বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২১ June ২০২৪

পাচারেই অর্থনীতির সর্বনাশ


এম এ বাবর:

বহুমুখী সঙ্কটে নাজুক দেশের অর্থনীতি। এর মধ্যে দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার অন্যতম। এসব বিরোধী আলাপ-সংগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে হলেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। করোনাকালে দেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। অর্থ পাচার ঠেকাতে সরকারের কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেই। ফলে অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার পাশাপাশি পাচারকৃত টাকার অংকও বেড়েছে।

দেশে থেকে প্রতি বছর ঠিক কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয়, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। তবে অর্থ পাচারের কারণে ডলারের একটি বড় অংশ দেশে থাকছে না; সেটা বহুবার প্রমাণ হয়েছে। এরমধ্যে গতকাল এক আলোচনাসভায় সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ও কৃষিবিদ শামসুল আলম বলেছেন, বছরে ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার (৮১ থেকে ৯২ হাজার কোটি টাকা) পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই দেশে ডলার-সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে অর্থ যে নিয়মিত ভিনদেশে পাচার হয়ে যায়, তা নিয়ে কখনোই কোনো সন্দেহ ছিল না, এখনো নেই। যত সময় গড়িয়েছে, অর্থ পাচারের পরিমাণ তত বেড়েছে। দুই বছর আগে অর্থপাচার বন্ধের উপায়, কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে গবেষণা সেল গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এ গবেষণা সেলও রয়েছে কাগজকলমে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশ থেকে অর্থ পাচার হলে বাণিজ্যে গতিশীলতা কমে। সরকার অর্থসঙ্কটে পড়ে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে আয় বাড়াতে অনেকটা নিরুপায় হয়ে নতুন কর আরোপের পথে হাঁটতে হয়। রাজস্ব আদায়ে চাপ বাড়ানো হয়। ধনীরা বিভিন্ন কৌশলে পার পেয়ে গেলেও বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ঘাড়ে চাপে। অর্থসঙ্কটে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি কমে যায়। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপে বলা হয়েছে, আমলারাই বিদেশে অর্থ পাচারের শীর্ষে রয়েছেন। শুধু অর্থ পাচার নয়, বিদেশে অভিবাসন গ্রহণ, বাড়ি-গাড়ি ইত্যাদি ক্রয়েও আমলারা শীর্ষে রয়েছেন। বাংলাদেশি নাগরিকদের সুইস ব্যাংকে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ নিয়ে ব্যাপক কথা হলেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য চাওয়া হয়নি।

২০২২ সালের ১৭ জুন সুইজারল্যান্ডের ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে জুলাই ২০২১ থেকে জুন ২০২২ ওই ১২ মাসেই জমা হয়েছে ২ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের এই বিপুল অর্থ নিয়ে নানা রকম প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে কারা টাকা পাঠাচ্ছে? এরপর ২০২৩ সালের জুনে প্রকাশিত অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সুইস ব্যাংক থেকে এক বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশিরা।

শুধু সুইস ব্যাংক নয়, বিশে^র ১০টি দেশে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ জমা হচ্ছে। ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর প্রিভেনশন অব মানি লন্ডারিং অ্যান্ড কমব্যাটিং ফিনান্স অব টেরোরিজম নামের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত এক কৌশলপত্রে বলা হয়, বিভিন্ন গবেষণা ও অবৈধ অর্থ প্রবাহের ঘটনা থেকে দেখা যাচ্ছে, ১০টি দেশ বা অঞ্চলেই বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়। এই ১০টি দেশ হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কেম্যান আইল্যান্ড ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস।

তৈরি পোশাক রপ্তানির আড়ালে ৩৩টি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের ৮২১ কোটি টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। দেশের সবচেয়ে বড় অর্থপাচার কেলেঙ্কারির অন্যতম এই ঘটনা কিছুদিন আগে উদ্ঘাটন হলেও এসব পণ্য রপ্তানি হয়েছে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সালের মে মাস পর্যন্ত।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান ১৩ হাজার ৮১৭টি চালানে ৯৩৩ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করলেও দেশে এনেছে মাত্র ১১১ কোটি টাকা। বাকি ৮২১ কোটি টাকা সিঙ্গাপুর, দুবাই, মালয়েশিয়া, কানাডাসহ ২৫টি দেশে পাচার করতে ভুয়া রপ্তানি নথি ব্যবহার করেছে প্রতারকচক্র। এসব পণ্য রপ্তানি করতে পণ্যের প্রকৃত দামের চেয়ে অন্তত ১০ গুণ কম মূল্য দেখানোর পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যকে ‘নমুনা’ পণ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। নমুনা পণ্য হিসেবে দেখানোর কারণে এসব পণ্যের বিপরীতে দেশে কোনো টাকা আসেনি।

অন্যদিকে মোবাইলে ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে এক বছরে ৭৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়। ২০২২ সালে এই তথ্য তুলে ধরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া বলেছেন, গত কয়েক বছরে ব্যাংকিং চ্যানেল বহির্ভূত অবৈধভাবে মোবাইল ব্যাংকিং হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায়, দেশের প্রবাসী আয়ের তুলনামূলক কিছুটা হলেও ভাটা পড়ে। হুন্ডি বন্ধে সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে বন্ধ করা যাচ্ছে না। উল্টো দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। এমন অবস্থায় দেশে ডলারের দাম বৃদ্ধিসহ নানা কারণ তদন্ত করতে গিয়ে এই পাচারকারী চক্রের সন্ধান পায় সিআইডি।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে ‘বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতি : প্রবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও পুষ্টি’ শীর্ষক আলোচনাসভায় সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ও কৃষিবিদ শামসুল আলম বলেছেন, বছরে ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়। টাকা পাচার থেকেই ডলার-সঙ্কটের শুরু। তাই জরুরি ভিত্তিতে এটি রোধ করার পদক্ষেপ দরকার।

এ সময় তিনি আরো বলেন, ঋণের ২২ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ব্যাংকের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এর রাশ টানতে হবেই। ব্যাংক কমিশন করলে ভালো, না হলে অন্তত শক্তিশালী একটা কমিটি করা উচিত বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদদের নিয়ে। কর ন্যায়পাল নিয়োগ, এনবিআর ও আইআরডির কাজ আলাদা করা। এডিপি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। মূল্যস্ফীতি কমাতে আমদানি নীতি সহজীকরণ করা জরুরি। বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখলে চাহিদা-জোগান ঠিক থাকে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশ থেকে টাকা পাচার হলে সরকার অর্থসঙ্কটে পড়ে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও অর্থ সরবরাহ কমে। সরকার খরচ চালাতে শর্ত মেনে বাধ্য হয়ে ঋণ নেয়, কর আরোপ করে। যে মানুষটি তিন বেলা ঠিকমতো খেতে পায় না তার কাঁধেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঋণ ও কর পরিশোধের দায় চাপে। অর্থ পাচার ভয়াবহ ব্যাধি। এই রোগ সারাতে না পারলে একটি দেশের অর্থনীতির অসুখ বাড়তে থাকে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও বলেন, সরকার আন্তরিক হলে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আসলে আমরা চাই না পাচার হওয়া অর্থের খোঁজ জানতে। তাই পাই না। এর জন্য অনেক দেশ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তি করেছে, আমরা করিনি। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার জন্য আইনি উদ্যোগ তেমন নেই। কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড (সিআরএস) চুক্তিতে বাংলাদেশ সই করলে এই তথ্য পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশ তা করছে না। এটা সই করলে বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সংস্কার করতে হবে। এখানে যে ব্যাপক কর ফাঁকি দেওয়া হয়, তা বন্ধ হবে। এটা দেশের জন্য মঙ্গল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, চেষ্টা করলে বৈদেশিক বাণিজ্যের নামে অর্থ পাচার ঠেকানো সম্ভব। তবে আমাদের দক্ষতার কিছুটা অভাব আছে সত্য, কিন্তু আন্তরিকতারও বড় অভাব রয়েছে।

তিনি বলেন, আমদানির নামে এর আগে কন্টেইনার ভর্তি ইট এনে অর্থ পাচার করেছে। খালি কন্টেইনার এসেছে। কাস্টম ধরেনি। অর্থ পাচার হয়ে গেছে। কোন পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে কী দাম- এটা জানা তো সহজ। এর কি কোনো মেকানিজম নাই? তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক, এনবিআর কী করছে? বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিনিয়োগ বোর্ড তারাও তো দেখতে পারে। এক্সপোর্ট ডেভেলপমন্ট ফান্ড দেওয়ার সময়ও এটা দেখা যায়। কিন্তু কেউ দেখছে না। হুন্ডির মাধ্যমেও পাচার রোধ করা সম্ভব। ভারত তো করছে। তারা পাচারকারীদের বাইরে থেকে নিয়ে এসে বিচারের মুখোমুখি করছে। তাহলে আমরা পারছি না কেন- এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান মো. মাসুদ বিশ্বাস গণমাধ্যমকে বলেন, ২০১৩ সালে বিএফআইইউ এগমন্ট গ্রুপের সদস্যপদ পায়। এগমন্ট গ্রুপ হলো সব দেশের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটগুলোর একটি জোট। এই ফোরাম অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন নিয়ে কাজ করে। আমরা এটি নিয়ে কাজ করছি।

তিনি জানান, সুইস ব্যাংকের সঙ্গে বিএফআইইউ যোগাযোগ রাখে। তারা কিছু তথ্যও দেয়। তবে সেটা গোপন রাখতে হয়। আইনগতভাবে ব্যবহার করতে হলে তাদের অনুমতি লাগে। ক্রিমিনাল ম্যাটার হলে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স-এর আওতায় করা যায়। তবে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য পেতে হলে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি থাকতে হয়। সেই চুক্তি বাংলাদেশের সঙ্গে নেই বলে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১