আইনের অপপ্রয়োগ বাড়ছে!

সংগৃহীত ছবি

সারা দেশ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮

আইনের অপপ্রয়োগ বাড়ছে!

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ২ জানুয়ারি, ২০২২

ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে প্রণীত আইনের অপপ্রয়োগ বাড়ছেই। ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করা হলেও, শুরু থেকেই এর মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করা হচ্ছে। এ আইনে গত বছর ২২৫টি মামলা হয়েছে। তারমধ্যে ৩২ মামলায় ৬৮ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। সব মিলিয়ে এসব মামলায় গত বছর ১৬৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অনেক ধারা বাংলাদেশের সংবিধানের মৌল চেতনা এবং মতপ্রকাশ, অবাধ তথ্যপ্রবাহ এবং মৌলিক মানবাধিকার-সম্পর্কিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন ও বিধানের পরিপন্থি। আইনটির ৯টি ধারা বাক‌স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের জন্য হুমকি হওয়াতে এটি সংশোধনের দাবি করেছেন তারা। তবে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, আইনটির যেন অপব্যবহার না হয় এবং মানবাধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়-সেজন্য কাজ করছে সরকার।

প্রায় চার বছর আগে, ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি জাতীয় সংসদে পাস হয়। ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন, বিচার ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান প্রণয়নকল্পে এই আইন প্রণয়ন করে সরকার। আইনটি পাস হওয়ার আগে ও পরে এর কিছু ধারার অপপ্রয়োগ হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়ে আসছে মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম কর্মীরা আইনটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই আইনটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই বেশি ব্যবহার করা হয়। এই আইনে যাদের গ্রেপ্তার করা হয় তাদের অধিকাংশই জামিনে মুক্তির অধিকার থেকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। কাউকে কাউকে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক-মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, এমন অভিযোগও পাওয়া যায়।

এই আইনের অপব্যবহার এমন ভাবেই বাড়ছে যে- দায়ের করা মামলাগুলোর বেশিভাগই অনলাইন, ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও লাইকিতে মুক্তমত প্রকাশের কারণেই হয়েছে। যারা এ আইনের অপব্যবহার করে মামলার মাধ্যমে ভিন্নমত দমন ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করতে চাইছেন, তাদের বেশিভাগই পুলিশ, র্যাব ও ক্ষমতাসীন দল এবং তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল ১৯ এর এক গবেষণা সূত্র জানায়, এ আইনের আওতায় ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা  ৪০ শতাংশ মামলা দায়ের করেছেন। তারাই এই আইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যবহারকারী। একই ধারায়, প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সমালোচনার অভিযোগে মামলা হয়েছে।

আর্টিক্যাল নাইনটিনের দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৯ সালে এ আইনের অধীনে দায়ের করা মোট মামলার সংখ্যা ছিল ৬৩টি। ২০২০ সালে বাংলাদেশে এ আইনের অধীনে দায়ের করা হয়েছে মোট ১৯৮টি মামলা। আসামি করা হয়েছে ৪৫৭ ব্যক্তিকে। ৪১টি মামলার আসামি করা হয়েছে ৭৫ জন পেশাদার সাংবাদিককে। সেগুলোর মধ্যে ১৯ মামলা দায়ের করেছেন ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা নিজেই কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠ লোকজন। সর্বশেষ ২০২১ সলে মামলা হয়েছে ২২৫টি।  এ মামলায় ৪১৭জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৬ জনকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা হয়েছে। দায়েরকৃত মামলার মধ্যে ১৮৬টিই হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের কারণে। এর মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ১৬৩টি মামলা করেছে মিথ্যা ও ভুয়া তথ্য, অশালীন মন্তব্য, আইনের অবমাননা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হেয় করার অভিযোগে। মোট মামলার মধ্যে ৯০টিই হয়েছে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসহ প্রভাবশালী নেতাদের কটুক্তির অভিযোগে। আর ৩২ মামলায় ৬৮জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যদিও এর বেশিরভাগই ছিল তাদের সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে করা রিপোর্ট বা সেগুলো অনলাইনে শেয়ার করার কারণে। এদের মধ্যে ১৫ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আর্টিকেল ১৯ দক্ষিণ এশিয়ার এর আঞ্চলিক পরিচালক ফারুক ফয়সল জানান, ডিজিটাল সিকিউরিটি মামলার বিষয়গুলো আমরা বিশেষভাবে মনিটর করি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হওয়ার পর অস্বাভাবিক দ্রুততায় আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। গত বছর ১৬৬ জন এভাবে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এই সময়ে বিতর্কিত এই আইনে ৬৮ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গেল বছর (২০২০) এই আইনে ৭৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। এছাড়া ২০২১ সালে এ মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে ১৫ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে হাজতে পাঠানো হয়েছে।

