আপডেট : ১৫ February ২০২৩
আকরামুজ্জামান আরিফ, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যলয় (ইবি) শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সানজিদা চৌধুরি অন্তরা ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে নবীন (২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ) এক শিক্ষার্থীকে রাতভর নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) এ ঘটনার বিচার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। অভিযুক্ত অন্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। অপর অভিযুক্ত শিক্ষার্থী তাবাসসুম ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের এবং ভুক্তভোগী একই বিভাগের শিক্ষার্থী। তবে ভুক্তভোগী ছাত্রীকে কোনো ধরনের র্যাগিং করা হয়নি বলে জানিয়েছেন অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেত্রী। নির্যাতনের ঘটনাকে মিথ্যা দাবি করে পাল্টা অভিযোগ দিয়েছে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেত্রী সানজিদা চৌধুরী অন্তরা। এদিকে এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি করেছে হল প্রশাসন। চার সদস্য বিশিষ্ট কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে ঘটনার বৃত্তান্ত তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী বলেন,গত ৮ই ফেব্রুয়ারী আমার ওরিয়েন্টেশন ক্লাস শুরু হওয়ার জন্য আমি গত ৭ই ফেব্রুয়ারী দেশরতœ শেখ হাসিনা হলের ৩০৬ নং রুমে আমার এলাকার (পাবনা) পরিচিত এক আপুর রুমে গেষ্ট হিসেবে উঠি। যথাযথভাবে সবাইকে সম্মান পূর্বক রুমে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করি। এরপর ১১ ও ১২ তারিখে ২ দফায় আমি দেশরতœ শেখ হাসিনা হলের আবাসিক ছাত্রী ও পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সানজিদা চৌধুরী অন্তরা আপুর নেতৃত্বে ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২০- ২১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী তাবাচ্ছুম আপু সহ নাম না জানা আরও অন্তত ৭-৮ জন দ্বারা র্যাগিংয়ের নামে চরমভাবে আমি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের স্বীকার হই। এবং আমাকে বিবস্ত্র করে আমার গোপন ভিডিও ধারণ করে রাখেন। এমনকি তারা আমাকে জীবননাশের হুমকিও প্রদান করেন। অভিযোগ পত্রে ভয়ংকর অভিযোগের বর্ণনা দিতে গিয়ে ওই ভুক্তভোগী ছাত্রী বলেন, গত ৯ ফেব্রুয়ারী আমাকে ডিপার্টমেন্টের ২০২০-২১ এর তাবাসসুম নামের ওই সিনিয়র আপুর রুমে দেখা করতে বলা হয়। কিন্তু আমি অসুস্থ থাকায় যথাসময়ে আপুর রুমে যেতে পারি নি। এরপর থেকেই তারা আমার উপর চড়াও হতে থাকে এবং পরবর্তীতে তাদের রুমে গেলে আমার সাথে খারাপ আচরণ করেন, ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে থাকেন এবং হল থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন। তারা অভিযোগ করতে থাকেন তাদের না জানিয়ে কেনো হলে উঠেছি। অথচ হলে আমি আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে নয় গেস্ট হিসেবে সাময়িক সময়ের জন্য উক্ত রুমে উঠেছিলাম । কিন্তু প্রথম দফায় শনিবার (১১ই ফেব্রুয়ারী) রাতে আমার উপরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় এবং হল থেকে বের করে দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। পরে গত রবিবার (১২ই ফেব্রুয়ারী) বিকেল ৪টার দিকে হল প্রভোষ্ট এবং সহকারী প্রক্টরের হস্তক্ষেপে উক্ত বিষয়টি মিমাংসিত হয়। কিন্তু রাত না পেরোতেই রবিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১১ টার সময় অন্তরা আপু সহ ৭-৮জন আমাকে একটি গণরুমে নিয়ে যান এবং রুমে নিয়ে গিয়ে কথায় কথায় ওনারা ৭-৮ জন মিলে এলোপাতাড়িভাবে চড় থাপ্পড় মারতে থাকেন। আপু, আপনারা আমাকে কেন মারছেন বলতে গেলে উনারা আমার মুখ চেপে ধরেন এবং সজোরে চোয়ালে থাপ্পড় মারতে থাকেন।
তারা বলতে থাকেন চিনিস আমাদের আমরা কত খারাপ? আমরা তোর কি করতে পারি জানিস তুই? কোন আইডিয়া আছে আমাদের সম্পর্কে তোর? আর আমি কান্না করে আপু আমাকে আর মাইরেন না বলে ওনাদের পা ধরে মাফ চাইতে গেলে তারা পা দিয়ে লাথি মারেন । আর অকথ্য ভাষায় আমাকে ও আমার মা বাবাকে নিয়ে গালিগালাজ করতে থাকেন, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। এরপরে আমার বুকের উপর হাত দিয়ে জোর করে থাবা মারেন এবং গামছা দিয়ে আমার গলায় ফাঁস দিয়ে ধরে রাখে আর ছাড়ে। আর বলতে থাকে যা বলবো একটা কথা ও যেন বাইরে না যায়। একপর্যায়ে তারা একটা ময়লা গ্লাস আমাকে দিয়ে চেটে পরিষ্কার করায়ে নেয় এবং সেটার ভিডিও ধারণ করে। তারপর তারা বলতে থাকেন জামা খোল, আমি জামা খুলতে না চাইলে তারা আমাকে আবার মারা শুরু করেন এবং আমার জামা খুলে জোর করে আমাকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করেন। ভিডিওগুলো তাদের কাছে সংরক্ষণ করা আছে। তারপর আমাকে বলেন, যদি বাইরের কাউকে একথা বলিস, তাহলে তোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করে দিবো। যাতে তুই কাউকে মুখ দেখাতে নাহ পারিস। এবং অন্তরা আপু বলেন, তুই যদি প্রশাসনের কাছে কোন অভিযোগ দিস, তাহলে তোকে মেরে কুত্তা দিয়ে খাওয়াবো, যা বলেছি তা মনে থাকে যেনো! টর্চার শেষে রাত আনুমানিক রাত সাড়ে ৩টার পর আমাকে অন্য একটি গণরুমে পাঠিয়ে দেয়। আর সবাই বলেন মুখ খুললেই কিন্তু খবর খারাপ হয়ে যাবে। পরেরদিন সোমবার (১৩ই ফেব্রুয়ারী) খুব সকালে জীবন বাঁচাতে আমি হল থেকে পালিয়ে গ্রামের বাড়ি পাবনাতে চলে যাই। তারপর সকালে আমাকে হলে না পেয়ে অন্তরা আপু সহ ঐ ৭-৮ জন সবাই আমাকে একাধিকবার ফোন দেন, কিন্তু ভয়ে আমি কারো ফোনই রিসিভ করি নি। পরে আমি বাসায় এসে আমার পরিবারের সাথে আলাপ আলোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট অভিযোগ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেই।
পাল্টা অভিযোগ ছাত্রলীগ নেত্রীর
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দেশরতœ শেখ হাসিনা হলে চার ঘণ্টা ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনাকে মিথ্যা দাবি করে পাল্টা অভিযোগ দিয়েছে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেত্রী সানজিদা চৌধুরী অন্তরা।
মঙ্গলবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট বরাবর নির্যাতিত ছাত্রীর বিরূদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন তিনি। অভিযোগে ঘটনার সত্যতা যাচাই ও বহিরাগত দ্বারা হুমকির বিচার দাবি করেন। দেশরতœ শেখ হাসিনা হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. শামসুল আলম লিখিত অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন। অভিযোগে ছাত্রলীগ সহ-সভাপতি অন্তরা বলেন,গত ১১ তারিখ গণরুমের কিছু মেয়ে আমার কাছে অভিযোগ দেয়, আমার নাম নিয়ে গণরুমে যেয়ে একজন ছাত্রী মোছা: ফুলপরি খাতুন ফিন্যান্স ও ব্যাকিং বিভাগ ২০২১-২০২২ শিক্ষার্থী তাদের সিট কাটা ও নানান হুমকি দিচ্ছে এবং সে নিজেকে আমার ফুফাতো বোন ও আমাদের ছাত্রলীগের সভাপতির চাচাতো বোন বলে পরিচয় দেয়। সে হলের দক্ষিণ ব্লক-৩০৬ নং কক্ষে অবস্থান করছে বলে আমাকে তারা জানায়। পরবর্তীতে আমি তাকে ডেকে পাঠায় এবং তার থেকে তার পরিচয় এবং সে হলে কার কাছে আছে জিজ্ঞাসা করার প্রেক্ষিতে সে জানায় যে সে কথা আপুর সাথে যোগাযোগ করে অন্তরা আপুর মাধ্যমে উঠে।
