আপডেট : ২৩ July ২০২২
বিদ্যুৎ ও সড়কের ক্যানসারে রূপ নিয়েছে ব্যাটারিচলিত রিকশা ও ইজিবাইক। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও রাজধানীসহ সারা দেশে রিচার্জাবল ব্যাটারিচালিত এ যান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। দেশে প্রায় পাঁচ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ১৫ লাখ ইজিবাইক রিচার্জ করতে দৈনিক দশ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে। অথচ প্যাডেল চালিত রিকশায় কোনো বিদ্যুৎ খরচ নেই। স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও পুলিশকে মাসিক মাশোয়ারা দিয়ে চলছে এ ঝুঁকিপূর্ণ ২০ লাখ যান। এদিকে বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অনেক শিল্পকারখানায়। অথচ দেশে বিদ্যুতের বড় একটি অংশ গিলে খাচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। বিভিন্ন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে এই রিকশা বন্ধের কথা বলা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। চালকদের দাবি, এলাকার প্রভাবশালীদের সহায়তায় পুলিশকে মাসে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা মাসোয়ারা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত কার্ড পেলেই চালানো যায় এ যান। তবে এলাকার জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, প্রশাসনের ওপর মহলের কিছু কর্মকর্তার কারণে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ হচ্ছে না। অন্যদিকে অবৈধ এ যানগুলোতে নেই সড়কে চলাচলের ফিটনেস যোগ্যতা। এর মধ্যে এসব অটোরিকশা ও ইজিবাইকের চালক নিয়োগ দেওয়া হয় কিশোরদের। তাই নিয়ন্ত্রণহীন এসব যানে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। আবার সড়কের মোড়ে মোড়ে সৃষ্টি করে যানজট ও বিশৃঙ্খলা। সরেজমিনে রাজধানীর মুগদা, মান্ডা, বাসাবো, হাজারীবাগ, জিগাতলা, কামরাঙ্গীরচর, দক্ষিণখান, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, বাড্ডা, জুরাইন, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, শনির আখড়া, ডেমরা, বাসাবো ও মাদারটেকসহ রাজধানীর ছোট বড় প্রায় ৫০টি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রত্যেক এলাকায়ই ব্যাটারিচালিত রিকশার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। বিভিন্ন এলাকার রিকশাচালক ও মালিকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শুধু রাজধানী মুগদার মান্ডা এলাকার নিয়ন্ত্রণকারী আলাউদ্দিনকে ১২শ থেকে ১৫শ টাকা দিলেই চালানো যায় অবৈধ এই যানটি। ঢাকা সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের কোনো অনুমোদন দেয় না কর্তৃপক্ষ। তবে দুই সিটি করপোরেশনে বহু আগে থেকে দুই লাখ ৪১ হাজার প্যাডেল রিকশার অনুমোদন দেওয়া আছে। কিন্তু বিভিন্ন সংগঠনের নাম ব্যবহার করে প্রায় আরো ১০ লাখ রিকশা অবৈধ ভাবে রাজধানীতে চলছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, তাদের এলাকায় অনুমোদিত প্যাডেলচালিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ। এর মধ্যে অনুমোদিত প্যাডেলচালিত রিকশার সংখ্যার ২ লাখ ১৩ হাজার। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, তাদের এলাকায় প্যাডেলচালিত রিকশার সংখ্যা ৫ লাখের বেশি। এর মধ্যে অনুমোদিত প্যাডেলচালিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব মতে সারা দেশে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশার সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। এর মধ্যে শুধু ব্যাটারিচালিত রিকশা আছে প্রায় ৫ লাখ। যা ঢাকা ও চট্টগামে সর্বাধিক চলছে। পরিসংখ্যান বলছে, একটি রিকশার ব্যাটারি প্রতিদিন চার্জ বাবদ খরচ করছে পাঁচ থেকে ৭ ইউনিট বিদ্যুৎ। যা মাসে দাঁড়ায় ১৫০ ইউনিটে। এই বিদ্যুৎ দিয়ে এক মাস চলতে পারত একটি ছোট পরিবার। দেশে বিদ্যুতের এই ঘাটতির দিনেও এসব যান নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই কারোরই। বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. জিয়াউর রহমান খান বলেন, বিদ্যুতের খরচ শুধু রিকশায় হচ্ছে না। এই রিকশাগুলো কিন্তু চার্জারের মাধ্যমে চার্জ হচ্ছে। চার্জারের ইফিসিয়েন্সি একটা বিশাল ব্যাপার। তাছাড়া শুধু বিদ্যুৎই না, দুর্ঘটনা বৃদ্ধি ও যানজট তৈরি করছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। তিনি বলেন, এটার ডিজাইন ঠিক করা উচিত। এখন এটা মেইনস্ট্রিমে চলে আসছে। এখন এটাকে নিষিদ্ধ করার কোনো উপায় দেখি না। এটার গ্রহণযোগ্যতা সমাজে এত বেশি হয়ে গেছে, কাজেই এটাকে সহজে নিষিদ্ধ করা যাবে না। তবে এগুলো চার্জ দিতে সোলার বা প্যাডেলযুক্ত করা সহ অন্যকোনো বিকল্প ব্যবস্থা করে বৈধতা দিয়ে রাখা যেতে পারে। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর অ্যাসিড ব্যাটারিচালিত ৪০ লাখ ইজিবাইক বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এগুলো আমদানি ও ক্রয়-বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। বিচারপতি মামনুন রহমানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এ নির্দেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট আতিক তৌহিদুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশ গুপ্ত। গত ১৩ ডিসেম্বর বাঘ ইকো মোটরস লিমিটেডের সভাপতি কাজী জসিমুল ইসলামের পক্ষে হাইকোর্টে রিটটি করা হয়। রিটে শিল্প সচিব, সড়ক পরিবহন সচিব, পরিবেশ সচিবসহ ৭ জনকে রিটে বিবাদী করা হয়। এই প্রসঙ্গে আইনজীবী আতিক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ইজিবাইকগুলোতে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। এই ইজিবাইকগুলো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া, ইজিবাইকগুলো রুট পারমিট ছাড়াই রাস্তায় চলাচল করছে। এই ইজিবাইকের বিদ্যুৎ খাত থেকে সরকার কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না। এ কারণে সারা দেশে চলা অবৈধ ইজিবাইক বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে আমরা হাইকোর্টে রিট করি। আইনজীবী আতিক তৌহিদুল ইসলাম আরো বলেন, রিটের শুনানি নিয়ে আজকে আদালত ব্যাটারিচালিত অবৈধ ইজিবাইক জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এগুলো আমদানি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। অবৈধ ইজিবাইক আমদানি থেকে বিরত থাকতে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, এই মর্মে রুল জারি করা হয়েছে। এর আগে, ২০১৭ সালে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনা উপেক্ষা করে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশকে ম্যানেজ করে বিভিন্ন অলিতে-গলিতে এখনো চলছে এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা। আর এসব অটোরিকশায় চড়ে প্রায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সারাজীবনের জন্য কেউ হচ্ছেন পঙ্গু, কেউ হারাচ্ছেন প্রাণ। সচেতন যাত্রীমহলের অভিযোগ, পুলিশ, ট্রাফিক বা হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এসব যানবাহন গলি থেকে শুরু করে সড়ক-মহাসড়কে চলছে। তারা বলছেন, সড়ক-মহাসড়ককে ৩ চাকার বাহন মুক্ত রাখতে হলে কঠোর নজরদারির দরকার। এদিকে হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশ বলছে, দায়িত্বে কোনো অবহেলা নেই। বেশিরভাগ সময় চালকরা পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে মহাসড়কে গাড়ি চালান। রিকশা-শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, মহামারিতে মানুষ তার রুটি-রুজির বন্দোবস্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা বাতিলের মাধ্যমে নতুন করে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা বিপদের সম্মুখীন করা হবে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সারা দেশে চলাচল করা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশার মধ্যে ঢাকা ও চট্টগামে সর্বাধিক। আমারা প্রায় একযুগ ধরে দাবি জানিয়ে আসছি, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ সব ধরনের অবৈধ ও ঝঁকিপূর্ণ যানবাহন বন্ধ হবে। এছাড়া এ সব যান প্রচুর পরিমাণ বিদ্যুৎ ক্ষয় করছে। যা দিয়ে দেশের কয়েকটি বড় শিল্প পরিচালনা করা সম্ভব। তাছাড়া এগুলো ব্যাটারিতে না চালিয়ে প্যাডেল দিয়েও চালানো সম্বব। তাহলে কেন মূল্যবান বিদ্যুৎ ব্যয় করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবিকা আগে, না জীবন আগে। সারা দেশে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করে গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়ানো হোক। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়ানোকে নিরউৎসাহিত করা উচিত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শফিকুল আলম শামীম বলেন, আমরা বার বার এগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করেছি। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই অনেক কিছু নিয়ে আমরা ব্যর্থ হই। কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তা এগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এই রিকশা উচ্ছেদে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ সফল হয় না। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্রোপেরশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের চলতি বছরে বেশ কিছু ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক জব্দ করা হয়েছিল। বিশেষ মহলের চাপে সে অভিযান ধরে রাখা যায়নি। তবে তিনি জানান, রাজনৈতিক প্রভাশালী, পুলিশের ঊর্ধ্বোতন কিছু কর্মকর্তা এবং এগুলোর খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিকারকের সঙ্গে জড়িত প্রভাশালী ব্যাবসায়ী এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১