বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১৪ January ২০২৪

কুমারখালীর পান্টিতে হামলা আতঙ্কে গ্রামছাড়া কয়েকটি হিন্দু পরিবারের


কুষ্টিয়া প্রতিনিধি, আকরামুজ্জামান আরিফ:

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় একটি গ্রামের কয়েকটি হিন্দু পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্কে রয়েছে। তাঁরা বলছেন, ‘নৌকায় ভোট দেওয়ায়’ স্বতন্ত্র প্রার্থীর লোকজন তাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। এমনকি ভোটের দিন সন্ধ্যার পর অন্তত ৭টি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে। এরপর সেখান থেকে দুটি পরিবারের তিনজন সদস্য বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে।

 শনিবার সকালে  তিনজন ব্যক্তি লাঠিশোটা দিয়ে এলাকায় মহড়া দিয়েছে। দুপুরে ওই এলাকায় গেলে ভুক্তোভোগীরা এমন অভিযোগ করেন। তবে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও পুলিশ বলছে, নির্বাচনের পর সন্ধ্যায় একটু সমস্যা হয়েছিল। সেটা সমাধান হয়ে গেছে। আর কোন সমস্যা নেই।

 ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বাড়ি কুমারখালী উপজেলার পান্টি ইউনিয়নের পীতাম্বরবসী গ্রামে। শনিবার দুপুরে ওই এলাকাতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা হয়।

মন্ডলপাড়ার বাসিন্দা দেবাশীষ বিশ্বাস বলেন, তিনি পান্টি ইউনিয়নে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক হিসাবে চাকরি করেন। নৌকায় ভোট দেওয়ায় নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তাকে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। এজন্য তিনি ভোটের পর থেকে চাকরি করতে অফিসে যেতে পারছেন না। বাড়ি থেকে বের হতে পারছেন না।

 গত ৬দিন ধরে তিনি বাড়ি থেকে কোথাও যাননি। স্বতন্ত্র প্রার্থীর লোকজন এই হুমকি দিচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। বয়োজেষ্ঠ্য জীভন রঞ্জন বিশ্বাস জানালেন, এই এলাকাতে অন্তত ৭০টি হিন্দু পরিবার রয়েছে। এরমধ্যে অন্তত ৬০টি পরিবার নৌকার নির্বাচন করেছে। ভোটের দিন সন্ধ্যায় অন্তত ৭টি পরিবারের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীর লোকজন। তাদের মধ্যে অন্যতম হল, উজ্জ্বল কুমার সিংহ,অধির কুমার সিংহ,রবী দাস,বিনয় কুমার মন্ডল,সমেন্দ্র নাথ মন্ডল ও সূর্য্য কুমার মন্ডল।

এসব পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্কে রয়েছে। তাদের মধ্যে রবী দাস তাঁর স্ত্রী সুনিতি দাস গত সোমবার সকাল থেকে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। মাঠপাড়া এলাকায় রবী দাসের বাড়ি। দুপুরে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়,টিনের ঘেরার বাড়িতে কোপানোর অসংখ্য চিহৃ। ঘরের ভেতর সব কিছু দেখা যাচ্ছে। বাড়ির দুটি কক্ষের দরজা দড়ি দিয়ে আটকানো। বাড়িতে কেউ নেই। পাশের বাড়ির বাসিন্দা অপর্না দাস বললেন, ভোটের দিন সন্ধ্যায় লোকজন এসে ভাঙচুর করে চলে যায়। এসময় তারা আতঙ্কে ঘর থেকে বের হননি। পরের দিন সকালে রবী ও সুনিতি বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। সুনিতির দাদা (ভাই) অধির কুমার সিংহের বাড়িতেও একই দিন সন্ধ্যায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। তাঁর বাড়িতে গিয়েও তাদের পাওয়া যায়নি। বাড়িতে এসময় ছিলেন অধিরের দশম শ্রেনী পড়ুয়া ছেলে বলে, বাবা মা বাইরে গেছে। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় তার মাকে মারধরও করা হয়েছিল। বাড়িতে কোপানো হয়। নৌকায় ভোট দেবার কারণে লোকজন আইসি হুমকি দি গিচে। এখনও ভয় করে। সুনিতি তাঁর সম্পর্কে পিসি হয়। তারা কোথায় গেছে জানি না।’ মন্ডলপাড়ার বাসিন্দা বিশাখা মন্ডল। তিনি বলেন, তাঁর ছেলে বিরেন মন্ডল কামারের কাজ করে সংসার চালায়। ভোটের দিনের ঘটনার পর বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। আর আসছে না। ওই দিন সন্ধ্যায় তাঁকেও(বিশাখা) মারধর করা হয়েছে। বিরেনের স্ত্রী সুচিত্রাও বললেন,স্বামী ভয়ে বাড়িতে আসছে না। ওই এলাকায় আরও দুটি বাড়িতে গিয়ে টিনের বেড়ায় কোপানোর চিহৃ দেখা গেছে। বাড়ির নারীদের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। তারা সরাসরি কারও নাম উল্লেখ করে কথা বলতে রাজি হননি। শুধু বলছেন, নৌকায় ভোট দেওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর লোকজন ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।