তখন আমিই অন্তরা বলায় সে কথা বদলিয়ে আবার বলে সহ-সভাপতি মামুন ম্যানেজমেন্ট ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষের এক ভাইয়ের মাধ্যমে হলে ওঠে। তারপর তাকে আমি কিছুক্ষণ বুঝাই। পরবর্তীতে আলামিন নামে ফুলপরির এক ভাই তার ফোনে ফোন দিয়ে আমার সাথে কথা বলতে চান। ফোনে সে আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকির পাশাপাশি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। আমি এবং অন্যান্য মেয়েরা রাতেই প্রভোস্ট স্যারকে বিষয়টি অবগত করি। প্রভোস্ট স্যার পরের দিন অর্থাৎ ১২ তারিখ দুপুর ২ টার সময় দেখা করতে বলেন। প্রভোস্ট স্যারের কথামত আমরা ২টার ফুলপরিকে সাথে নিয়ে স্যারের সাথে প্রভোস্ট রুমে দেখা করতে যাই এবং এ বিষয়ে কথা বলি। পরবর্তীতে প্রক্টর স্যার মো: আমজাদ হোসেন এবং মুর্শিদ আলম স্যারদের উপস্থিতিতে বিষয়টি সমাধান হয়। পরবর্তীতে তার পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতা শোনার পর তাকে হলের গণরুমে থাকতে বলেন এবং আমাকে তুলে দিতে বলেন। এরপর আমি আমার কাজে ব্যাস্ত থাকি। রাত ১২টার দিকে আমি ৩০৬ নং রুমে যাই। যেয়ে ফুলপরিকে বলি স্যার আমাকে গণরুমে তুলে দিতে বলেছেন তুমি যদি চাও সকালেই যেতে পার সে উত্তরে বলে সে এখনই যেতে চাই। আমার হলের দুই ছোট বোনকে দিয়ে দোয়েল-১ তুলে দিয়ে আসতে বলি। আমি পরবর্তীতে ৩০৬ নং রুমেই উক্ত রুমের ছোট বোনদের সাথে রাত ১.৪০ পর্যন্ত অবস্থান করি। পরবর্তীতে আমি রুমে চলে যাই এবং ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে বিভিন্ন জায়গায় তাকে হ্যারেজমেন্টের সংবাদ শুনি যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি
চার ঘণ্টা ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি করেছে হল প্রশাসন। চার সদস্য বিশিষ্ট কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে ঘটনার বৃত্তান্ত তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দেশরতœ শেখ হাসিনা হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. শামসুল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এসময় তিনি বলেন, ‘উভয়ের লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। এঘটনায় হল থেকে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। সাতদিনের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পরে প্রতিবেদন সাপেক্ষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হল সূত্রে জানা যায়, চার সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে হলের হাইজ টিউটর ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আহসানুল হককে আহবায়ক ও হলের সহকারী রেজিস্ট্রার আব্দুর রাজ্জাককে সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন হলের হাউজ টিউটর ও হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইসরাত জাহান এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মৌমিতা আক্তার।
ইবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ফয়সাল সিদ্দিকী আরাফাত বলেন, ঘটনাটি শুনেছি। বিষয়টি খোঁজখবর নেওয়া হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিষয়ে ছাত্র উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শেলীনা নাসরিন বলেন, আমরা র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে বরাবরই জিরো টলারেন্স। ওই ছাত্রীর বিষয়টি শুনেছি। বিষয়টির সত্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এবিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহাদৎ হোসেন আজাদ বলেন, বিষয়টি জেনেছি। উভয়ের পক্ষের কথা শুনে বিষয়টি যাচাই বাছাই করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম বলেন, র্যাগিংয়ের বিষয়টি আমি শুনেছি। র্যাগিং তো একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনও র্যাগিং ছিলো না। কোন বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়গুলোকে অ্যালাউ করে না। সংশ্লিষ্টদের সাথে বসে বিষয়টি বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১