ফারুক ফয়সল বলেন, এটি নিশ্চিত যে বর্তমান প্রক্রিয়াগুলো অনলাইনে নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা করতে এবং বাংলাদেশে ডিজিটাল বিপ্লবের কারণে তৈরি হওয়া হুমকিগুলোর সমাধান করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার্থে কাজ করা পেন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের মহাসচিব ড. সৈয়দ আইরিন জামান বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার বেশিরভাগই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দ্বারা না হয়ে অন্যদের মাধ্যমে দায়ের করা হয়েছে। প্রায়ই ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা তাদের নেতাদের পক্ষ নিয়ে মামলাগুলো দায়ের করেন। অভিযোগকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় চিহ্নিত করার পর দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। এসব প্রবণতাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই প্রবণতা দেখাচ্ছে যে কীভাবে একটি আইন উদ্ভূত কর্তৃত্ববাদের দিকে অগ্রসরমান শাসনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এটি ভিন্নমতকে অপরাধে পরিণত করছে। এই আইনের নির্বিচার ব্যবহার বাংলাদেশে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইনটি বাতিল করা জরুরি।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি পাসের পরপরই সম্পাদক পরিষদ ঢাকায়-এর বিরুদ্ধে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল যে আইনটির ৮, ২১, ২৫সহ বেশ কিছু ধারা সংশোধন করতে হবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার স্বার্থে। সে সময় আইনের ৯টি ধারা নিয়ে আপত্তি ছিল সম্পাদক পরিষদের।

গণমাধ্যমের অর্জন ও আগামীর চ্যালেঞ্জ শীর্ষক এক আলোচনায় সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনাম বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের নামে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সাংবাদিকদের হয়রানি করা হচ্ছে। তিনি আদালত বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের কাছে অনুরোধ করে বলেন-আপনারা দয়া করে একটু দেখুন, কিছু কিছু আইন আছে সেগুলো কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, মানহানির মামলার আইনসহ স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য বাধা তৈরি করে এমন সব আইন সংশোধনের দাবি জানান তিনি।

সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী সদস্য শ্যামল দত্ত বলেন, সাংবাদিকতায় বাংলাদেশের ৫০ বছরের অর্জনের সাথে আমরা চ্যালেঞ্জ নিয়েও আলোচনা করেছি। অনেক চ্যালেঞ্জই আছে। কিন্তু এই সময়ে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন মুক্ত ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। আমরা মনে করি এটা এখন খড়গের মতো চেপে আছে। বাংলাদেশে বিশেষ করে তৃণমূলে বহু সাংবাদিক এই আইনটির শিকার হচ্ছেন। গ্রেপ্তার হচ্ছেন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এই আইনটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। এই আইনে কখন কোন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হবে, কে গ্রেপ্তার হবে তা বলা যায় না।

তিনি জানান, আইনটি করার সময় এর কিছু ধারা নিয়ে সাংবাদিকদের বিরোধিতার পর তখন আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, কিছু ধারা সংশোধন হবে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা হলে তিনি নিজে আইনজীবী হিসেবে তাদের পক্ষে দাঁড়াবেন। কিন্তু ‘আইনমন্ত্রীর ওই কথার কোনো প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজন আছে। কিন্তু এও জানি এর আপব্যবহার হয়েছে। এটা যাতে বন্ধ হয় সেজন্য পদক্ষেপ নিয়েছি। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হবার আগে এখন ইনকোয়ারির জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সেলে যাচ্ছে। যদি অভিযোগ মামলা করার মতো হয় তাহলে মামলা আদালতে যাবে। এর আগে যেন কোনো সাংবাদিককে মামলায় জড়ানো না হয়। এখন কিন্তু কোনো সাংবাদিককে মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। আগে যাচাই করা হয়। তাছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার বন্ধে করণীয় কী হতে পারে সেটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

আইনটির বিতর্কিত কয়েকটি ধারা হলো :

# ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করলে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী তা ব্লক বা অপসারণের জন্য টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে। এক্ষেত্রে পুলিশ পরোয়ানা বা অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেপ্তার করতে পারবে।

# আইনে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট যুক্ত করা হয়েছে। ফলে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয়, বা প্রকাশ করে বা কাউকে করতে সহায়তা করে ওই আইন ভঙ্গ করলে এই আইনে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সাজা হতে পারে, ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

# আইন অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার নামে প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালালে বা মদদ দিলে অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

# ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ঘৃণা প্রকাশ, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশ বা ব্যবহার করলে জেল জরিমানার বিধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তিন থেকে সাত সাত বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। দ্বিতীয়বার এরকম অপরাধ করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads