জাতীয়

চিনিকল শ্রমিক ও আখচাষিদের আন্দোলন

উসকানি দিচ্ছে সিবিএ

  • মোহসিন কবির
  • প্রকাশিত ২১ ডিসেম্বর, ২০২০

সম্প্রতি ৬ চিনিকল বন্ধের ঘটনায় শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিক্ষোভ ও আখচাষিদের আখক্ষেতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় গণমাধ্যমের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পরিবেশন ও সিবিএ নেতাদের উসকানিকে দায়ী করেছে বিএসএফআইসি।

গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিএসএফআইসি গণমাধ্যমকে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পরিবেশন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চলতি ২০২০-২১ মৌসুমে আখ মাড়াই স্থগিত থাকা ৬টি চিনিকলের ক্যাচমেন্ট এলাকায় উৎপাদিত ও কৃষকের সরবরাহকৃত সমুদয় আখ ক্রয় করা হবে। এসব চিনিকলের ক্যাচমেন্ট এলাকার আখ ক্রয় করা হবে না মর্মে গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য পরিবেশন থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। চিনিকলে আখ মাড়াই কার্যক্রম চলতি মৌসুমের জন্য স্থগিত করা হলেও বিগত বছরগুলোর মতো এ বছরও এসব মিলের ক্যাচমেন্ট এলাকায় উৎপাদিত ও কৃষকের সরবরাহকৃত সব আখ ক্রয় করা হবে বলে জানায় বিএসএফআইসি।

বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, ইতোমধ্যে স্থগিতকৃত চিনিকলের আওতাধীন এলাকায় উৎপাদিত আখ পূর্ববর্তী বছরের মতো চিনিকলের নিজস্ব ক্রয়কেন্দ্রে চাষিদের নিকট হতে ক্রয় করে পার্শ্ববর্তী চালু মিলে মাড়াইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এমতাবস্থায় আখচাষিদের কোনো প্রকার গুজবে কান না দিয়ে উৎপাদিত আখ সংশ্লিষ্ট ক্রয়কেন্দ্রে সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, আখচাষিদের উসকানি দেওয়ার জন্য শ্রমিক নেতাদের দায়ী করেছে বিএসএফআইসি। বিএসএফআইসির মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান (চিফ অব পার্সোনেল) মো. রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘আমাদের নেতারা শ্রমিক, কর্মচারী এবং আখচাষিদের নানাভাবে উসকানি দিচ্ছে। আখচাষিরা  স্বেচ্ছায় আখক্ষেতে আগুন দিচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, চাষিদের বিভ্রান্ত করতে সিবিএ নেতারা তাদের ভুল বুঝিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে। এ কারণে চাষিরা মিলে আখ দিচ্ছে না। কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন চাষিরাই। মিল বন্ধ করে শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা দেওয়া হলে মিলগুলো বন্ধের প্রয়োজন কেন হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি সরকারের সিদ্ধান্ত। সরকারের সিদ্ধান্ত আমাদের মানতেই হবে।’ হঠাৎ করে মিলগুলো বন্ধের বিষয়েও তিনি সরকারের সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে বলেন, ‘মিলগুলো পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে না। এগুলো আধুনিকায়নের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা হবে।’  

এদিকে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ৬ চিনিকল বন্ধে সরকারের তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তকে ভিন্ন চোখে দেখছেন টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দিন খান। বাংলাদেশের খবরকে তিনি বলেন, ‘সরকারের অন্তত এক বছর আগে বলা দরকার ছিল যে আগামী বছর মিলগুলো বন্ধ করা হবে। মিল বন্ধের সিদ্ধান্তটা হলো অনেকটা মাথাব্যাথার কারণে গলা কেটে ফেলার মতো।’ যেসব এলাকার মিলগুলো বন্ধ করা হয়েছে সেসব এলাকায় আখের উৎপাদন কম হওয়াকেও মিল বন্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ‘অন্য যেসব এলাকায় চিনিকল রয়েছে সেখানেও আখের উৎপাদন ভালো নয়। সুতরাং এমন অজুহাত ভিত্তিহীন।’ তিনি বলেন, সরকার যদি লোকসান কমাতেই চিনিকল বন্ধ করে থাকে তাহলে শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিচ্ছে কেন? তাদের বেতনভাতা চালু রাখলে লোকসান থেকেই গেল। আর লোকসান অব্যাহত থাকলে বন্ধেরই বা কি প্রয়োজন ছিল, এসব প্রশ্ন রাখেন দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবির সাবেক এই চেয়ারম্যান। 

চলতি মাসে চিনিকলগুলোর অব্যাহত লোকসান এবং উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে সরকার চলতি মাড়াই মৌসুমে হঠাৎ করেই রাষ্ট্রায়ত্ত ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ছয়টি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। গত ৩ ডিসেম্বর এই সিদ্ধান্তের কথা চিঠি দিয়ে সংশ্লিষ্ট মিলগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন-বিএসএফআইসি। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পাবনা সুগার মিল, শ্যামপুর সুগার মিল, পঞ্চগড় সুগার মিল, সেতাবগঞ্জ সুগার মিল, রংপুর সুগার মিল ও কুষ্টিয়া সুগার মিলে উৎপাদন কাজ বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান সনৎ কুমার সাহা। তিনি জানান, ‘চিনিকলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাই সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্দেশ্যেই কারখানাগুলো আপাতত বন্ধ করা হয়েছে।’ এই খবরে ৬টি চিনিকলের শ্রমিক-কর্মকর্তারা চাকরি হারানোর আশঙ্কায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন। একই সঙ্গে আখ মাড়াই বন্ধের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ দেখা দেয় আখচাষিদের মধ্যেও। যদিও আপাতত শ্রমিক-কর্মকর্তাদের কাউকে চাকুরিচ্যুত না করার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে সরকার। একই সঙ্গে অন্য বছরগুলোর মতো এ বছরও এসব মিলের ক্যাচমেন্ট এলাকায় উৎপাদিত ও কৃষকের সরবরাহকৃত সব আখ ক্রয় করার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের এসব কথায় আশ্বস্ত হতে পারছেন না শ্রমিক-কর্মকর্তা ও আখচাষিরা। এ কারণে গত শনিবারও দেশের বিভিন্ন জায়গায় চিনিকল বন্ধ এবং আখ মাড়াই স্থগিতের প্রতিবাদে সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ারে আগুন দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের পাশাপাশি অনেক জায়গায় আখচাষিরা নিজেদের আখক্ষেতে আগুন দিয়েও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জের গোপালপুর গ্রামের এক চাষি নিজের এক একর আখক্ষেতে দুপুর ১টার দিকে আগুন ধরিয়ে দেন। সংবাদ পেয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এছাড়া মহিমাগঞ্জে আগামী ২৪ ডিসেম্বর অর্ধদিবস হরতাল আহ্বান করেছেন শ্রমিক নেতারা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads