ফিচার

অধ্যাপক শিল্পী হামিদুজ্জামান খানের কাজে আধুনিকতার উপস্থাপন (পর্ব : তের)

  • প্রকাশিত ৩১ অক্টোবর, ২০২১

ভাস্কর শিল্পী : আইভি জামান

শিল্প হামিদুজ্জামান খানকে বঙ্গভবন থেকে একটা স্কাল্পচার করতে বলা হয়। যেহেতু, টিচার তার পর একটু ট্রেইনড, স্কাল্পচারে ভারত থেকে সদ্য মাস্টার্স। শিল্পকলা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন স্কাল্পচারে। সব মিলে তার কাছেই কাজটি মডেল জমা দিতে বলা হলো। সঙ্গে থাকবেন স্থপতি।

তখন বাংলাদেশের চিপ আর্কিটেক ছিলেন শাহ আলম জহিরউদ্দীন। উনি বললেন বঙ্গভবনে জাস্ট সামনে...একটা ফোয়ারা আছে।

শিল্পী হামিদুজ্জামান খানেকে স্কাল্পচার বানিয়ে দিতে হবে। এটা শিল্পী ভাস্কর হামিদুজ্জামান খানের প্রথম দিকের কাজ। বড় কাজ ফাউন্টেনের মাঝে স্কাল্পচারটা থাকবে...এ রকম...একটা কিছু। তাকে ডেকে মডেল করতে বলা হলো।

হামিদুজ্জামান মডেল বানান। কাজটি চব্বিশ ফিট উচ্চতা ব্রোঞ্জের পাইপ দিয়ে আধুনিক ভাস্কর্যের গরন। তৈরি করতে সময় লেগেছিল নয় মাস। সময়টা ছিল উনিশ-শ একাশি থেকে উনিশ-শ বিরাশি। তখন তিনি একটি রুমে থাকতেন। মাত্র সংসার শুরু করেছেন। স্কাল্পচার করার জন্য অনেক জায়গা লাগে, একটা স্পেস দরকার হয়। তখন তার এগুলো কিছুই ছিল না। প্রখ্যাত শিল্পী আমিনুল ইসলাম তখন চারুকলার প্রিন্সিপাল ছিলেন। উনি হামিদুজ্জামানকে মেয়েদের হলের  নিচের তালা কোয়ার্টার দিলেন।

আমার খুব কাছে থেকে এগুলো দেখা। শিল্পী আমিনুল ইসলাম স্যার এই কোয়ার্টার পাওয়ার কথা, উনি নিজে না থেকে হামিদুজ্জামানকে পরিবার নিয়ে থাকার অনুমতি দিলেন। তখন আমি চারুকলায় ভাস্কর্যে পড়ি। হামিদুজ্জামান তখন শিক্ষক ছিলেন। প্রখ্যাত শিল্পী আব্দুর রাজ্জাক আমার ক্লাস নিতেন।

আমার ঘরে বাইরে স্কাল্পচার করা ও দেখার সুযোগ হয়েছিল। আমাদের নিচের তলায় বেশ কয়েকটা রুম। ওই টাইমে কাজও পেয়েছিলেন। মেটাল শিট, পিতলের শিট দিয়ে কাজটি শুরু করলেন। তিনি পাখি থেকে আদল নিয়েছেন। একটা স্ট্রেইট লাইনে পাখিটাকে একটু আধুনিক করে, তিনটে পাখি কম্পোজিশন করলেন। কাজটির নাম পাখি পরিবার। পাখির আধুনিক গরনের উপস্থাপন করলেন। মডেল তৈরির পর তিনি এটাকে এনলার্জ করলেন। আর্কিটেক্টরা তাঁকে সহযোগিতা করেন। ফলে স্কাল্পচারটা খুব সংগঠিতভাবে হলো। স্ট্রাকচার ইঞ্জিনিয়ার সাহায্য করলেন যাতে এটা বহুদিন টিকে থাকে।

বঙ্গভবনের পাখি পরিবার ব্রোঞ্জ পাইপ ও ব্রোঞ্জপাত দিয়ে গড়া। এটা স্ট্রেট লাইনে করা। উপাদানের গুণগত মান ঠিক রেখেই ভাস্কর্যের রূপ দিয়েছেন।

আর জায়গা ছিল খুব ইম্পোর্টেন্ট। বঙ্গভবনের একদম ফ্রন্টে। হামিদুজ্জামান সময় নিয়ে মডেল করে ভালোভাবে করার চেষ্টা করেছেন। শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার হামিদুজ্জামান খানের শিক্ষক ছিলেন। তিনি বললেন, ‘হামিদ, তোমাকে এতো সুন্দর জায়গায় কাজ দিয়েছে? তুমি এটা ভালো করে করার চেষ্টা করো। হামিদুজ্জামান যথেষ্ট চেষ্টা করলেন।

প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী শিক্ষক আমিনুল ইসলাম স্যার অফিসিয়ালি চারুকলার   ভেতরে এখন যেখানে ইতিহাস বিভাগ ওই বাড়িতে ওনার থাকার কথা। ওনার স্ত্রীর বললেন, এরকম বাড়িতে আমি থাকব না। উনি সিলেক্ট করলেন হামিদুজ্জামানকে। তখন অনেক সিনিয়র শিক্ষক ছিলেন। প্রখ্যাত শিল্পী আমিনুল ইসলাম তখন বললেন হামিদুজ্জামান যখন অনেক কাজটাজ করে আমি বাড়িটি ওকে দিতে চাই। তিনি ডেকে বললেন তুমি ফ্যামিলি নিয়ে উঠে পড়ো। স্যার তো একটু এরকম ছিলেন, ওনার কমান্ডও ছিল। এই যে উনি এক রুম থেকে নিচের তলায় বেশ কয়েকটা রুম নিয়ে চারুকলার ভেতরেই অবস্থান করছেন। ওই সময়ে প্রচুর কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। এদিক দিয়ে...তিনি থাকার সুযোগ না পেলে এসব কাজ করা সম্ভব হতো না। কারণ ব্রোঞ্জ-এর পিসগুলো চব্বিশ ফুট বড়,তিনটে স্ট্রাকচার, তার মানে বেশ জায়গার দরকার মেটেরিয়ালস রাখার জন্য। তখনকার সময় চার থেকে পাঁচ লক্ষ টাকার মেটেরিয়ালস  কিনে হামিদুজ্জামান খানের কোয়ার্টারে দিয়ে গেল। উনি যা চাচ্ছেন তা ব্যবহার করছেন। তখন হামিদুজ্জামানের স্কাল্পচার করতে কোন অসুবিধা হয় নাই। তিনি মেটাল কাটতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে স্ট্রাকচার কাঠামো করে, ইঞ্জিনিয়ারা তাকে যথেষ্ট সাহায্য করল। সাথে লোকাল ওয়েল্ডার ও কয়েকজন ছিলেন। তারপর স্ট্রাকচার নিয়ে বঙ্গভবনের ফোয়ারার মাঝে বসালেন। এখন এটা একটা আধুনিক স্কাল্পচারের দৃষ্টান্ত।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads