বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০২ September ২০২৪

ঘুষ-দুর্নীতিতে সীমাবদ্ধ দুদক


মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ, কালো টাকা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সংশোধিত আইনে ২৭ ধরনের অপরাধের মধ্যে ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়া অন্য অপরাধ অনুসন্ধান করতে পারে। ফলে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না সরকারের এই সংস্থা। টিআইবি থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। দুদক থেকেই আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি দিলেও কোনো প্রতিকার হয়নি বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ১৯৭২-৭৩ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ৫০ বছরে কালো টাকা ও অর্থপাচারের পরিমাণ ১৪৪ লাখ ৪৬ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে পুঞ্জীভূত কালো টাকার পরিমাণ ১৩২ লাখ ৫৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আর বিদেশে অর্থপাচারের পরিমাণ ১১ লাখ ৯২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর অর্থপাচারের পরিমাণ বাড়ছে। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছিল চার লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। যার ৮০ ভাগই হয়ে থাকে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে। এরপরেই দুদকের কার্যক্রম মন্থর হয়ে যায় মানিলন্ডারিং আইন সংশোধনের মাধ্যমে। অথচ বিদ্যমান মানিলন্ডারিং আইনে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্ত করতে পারে না দুদক। এর বাইরে বেসরকারি পর্যায়ে মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত অপরাধ সংঘটিত হলে তারও তদন্তের ক্ষমতা দুদকের এখতিয়ারের বাইরে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, দুদক প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নিবিড়ভাবে কাজ করছে টিআইবি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে আমরা লক্ষ্য করেছি, যে সুনির্দিষ্ট অভীষ্ট নিয়ে দুদক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল একাধিক আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে দুদকের ক্ষমতা হ্রাস করে তা অর্জনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা হয়েছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী দুদককে ২৭ ধরনের সম্পৃক্ত অপরাধ তদন্ত ও অনুসন্ধানের ক্ষমতা দেওয়া হলেও ২০১৫ সালে তা সংশোধন করে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯-এর তফসিলে শুধুমাত্র ‘ঘুষ ও দুর্নীতি’ ব্যতীত অন্য ২৬টি অপরাধ-সংশ্লিষ্ট মানি লন্ডারিং অনুসন্ধান ও তদন্তের দায়িত্ব দুদকের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একটি সূত্র জানায়, এ সংক্রান্ত আইনি সংশোধনের একটি উদ্যোগ চলমান আছে। এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে চূড়ান্ত করে জরুরি ভিত্তিতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ বিশেষ করে- ২(ঠ) ধারা সংশোধন করে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯-এর তফসিলে বর্ণিত অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য নির্ধারিত সংস্থার তালিকা ক্রমের ৩, ৫, ৬, ১৪, ১৮, ১৯ ও ২৫ নম্বর তথা- যথাক্রমে দলিল দস্তাবেজ জালকরণ, প্রতারণা, জালিয়াতি, দেশি ও বিদেশি অর্থ পাচার, চোরাচালানি ও শুল্কসংক্রান্ত অপরাধ, করসংক্রান্ত অপরাধ এবং পুঁজি বাজারসংক্রান্ত অপরাধ (ইনসাইডার ট্রেডিং অ্যান্ড মার্কেট ম্যানিপুলেশন) থেকে উদ্ভূত মানিলন্ডারিং বা অর্থ পাচারসংক্রান্ত সমস্ত অপরাধ অন্যান্য সংস্থার পাশাপাশি দুদকের এখতিয়ারভুক্ত করার লক্ষ্যে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯ তফসিলসহ সংশোধন করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল, ২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সব ধরনের অর্থপাচারের অপরাধ তদন্তের সুযোগ রেখে আইনের সংশোধন চেয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রথম চিঠি দিয়েছিল দুদক।

দুদক সূত্র আরো জানায়, গত বছর ২৯ মার্চ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ২ (ঠ) এর সংশ্লিষ্ট ধারা ও বিধিমালা (তফসিলসহ) সংশোধনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন তৎকালীন দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, কমিশনের সিদ্ধান্তের আলোকে ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ২ (ঠ) ধারা সংশোধন করতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯-এর তফসিলে বর্ণিত অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য নির্ধারিত সংস্থার তালিকার ক্রমিক নং ৩, ৫, ৬, ১৪, ১৮, ১৯ ও ১৫ যথাক্রমে দলিল দস্তাবেজ জালকরণ, প্রতারণা, জালিয়াতি, দেশি ও বিদেশি মুদ্রা পাচার, চোরাচালান ও শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধ, কর সংক্রান্ত অপরাধ, পুঁজিবাজার সংক্রান্ত অপরাধ (ইনসাইডার ট্রেডিং অ্যান্ড মার্কেট ম্যানিপুলেশন) থেকে উদ্ভূত মানি লন্ডারিং তদন্তের এখতিয়ার অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি দুদককেও প্রদানের লক্ষ্যে তফসিলসহ বিধিমালা সংশোধনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অনুরোধ করা হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে অনুরোধ করা হয়।

এরপর গত বছরের ১১ ডিসেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে দুদক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ২ (ঠ) এর সংশ্লিষ্ট ধারা ও বিধিমালা (তফসিলসহ) সংশোধনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ দুদকের প্রস্তাব চাইলে তা পাঠানো হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

