বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৬ June ২০২৪

গঙ্গা চুক্তি শেষ পর্যায়ে, তিস্তা চুক্তি অধরায়

৫৪টি নদী বাঁচিয়ে রাখাই দায়


মো: বাবুল আক্তার:

আন্তর্জাতিক নদীগুলো নিয়ে বাংলাদেশের দুঃখের শেষ হচ্ছে না। গঙ্গা চুক্তি শেষ পর্যায়ে, তিস্তা চুক্তি অধরাই রয়ে গেছে। উত্তর বাংলায় মরুকরণ ঘটছে, আর দক্ষিণ বাংলায় উঠে আসছে লবণাক্ততা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেই নদীর পানির সমস্যার সমাধান করা জরুরি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অভিন্ন ৫৪টি নদী যা দুই দেশের সীমান্ত দিয়ে গেছে, সেগুলোর ব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ওপরও জোর দিতে হবে। কারো জন্য অপেক্ষা নয়, তিস্তার মানুষকে বাঁচাতে, উত্তর বাংলাকে বাঁচাতে, নিজস্ব অর্থায়নে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এমনকি তিস্তা পাড়ের মানুষের অর্থ দিয়েই সেটা করা সম্ভব। এজন্য শুধু প্রয়োজন তিস্তা কর্তৃপক্ষ গঠন করা।

এদিকে বাংলাদেশকে তিস্তা ও গঙ্গা নদীর পানি দেওয়ার বিষয়ে বরাবরই ব্যাপক বিরোধিতা করেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, কেন্দ্র যদি একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই ভারত জুড়ে বড় আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

অন্যদিকে পানিকে বাংলাদেশের কূটনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসারও আহ্বান বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, বাংলাদেশ যদি তার পানির ন্যায্য হিস্যা না পায়, তাহলে ভারতকে ট্রানজিটসহ যেসব সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি (আইএফসি) সমন্বয়ক মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, প্রতিবেশী অনেক দেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পানি-চুক্তিগুলোতে ভারতের গ্যারান্টি ও আরবিট্রেশন ক্লজ রয়েছে। ফলে সিন্ধু ও মহাকালী পানি-চুক্তিগুলো পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি-চুক্তি শর্তপূরণ করেনি ভারত। বন্ধৃপ্রতীম দাবিদার দুই দেশের সম্পর্কের আশানুরূপ উন্নয়ন হয়নি। তাই বাংলাদেশের জন্য পানির বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়ার উপায় নেই। কারণ এটা আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। পানি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।

পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত বলেন, তিস্তা নদীর কোনো পানি বাংলাদেশকে দেওয়া হয় না। পশ্চিম বঙ্গের গজল ডোবা বাঁধ চুইয়ে বাংলাদেশে আসে। বর্ষাকালে বন্যার পুরো পানি ছেড়ে দেওয়ায় প্রতি বছর বাংলাদেশের তিস্তা অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তীর ভাঙনের ফলে হাজার হাজার বাড়িঘর বিলীন হয় এবং ব্যাপক ফসলহানি ঘটে। ফারাক্কা সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশের নদীনির্ভর বিভিন্ন স্থাপনাও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই অভিন্ন ৫৪টি নদী বাঁচাতে গঙ্গা ও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তার মতে, ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা যত বাড়বে, রাজনৈতিক দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান ততো দুর্বল হবে। এতে পশ্চিমবঙ্গ নয়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অনীহার কারণেই তিস্তা চুক্তি হচ্ছে না।

ড. আইনুন নিশাত আরো বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে ১৯৭৭ সালে। ওই চুক্তিটায় আমরা আমাদের পায়ে কুড়াল মেরেছি। তার আগে ১৯৭৪ সালের ১৮ এপ্রিল নিজেরা নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছি। আবার ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তিটাও আমরা ৩০ বছরের জন্য করেছি। যদিও সেটিতে আমি নিজেও যুক্ত ছিলাম। তাই নতুন করে গঙ্গা চুক্তিতে যেন সেই সময়ের বাধা না থাকে এমন পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, আন্তর্জাতিক নদীর পানির হিস্যা লাভের ন্যায্যতা নিয়ে মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মার্চের উদ্যোগ ও পরবর্তীকালে পশ্চিম বাংলার বামফ্রন্ট সরকার বিশেষ করে, জ্যোতি বসুর ভূমিকায় গঙ্গার পানি-চুক্তি সম্পাদন সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু গঙ্গা চুক্তিতে যেভাবে পানি পাওয়া যাবে ভাবা হয়েছিল, তা কখনও পাওয়া যায়নি। বরং ফারাক্কাসহ গঙ্গার উজানে পানি প্রত্যাহার করার ফলে বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্তি কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনা এই বিপদকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। গঙ্গা চুক্তি শেষ হওয়ার আগে ওই চুক্তির পর্যালোচনার ভিত্তিতে নবায়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্য দিকে তিস্তা চুক্তি সম্পাদিত হলোই না, বরং তা এখন ভূ-রাজনীতির দ্বৈরথের শিকারে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তির জন্য আর অপেক্ষা করতে পারে না। তিস্তা চুক্তি না করে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় ভারতের অর্থায়নের সাম্প্রতিক প্রস্তাবের অর্থ কার্যত গরু মেরে জুতা দানের শামিল।

