আপডেট : ০৭ March ২০২৪
মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ: পরাধীনতা থেকে বাঙালি জাতির মুক্তি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। বঙ্গবন্ধুর ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিক। তিনি জনগণ ও শাসকশ্রেণির নাড়ি বুঝতেন। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করে আসা বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য ভাষণ, বক্তৃতা, সভা-সমাবেশ ও সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছেন। ফলে জনগণের সাথে তার যোগাযোগের ক্ষমতা ছিল অনবদ্য। সহজ-সাবলীলভাবে তার কথাগুলো জনগণকে বুঝিয়ে দিতে পারতেন। আর ১লা মার্চ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি ও তার দলের নেতাকর্মীরা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন ৭ই তারিখের ভাষণের ব্যাপারে। বঙ্গবন্ধু ড. কামাল হোসেনকে ডেকে বলেন, ‘আমি তো লিখিত বক্তব্য দেবো না; আমি আমার মতো করে দেবো। তুমি পয়েন্টগুলো ফরমুলেট করো।’ আর ড. কামালের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও কয়েকবার বৈঠক করেন। ছাত্রনেতাদের সঙ্গেও বৈঠক হয়। তারা বঙ্গবন্ধুকে বলেন, সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে। বঙ্গবন্ধু সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। মঞ্চে উঠে চিরাচরিত ভঙ্গিতে সম্বোধনের মাধ্যমে শুরু করেন তার বক্তৃতা। ভাষণে এমনভাবে শব্দ প্রয়োগ করেননি যাতে মনে হতে পারে তিনি সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রাম বা আন্দোলনকে উস্কে দিচ্ছেন। ৭ই মার্চের ভাষণের শাব্দিক গুরুত্ববহতার আরেকটি দিক হচ্ছে ভাষণটিতে একটি সুনির্দিষ্ট প্রবাহানুসারে কথাগুলো বলা হয়েছে। প্রথমদিকে ইতিহাস, মাঝের দিকে অত্যাচার ও অন্যায়ের কথা এবং হুশিয়ারির সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার আহ্বান আর শেষের দিকে জনগণের প্রতি দিক-নির্দেশনামূলক কথাবার্তা। শেষের কথাটি ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডায়লগ যেটি শোনার জন্যেই শ্রোতারা মুখিয়ে ছিলেন। সবশেষে ‘জয় বাংলা’ বলে ভাষণটি শেষ করেছেন বঙ্গবন্ধু, যে স্লোগানটি পরবর্তীকালে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের রণধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল। ৭ই মার্চে রেসকোর্সের ভাষণের পরে নিউইয়র্কের দ্য নিউজউইক ম্যাগাজিন ৫ই এপ্রিলে প্রকাশিত সংখ্যায় বঙ্গবন্ধুকে ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ বা ‘রাজনীতির কবি’ বলে আখ্যায়িত করে। আর ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৭ আসনে জয়ী হয়ে ৩১৩ আসনবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা আওয়ামী লীগের কাছে হস্তান্তর করতে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অস্বীকৃতি জানালে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে যেতে থাকে। হঠাৎ ১লা মার্চ আকস্মিকভাবে জেনারেল ইয়াহিয়া সমগ্র জাতিকে স্তম্ভিত করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। বাংলার মানুষ তীব্রক্ষোভ ও আক্রোশে ফেটে পড়ে। তারা অপেক্ষা করতে থাকে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের দীপ্ত ঘোষণার জন্য। যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত বাঙালি ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যায় কাক্সিক্ষত মুক্তির লক্ষ্যে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনার পথ ধরেই ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লাখো প্রাণের বিনিময়ে বিশ্বমানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু ভাষণের প্রথমে পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ তেইশ বছরের বৈষম্যমূলক ইতিহাস তুলে ধরেন। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্তির মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হওয়ার পর থেকে পশ্চিম পাকিস্তান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ ও শাসন করতে থাকে, গড়ে ওঠে বৈষম্যের পাহাড়। সামরিক বাহিনীর তিনটি সদর দপ্তরই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। সেনাবাহিনীতে ৯৫ ভাগই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি, অর্থনৈতি ক্ষেত্রে এ বৈষম্য ছিল আরও ব্যাপক। ব্যাংক, বীমা, বাণিজ্য, সরকারি-বেসরকারি, বিদেশি মিশনসমূহের হেড অফিস ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ফলে অবাধে অর্থ পাচার সহজ হয়। পূর্ব পাকিস্তানের পাট থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। অথচ কৃষক ন্যায্য মূল্য পেত না। শিল্প কালকারখানা অধিকাংশ হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। ফলে পূর্ব পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আচরণ ছিল বিমাতাসুলভ। পূর্ব বাংলার জননেতা আবুল কাশেম ফজলুল হকসহ জনপ্রিয় নেতৃবৃন্দকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় রাখার চেষ্টা করা হয়। এমনকি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি আরম্ভ করে। ফলে জনগণ এসব বৈষম্যের প্রতিবাদে স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধিকারের দাবি তোলে। আর তখনই পাক-গোষ্ঠীর অস্ত্রের লেলিহান শিখা জ্বলে উঠে নিরীহ জনগণের ওপর। স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের দাবিতে বাঙালি জাতি যে সংগ্রামের সূচনা করে আত্মাহুতি দেয় বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে তা তুলে ধরেছেন। নানাদিক থেকে বঞ্চিত, নিপীড়িত, লাঞ্ছিত জনগণ তাদের দাবি মেনে নেয়ার জন্য আন্দোলন চালাতে থাকে। মৃত্যুর মুখেও নির্ভয়ে এগিয়ে যায় এবং রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। দেশকে মুক্ত করার জন্য জনগণ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালালেও পাক সামরিক বাহিনী গুলি চালায় নিরীহ জনগণের ওপর। তবুও সংগ্রামী জনগণ পিছপা হয়নি। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠায় হিন্দু, মুসলমান, বাঙালি, অবাঙালি সবার কথাই বলেছেন। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতীয়তাবাদ যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আজ পর্যন্ত বিশ্বের কোনো নেতা করতে পারেনি। তিন সেদিন সমগ্র বাঙালি জাতির মধ্যে একতার জ¦লন্ত শিখার বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন তার সম্মোহনী বক্তব্যের মাধ্যমে, যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালি জনগণ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ঐক্যবদ্ধ জনগণকে দেখেই বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। দেশকে মুক্ত করার জন্য সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষ শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় আশা প্রকাশ করে, তারা তার আহ্বানে সাড়া দেয়। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। গড়ে তোলে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। বঙ্গবন্ধু সেদিন তার ১৯ মিনিটের ভাষণে মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির অভিপ্রায় আবেগাপ্লুত অথচ বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রকাশ করেন। তিনি দারিদ্র্য মুক্ত, ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে এবং মাতৃভাষায় নির্বিঘ্নে কথা বলতে পারে এমন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘এদেশের মানুষ অর্থনীতি, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে’। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রশাসনিক গুরুত্বও অপরিসীম। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক’। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চের ভাষণে এই বলে মুক্তির সংগ্রাম ঘোষণা করেছিলেন যে, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তার এই নিষ্কম্প ঘোষণা বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা দিয়েছিল। জাতির উদ্দেশ্যে এই ছিল তার যুদ্ধপূর্ব শেষ ভাষণ। তাই এতে তিনি যুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিয়ে প্রস্তুতির কথা বলেছিলেন। তখন বাঙালির হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। তাই যার যা আছে তা নিয়ে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তার এই সংগ্রাম ঘোষণায় যে পশ্চিমাদের অত্যাচার বৃদ্ধি পাবে তা তিনি ধারণা করেছিলেন। সেজন্য তৎকালীন হানাদার শাসকদের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসহযোগিতা প্রদর্শনের নির্দেশ দেন। তিনি তার অনন্য ভাষণে মুক্তিসংগ্রামের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণে সুস্পষ্টভাবে চারটি দাবি পেশ করেন, যা বাঙালি জাতির ইতিহাসে এর গুরুত্ব অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ তার এই দাবিগুলো তাকে যেন বিচ্ছিন্নতাবাদীর অপবাদ না দিতে পারে তার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। তার দাবিগুলো ছিল- ১. সামরিক আইন মার্শাল ল উইথড্র করতে হবে, ২. সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকেসয় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে, ৩. যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে এবং ৪. জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই, ইউনেস্কো এ ভাষণকে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার এর মাধুর্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও গরুত্ব এবং বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাস এখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে-ছড়িয়ে বহু-ভাষী মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। এটি এখন শুধু বাংলাদেশের নয় বরং সারা বিশ্বের সম্পদে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব সংস্থার স্বীকৃতির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী গবেষণা হবে, বিশেষ করে জ্ঞানান্বেষী তরুণ সমাজের মনে এটি স্থান পাবে। যুগে যুগে এই ভাষণ বাঙালির আত্মচেতনা-জাগরণের শক্তি হয়েই থাকবে, যতদিন বাংলাদেশ আর বাঙালি রবে এ পৃথিবীতে, তত দিন লাল-সবুজের পতাকা উড়বে বিশ্বজুড়ে। লেখক : কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক /মামুন
এ ভাষণের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্ব ইতিহাসে নতুন এক শিখরে পৌঁছে যায়। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর উদ্দীপ্ত ঘোষণায় বাঙালি জাতি পেয়ে যায় স্বাধীনতা ও গেরিলাযুদ্ধের দিক-নির্দেশনা। এর পরই দেশের মুক্তিকামী মানুষ ঘরে ঘরে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এ বজ্র নিনাদে আসন্ন মহামুক্তির আনন্দে বাঙালি জাতি উজ্জীবিত হয়ে ওঠে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১