সেই সময়ে দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন জানিয়েছিলেন, আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত ২৭টি অপরাধের মধ্যে কেবল ঘুষ ও দুর্নীতি থেকে উদ্ভূত মানিলন্ডারিং অপরাধ দুদকের আওতায় থাকায় আমাদের অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের প্রস্তাব হলো, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আমরাও যেন বাকি ২৬টি অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্তের এখতিয়ার পাই। এ বিষয়ে আমাদের উদ্যোগ চলমান রয়েছে।

মানি লন্ডারিং আইনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

২০০২ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়। এ আইনে বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি মানি লন্ডারিং অপরাধ তদন্ত করতে পারতেন। এরপর মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০০২ বাতিল করে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ অধ্যাদেশ-২০০৮ জারি করা হয়। ওই অধ্যাদেশের অধীন ১৭টি প্রেডিকেট অফেন্স থেকে উদ্ভূত সব মানি লন্ডারিং এককভাবে শুধু দুদক কর্তৃক তদন্তযোগ্য ছিল। পরে অধ্যাদেশটি বাতিল করে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০০৯ জাতীয় সংসদে পাস হয়। এ আইনেও সব মানি লন্ডারিং এককভাবে শুধু দুদক কর্তৃক তদন্তযোগ্য ছিল।

কিন্তু মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০০৯ বাতিল করে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ অধ্যাদেশ-২০১২ জারি করা হয়। যা পরবর্তীতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস হয়। ২০১২ সালের সংশোধিত আইনে ১৭টি সম্পৃক্ত অপরাধের পরিবর্তে ২৭টি সম্পৃক্ত অপরাধ প্রতিস্থাপন করা হয় এবং এসব অপরাধ এককভাবে দুদক কর্তৃক তদন্তযোগ্য করা হয়। অর্থাৎ ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের শুরুতে সব সম্পৃক্ত অপরাধের অনুসন্ধান-তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত একমাত্র সংস্থা ছিল দুদক।

২০১৫ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন করা হয়। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে ২৭টি সম্পৃক্ত অপরাধের মধ্যে শুধু একটি (ঘুষ ও দুর্নীতি) অপরাধের অনুসন্ধান-তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় দুদককে। ২০১৬ সালের ২১ জুন এটি দুদক আইনে তফসিলভুক্ত করা হয়।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ২৭টি প্রেডিকেট অফেন্স অনুসন্ধান-তদন্তের জন্য সাতটি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংস্থাগুলো হলো- দুদক, পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ কাস্টম, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), পরিবেশ অধিদপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা-২০১৯ অনুসারে ওই সাতটি সংস্থা তাদের ওপর নির্ধারিত প্রেডিকেট অফেন্সের অনুসন্ধান-তদন্ত করবে। বিধিমালা অনুসারে ‘দুর্নীতি ও ঘুষ’ সম্পৃক্ত একটি অপরাধের অনুসন্ধান-তদন্তের ভার এককভাবে দুদককে দেওয়া হয়। এনবিআরকে ‘কর সংক্রান্ত অপরাধ’ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে ‘পুঁজিবাজার সংক্রান্ত অপরাধ (ইনসাইডার ট্রেডিং অ্যান্ড মার্কেট ম্যানিপুলেশন)’ এককভাবে অনুসন্ধান-তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়। ‘মুদ্রা জালকরণ’, ‘দলিল-দস্তাবেজ জালকরণ’, ‘চাঁদাবাজি’, ‘প্রতারণা’, ‘জালিয়াতি’, ‘অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা’, ‘অপহরণ, অবৈধভাবে আটকে রাখা ও পণবন্দি করা’, ‘খুন ও মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি’, ‘নারী ও শিশু পাচার’, ‘চুরি/ডাকাতি/দস্যুতা/জলদস্যুতা/বিমান দস্যুতা’, ‘মানবপাচার’, ‘যৌতুক’, ‘মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন’, ‘সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসী কাজে অর্থ জোগান’, ‘ভেজাল বা স্বত্ব লঙ্ঘন করে পণ্য উৎপাদন’, ‘যৌন নিপীড়ন’, ‘সংঘবদ্ধ অপরাধ’, ‘ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আদায়’- এই ১৮টি সম্পৃক্ত অপরাধের অনুসন্ধান-তদন্তের ভার এককভাবে সিআইডিকে দেওয়া হয়।

এছাড়া বাকি ছয়টি সম্পৃক্ত অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা যৌথভাবে বিভিন্ন পক্ষকে দেওয়া হয়। ‘অবৈধ মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবসা’ সম্পৃক্ত অপরাধ যৌথভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সিআইডি, ‘চোরাই ও অন্যান্য দ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা’ সংক্রান্তি অপরাধ বাংলাদেশ কাস্টম ও সিআইডি, ‘চোরাকারবার’ এনবিআর ও সিআইডি, ‘দেশি ও বিদেশি মুদ্রাপাচার’ এনবিআর ও সিআইডি; ‘চোরাচালান ও শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধ’ এনবিআর ও সিআইডি, ‘পরিবেশগত অপরাধ’ পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিআইডিকে যৌথভাবে অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১