দুপুরের দিকে গ্রামের সার্বজনীন কালীমন্দিরের সামনে সড়কে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়। তারা সেখানে হিন্দু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। পান্টি পুলিশ ক্যাম্পের উপপরিদর্শক খসরু আলম বলেন, ভোটের দিন একটু সমস্যা হয়েছিল। আর কোন ঝামেলা নাই। এসময় জীবন রঞ্জন পুলিশকে উদ্দেশ্যে করে বলেন,‘আপনার থাকলে কোন সমস্যা নাই। চলে গেলেই সমস্যা হচ্ছে। আজকে সকালেও লাঠিশোটা নিয়ে এলাকায় মহড়া দিয়েছে। এলাকার মানুষের আতঙ্কে দিন কাটছে। ভোটের দিন সন্ধ্যায় দুটি গরু নিয়ে গিয়েছিল। আপনিই উদ্ধার করে দিয়েছিলেন।

জবাবে  পুলিশ কর্মকর্তা খসরু আলম বললেন,শুনেছি সকালে কয়েজন এসেছিল। তাদের বিষয়ে খোজ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি খুবই ভালো আছে। কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আব্দুর রউফ (ট্রাক প্রতীকে) বিজয়ী হন। তিনি সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জকে(নৌকা প্রতীক) পরাজিত করেন। যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জ বলেন, নির্বাচনে জেতার পর থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর লোকজন চরম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষজনকে নির্যাতন করছে। সহিংসতা ছড়াচ্ছে। মানুষকে কুপিয়ে গুলি করে আহত করছে। বাড়িঘর ভাঙচুর করছে। এটাকে রাজনীতি বলে না। এর সুষ্ঠ তদন্ত করে বিচার করা হোক। অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে কুমারখালী শহরে কুন্ডুপাড়ায় আব্দুর রউফের বাড়িতে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি দুই উপজেলার বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করছিলেন।

 তিনি বলেন,‘কোন সহিংসতা হচ্ছে না। তারাই(নৌকার লোকজন) সহিংসতা চালাচ্ছে। পান্টিতে কোন ঘটনা ঘটেনি।’ কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) আকিবুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পরপরই ওই এলাকাতে যাওয়া হয়। পরিস্থিতি বর্তমানে খুবই স্বাভাবিক রয়েছে। থানায় কোন অভিযোগও নেই। কুষ্টিয়া জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কুমারখালীর বাসিন্দা জয়দেব বিশ্বাস বলেন,কুমারখালিতে নৌকায় ভোট দেওয়ায় প্রতিপক্ষ  ট্রাক মার্কার লোকজন  হিন্দুদের ওপর সহিংসতা ও বর্বর হামলা করেছে। বাড়ি ঘর ভাঙচুর নারীদের মারধরসহ বর্বরতা তাণ্ডব চালিয়েছে। ৫ থেকে ৭টি পরিবারের লোকজন ভয়ে ঘরবাড়ি ছাড়া।। এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে।

শুক্রবার বিকেলে পরিষদের সভাপতি ও কুষ্টিয়ার আদালতের পিপি কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অনুপ কুমার নন্দীসহ আরও কয়েকজন গিয়েছিলেন। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১