আখাউড়ায় স্বাস্থ্য সচেতনতায় জ্ঞান ছড়াচ্ছে 'ক্ষুদে ডাক্তাররা'

প্রতিনিধির পাঠানো ছবি

সারা দেশ

আখাউড়ায় স্বাস্থ্য সচেতনতায় জ্ঞান ছড়াচ্ছে 'ক্ষুদে ডাক্তাররা'

  • কাজী মফিকুল ইসলাম, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
  • প্রকাশিত ১ নভেম্বর, ২০২১

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের খড়মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকালে প্রবেশ করলেই দেখা যায় কোমলমতী শিক্ষার্থীরা ভীষণ ব্যস্ত। শিক্ষার্থীরা কেউ 'রোগী'দের নাম তালিকাভুক্ত করছে, কেউ গম্ভীর মুখে ওজন মাপছে, আবার কেউ দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করছে। কোনো শারীরিক সমস্যা চিহ্নিত করতে পারলে সঙ্গে সঙ্গেই তা রোগীকে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সারা দেশের ন্যায় এ উপজেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচ থেকে ১২ বছর বয়সী এক দল ক্ষুদে ডাক্তার তাদের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

মূলত কোমলমতী শিশুদের স্বাস্থ্য সচেতন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা হিসাবে গড়ে তুলছে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চালু করা হয় ‘ক্ষুদে ডাক্তার’ কার্যক্রম। তারা প্রতিনিয়ত সহপাঠী ও ছোটদের মাঝে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত জ্ঞান ছড়িয়ে দিচ্ছেন । এতে করে কোমলমতী শিশুদের স্বাস্থ্য সচেতন আরও একধাপ এগিয়ে যাচ্ছে উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। ‘ক্ষুদে ডাক্তার’ কার্যক্রম খুবই ফলপ্রদ বলে মনে করছেন সচেতন মহলরা।

সরেজমিনে পৌর শহরের খড়মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তারাগন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দেবগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় ক্ষুদে ডাক্তাররা কেউ নাম তালিকাভুক্ত করছে, কেউ ওজন মাপছে, আবার কেউ দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করছে। সবাই যেন ব্যস্ত সময় পারকছেন বিদ্যালয়ে। স্ব স্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ওইসব কাজে সার্বিক ভাবে শিক্ষার্থীদেরকে সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে আসছেন।

প্রতি বছর জানুয়ারি ও জুলাই মাসে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। এছাড়া ছয়মাস পর পর কৃমি নিয়ন্ত্রক ট্যাবলেট কোমলমতী শিশুদেরকে খাওয়ানো হয়। কিন্তু বর্তমান করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ওইসব কার্যক্রম বন্ধ ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের যৌথ উদ্যোগে রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার একটি অংশ হচ্ছে ফাইলেরিয়াসিস নির্মূল ও কৃমি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পুনরায় সারা দেশে এ কর্মসূচি শুরু হয়। এরমধ্যে গত ২৩ থেকে ২৯ অক্টোবর ওজন, উচ্চতা ও দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করা হয়। ৩০ অক্টোবর থেকে শুরু হয় কৃমি সপ্তাহ। তা চলবে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলছে। বিদ্যালয়ে কৃমি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে জোরদার করার লক্ষ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ২০১১ সাল থেকে উদ্ভাবন করা হয় এই ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রম।

খড়মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তার বাংলাদেশের খবরকে বলেন, এই বিদ্যালয়ে মোট ৬১২ শিক্ষার্থীর সংখা রয়েছে। তৃতীয় শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি শ্রেণির ছয় জন করে মোট ১৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ক্ষুদে ডাক্তারের দল গঠন করা হয়েছে। প্রতি শ্রেণিতে ছয়জনের মধ্যে তিনজন ছাত্রী রয়েছে। তুলনামূলকভাবে যারা বড়, চটপটে শিক্ষার্থী তাদের ক্ষুদে ডাক্তার বানাতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। অ্যাপ্রোন, ওজন মিটার, উচ্চতা মাপার স্কেল বা ফিতা ও দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার চার্ট (আই চার্ট) বিদ্যালয় থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। ক্ষুদে ডাক্তারদের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হয়।

পৌর শহরের তারাগন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ক্ষুদে ডাক্তার কাজী জান্নাতুল মাওয়া, মো. আবু রায়হান মো. সাদাত হোসেন, চতুর্থ শ্রেণির আলী হোসেন, তারা সকলেই বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। বিদ্যালয়ে ‘যখন তারা সাদা পোশাক গায়ে দিয়েছেন তখন নিজেদেরকে ডাক্তারের মতো মনে হয়েছে। বিদ্যালয়ে আমরা নিজেরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সহপাঠি ও ছোটদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার জন্য পরামর্শ দিয়ে আসছে বলে জানায়। তারা আরও বলেন আমরা কেউ ওজন মাপি আবার কেউ উচ্চতা মাপি। আবার কেউ দৃষ্টিশক্তি ঠিক আছে কিনা দেখি। সেসব আবার খাতায় লিখে হেড ম্যাডামের কাছে জমা দেন বলে জানায়। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণীর তুলনামূলকভাবে চটপটে এবং বাকপটু শিক্ষার্থীদের 'ক্ষুদে ডাক্তার' বানাতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রতি শ্রেণী বা সেকশনের জন্য ৩ জনের একটি দল হিসেবে ১৫ শিক্ষার্থীর দল বিদ্যালয়ে কাজ করছে। ক্ষুদে ডাক্তারদের ৩ জন মিলে একেকটি দল একজন করে গাইড শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

তারাগন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মৌসুমী আক্তার বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শিশুকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করা। ক্ষুদে ডাক্তারের উদ্দেশ্য হচ্ছে শিশুরা ভবিষ্যতে বড় হয়ে ডাক্তার হবে এবং মানুষের সেবা দিতে উৎসাহী হবে। ছোট থেকেই তাদের সে মানসিকতার উন্নয়ন হবে। তিনি আরও বলেন শিশুদের স্বাস্থ্য সচেতন করে তুলতে এ কার্যক্রম খুবই ফলপ্রদ। পাশাপাশি রোগজীবাণু সম্পর্কে ধারণা ও ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা হাতে-কলমে শিক্ষা পাচ্ছে তারা। সহপাঠীরাই পরস্পরের মাঝে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত জ্ঞানকে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. রাশেদুর রহমান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার একটি অংশ হচ্ছে ফাইলেরিয়াসিস নির্মূল ও কৃমি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। বিদ্যালয়ে কৃমি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে জোরদার করার লক্ষ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ২০১১ সাল থেকে উদ্ভাবন করা হয় এই ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রম। ক্ষুদে ডাক্তারদের স্বাস্থ্য শিক্ষা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা বিষয়ে প্রাথমিক কিছু ধারণা দেওয়া হয়। এরপর তারা তাদের সহপাঠি ও ছোটদের সাথে সেসব বিষয়ে আলোচনা করে। ক্ষুদে ডাক্তাররা নিজেরা সচেতন হবে এবং অন্যদের সচেতন করবে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরজাহান বেগম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, মমত্ববোধ জাগরিত করে একজন প্রকৃত সমাজসচেতন, দেশপ্রেমিক ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এই ক্ষুদে ডাক্তার টিম থেকেই অনেকে ভবিষ্যতে প্রকৃত ডাক্তার হয়ে দেশ ও জনগণের সেবায় এগিয়ে আসবে বলে মনে করেন তিনি। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা ও সহমর্মিতা কামনা করেন তিনি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads