এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু হয়। এ কথা এখন আমরা সবাই জানি। গত বছরও দেশের মানুষের কাছে মারাত্মকভাবে আতঙ্কের কারণ ছিল এই রোগটি। এবার করোনা সংক্রমণের প্রভাবে ডেঙ্গুর কথা কেউ বলছি না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ছিল ৭৩ জন।
এ বছর, ২৬ মার্চ পর্যন্ত দেশে এ রোগী শনাক্ত হয়েছে ২৬৯ জন। অবশ্য তাদের সবাই চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। আর গতকাল শুক্রবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এক ব্যক্তি রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রথম তিন মাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় চার গুণ বেশি।
সাধারণত এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। মৌসুম শুরুর আগে মার্চ মাস থেকেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে কর্মসূচি শুরু করার কথা। কিন্তু করোনাভাইরাস নিয়ে আলোচনায় মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মনোযোগ কমেছে।
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে শহরের বিভিন্ন জায়গা জীবাণুমুক্ত করছেন সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। মশার ওষুধ ছিটানো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বছরের প্রথম তিন মাসে এডিস মশার ঘনত্ব অন্যান্য বছরের চেয়ে বেশি। এ বছর ডেঙ্গু মৌসুমে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা গত বছরকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
মশার বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গবেষণা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার। বলেন, বছরের প্রথম তিন মাসে আক্রান্ত রোগী এবং এডিস মশার ঘনত্ব দেখে ধারণা করা যায়, এ বছরের জুলাই ও আগস্টে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়বে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আগে থেকে নাগরিকদের সচেতন করা এবং এডিস মশার বংশবিস্তারের স্থান নিয়ন্ত্রণের কাজে জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ গতবারের চেয়েও বেশি হতে পারে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতি নিয়েও আছে প্রশ্ন।
গত বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা এর আগের সব বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৯ সালে সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন।
ডেঙ্গু মৌসুম শুরুর আগেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশের সিটি করপোরেশনগুলোকে নিয়ে একাধিক প্রস্তুতিমূলক সভা হয়েছে বলে জানান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম আরও বলেন, মশার ওষুধ সংগ্রহ, মশার ঘনত্ব নিয়ে জরিপ চালানোসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশা নিধন, জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে বলে জানান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান আরও বলেন, আগে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাদানের সঙ্গে জড়িতদের দিয়ে ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতামূলক কাজ করানো হতো। এখন তাদের করোনাভাইরাস মোকাবিলায় যুক্ত করা হচ্ছে। স্কুলগুলোতে আগে পরামর্শ ও সচেতনতামূলক কাজ করা হতো, তা এখন করা যাচ্ছে না।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, গত বছর এই সময়ের তুলনায় এবার এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি দ্বিগুণের বেশি। সচেতনতা না বাড়লে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়ানক হবে বলে মনে করছে সংস্থাটির স্বাস্থ্য বিভাগ।
ডিএসসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত নগরের ৯১ হাজার বাড়িতে এডিসের লার্ভা ধ্বংস করেছে ডিএসসিসি। অভিযানে নির্মাণাধীন বাড়িতেই এডিসের লার্ভা বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
তবে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আহমেদ বলেন, এডিসের লার্ভা ধ্বংসে প্রতিদিনই নতুন নতুন বাড়িতে অভিযান চালানো হচ্ছে। নাগরিকদের সচেতন করা হচ্ছে।
মশাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে দুই সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মনোযোগ দিতে হবে। এখন থেকেই এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। তা না হলে কিছুদিনের মধ্যে করোনার মতো ডেঙ্গু পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।