পানি-বিশেষজ্ঞ . মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, উভয় দেশের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি নদী বাঁচিয়ে রাখতে উৎস থেকে সাগর পর্যন্ত তাদের প্রবাহ বজায় রাখা জরুরি। আর এজন্য তিস্তা পানি-চুক্তি খুবই জরুরি। তাই পানিকে আমাদের ডিপ্লোম্যাসির কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। আমরা যদি ন্যায্য পানি না পাই, তাহলে ট্রানজিটসহ ভারতকে যেসব সুবিধা দেওয়া হচ্ছে সেগুলো বন্ধ রাখতে হবে।

তিনি বলেন, পানির ন্যায্য বণ্টনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতির বিষয়ে শুধু কারিগরি বা কূটনৈতিক আলোচনা করে সুফল মিলবে না। এ জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জরুরি। কূটনীতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। তারা দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে। বিভিন্ন তথ্যের আদান-প্রদান করে। তাদের তথ্য তৈরি করার ক্ষমতা নেই। তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। সবচেয়ে বড় কথা এ সিদ্ধান্ত হতে হবে রাজনৈতিকভাবে। ১৯৭৪, ১৯৭৭, ১৯৯৬ সালের যে চুক্তিগুলো হয়েছে সবগুলোই রাজনৈতিকভাবে করা হয়েছে। এখন আমাদের পলিটিক্যাল এপ্রোচের ক্ষেত্র তৈরি করে দেবেন কারিগরি বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তারা তো খোলাখুলি কথা বলতে পারেন না।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৮৩ সালে একটি অস্থায়ী চুক্তি হয়। আর ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তির একটি খসড়া তৈরি করে দুই দেশ, যেখানে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ ও ভারতের ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ পানি পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থহানির যুক্তি দেখিয়ে এ চুক্তির বিরোধিতা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী পানির ওপর রাজ্যের অধিকার যেহেতু স্বীকৃত, তাই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আপত্তি উপেক্ষা করে তিস্তা চুক্তি রূপায়ণ কার্যত কেন্দ্রের পক্ষে অসম্ভব।

এদিকে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি নিয়ে ১৯৯৬ সালে চুক্তি হয়। এতে একাধিক রাজ্য সরকারও শরিক। এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালে। এ চুক্তি অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন ৪০ হাজার কিউসেক করে পানি পায় ভারত। ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে ফিডার ক্যানাল হয়ে কলকাতা বন্দরে যায় সেই পানি। বাকিটা মূল ব্যারেজ হয়ে আসে বাংলাদেশে। তবে মার্চ-এপ্রিলে নদীতে পানি কমতে শুরু করলে সমস্যা বাড়ে। চুক্তি অনুযায়ী, মার্চে ২০ দিন বাংলাদেশে ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি আসে। পরবর্তী ১০ দিন ভারত পায় একই পরিমাণ পানি। আর এপ্রিলে ভারত ২০ দিন পায় ৩৫ হাজার কিউসেক পানি। বাংলাদেশ শেষ ১০ দিন একই পরিমাণ পানি পায়। বাকি সময় নদীতে যে জলপ্রবাহ থাকবে, তা সমানভাবে পাবে দুই দেশ।

অন্যদিকে, এবার শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের আগে, ভারত বাংলাদেশের উত্তরে প্রস্তাবিত তিস্তা নদীর ব্যাপক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, যেখানে চীন ইতিমধ্যে একশো কোটি ডলার ব্যয় করে প্রকল্পের জন্য একটি সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে। ঢাকা ইতিমধ্যেই উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বেইজিংয়ের সমর্থন চেয়েছে। তবে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে তার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করবে। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ঝুলিয়ে রেখেছে। যার কারণে দেশের উত্তর অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

শনিবার শেখ হাসিনার সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, তার সরকার ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়ে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর তিস্তা নদীর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আলোচনার জন্য ভারতের একটি কারিগরি দল শিগ্্গিরই বাংলাদেশ সফর করবে।

তবে এমন এক সময় ভারত এই আগ্রহ দেখাল, যখন তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের অর্থায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। বলা হচ্ছে, জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেইজিং সফরেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১