, আশা করা যাচ্ছে। আর পরের দশ বছরের কিছুটা কমে ৬.৫ শতাংশ হবে। এ ছাড়াও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ ২০৩৫ সাল নাগাদ ২৫তম স্থানে উঠে আসবে। বর্তমান রয়েছে ৪১তম স্থানে। দশ বছরে যেভাবে তালিকা রদবদল হবে বলে মনে করা হচ্ছে, সেখানে বর্তমানে দশটি দেশের তালিকায় প্রথম যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ভারত, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা এবং কোরিয়ার নামই থাকবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
কিন্তু ২০৩৫ সালে প্রথম দেশ হিসেবে স্থান হবে চীনের এবং তৃতীয় স্থানে আসবে ভারত। আর ২৫টি দেশের তালিকায় যুক্ত হবে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও বাংলাদেশ। যার ফলে বাংলাদেশ ছাড়িয়ে যাবে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিশালী কিছু দেশকে। যাদের মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ডেনমার্ক, হংকং, আরব আমিরাত, মিশরসহ আরো অনেক প্রভাবশালী দেশ। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে এই সূচক নির্ধারিত হয়েছে জিডিপির আকার দিয়ে। তাই বাংলাদেশকে সম্ভাব্য অবস্থান ধরে রাখতে হলে জিডিপির মান ঠিক রাখতে হবে। এই জিডিপির মান ঠিক রাখার জন্য জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক কিছু সূচকেও উন্নয়ন বাধ্যতামূলক বলে মনে করছি। যেমন— সবার আগে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিষয়টি উঠে আসে। বিগত বছরে করোনা মোকাবিলায় সরকারের প্রণোদনা যা নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ ছিল তা এদেশের কতিপয় অসাধু রাজনীতিক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ‘নয়-ছয়’-এ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ছুঁতে পারেনি। বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন বছরের পরিকল্পনা করতে হবে বর্তমান সরকারকে। এক্ষেত্রে দেশের সব মানুষকে এক হয়ে কাজ করতে হবে তবেই এমন উন্নয়ন সম্ভব।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়





