আপডেট : ০৬ July ২০২২
ঈদ সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ট্যানারি মালিকদের গত বছরের তুলনায় প্রতি বর্গফুটে গরুর চামড়া ৭ টাকা ও খাসির চামড়া ৩ টাকা বাড়তি দরে কিনতে হবে। এদিকে পশুর চামড়া কিনতে প্রয়োজনীয় তহবিল নিশ্চিতে ব্যবসায়ীদের বিশেষ ঋণ সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে আগের দেওয়া ঋণ খেলাপি হলে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে দিয়ে পুনঃতফসিল করা যাবে। আগামী ১০ জুলাই ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতি বছর দেশে উৎপাদিত কাঁচা চামড়ার প্রায় অর্ধেক আসে ঈদুল আজহায় কোরবানি করা পশু থেকে। এদিকে পশুর চামড়ার দাম রাজধানী ঢাকা ও এর বাইরে ভিন্ন হবে। এবার ঢাকায় লবণযুক্ত চামড়া কিনতে হবে ৪৭-৫২ টাকায়, যা গত বছর ৪০ থেকে ৪৫ টাকা বর্গফুট হিসেবে কিনেছিলেন ব্যবসায়ীরা। এই দর তার আগের বছর বা ২০২০ সালে ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। এ ছাড়া সারা দেশে লবণযুক্ত খাসির চামড়ার দর ৩ টাকা বাড়িয়ে প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ থেকে ২০ টাকা। গত বছর খাসির লবণযুক্ত চামড়ার দাম ছিল ১৫ থেকে ১৭ টাকা, যা ২০২০ সালে ছিল ১৩ থেকে ১৫ টাকা। তবে এবার বকরির চামড়ার বর্গফুটপ্রতি দাম গত বছরেরটাই বহাল রাখা হয়েছে। গত বছর বকরির লবণযুক্ত চামড়ার দাম ছিল ১২ থেকে ১৪ টাকা, যা ২০২০ সালে ছিল ১০ থেকে ১২ টাকা। গতকাল মঙ্গলবার ঈদুল আজহা ২০২২ উপলক্ষে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার মূল্য নির্ধারণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত বৈঠক শেষে বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষ চামড়ার এই মূল্যস্তর নির্ধারণ করেন। এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি চামড়ার এই মূল্য নির্ধারণ করে দেন। তবে এবার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাই প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৫ টাকা ও খাসির চামড়ার দাম ৩ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের গরুর চামড়ার দাম প্রস্তাবের সঙ্গে দুই টাকা বাড়তি যোগ করে খাসির চামড়ার দাম ৩ টাকা অপরিবর্তিত রাখেন। পশুর চামড়া কিনতে প্রয়োজনীয় তহবিল নিশ্চিতে ব্যবসায়ীদের বিশেষ ঋণ সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে আগের দেওয়া ঋণ খেলাপি হলে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে দিয়ে পুনঃতফসিল করা যাবে। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলারে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতি বছর কোরবানি এলে ব্যাংকগুলো কাঁচা চামড়া কিনতে চামড়া ব্যবসায়ীদের ঋণ দিয়ে থাকে। কিন্তু ব্যাংকগুলো সেই ঋণের টাকা ফেরত পাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, এ পর্যন্ত চামড়া খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, আগের দেওয়া ঋণ খেলাপি হলেও ঋণ পাবেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। মাত্র দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে পুনঃতফসিল করা যাবে। অর্থাৎ ঋণ খেলাপিরাও ঋণ পাবেন। আগামী ১০ জুলাই ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতি বছর দেশে উৎপাদিত কাঁচা চামড়ার প্রায় অর্ধেকের বেশি আসে ঈদুল আজহায় কোরবানি করা পশু থেকে। এদিকে গত কয়েক বছর ধরে কোরবানির চামড়ার কদরও কমে গেছে। তবে এবার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম গত বছরের চেয়ে একটু বাড়তে পারে। এদিকে আসন্ন ঈদুল আজহায় কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে ট্যানাররা ৪০০ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ পাবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই ঋণ সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। তবে এবারের কোরবানি ঈদে পশুর কাঁচা চামড়া কিনতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংক। ব্যাংকাররা বলছেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের চাহিদা মতো তহবিল জোগান দিতে নির্দেশ দেওয়া হলেও তারা বুঝে-শুনেই ঋণ দেবেন। ট্যানারি শিল্প উদ্যোক্তাদের আগের ঋণের বড় একটি অংশই খেলাপি থাকায় ব্যাংকগুলো সহজে ঋণ দিতে চায় না, যার কারণে ঋণ পেতে সরকারের সহায়তা চান তারা। ব্যাংক ঋণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক এবং সালমা ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, কোরবানির পশুর চামড়া একটি পচনশীল পণ্য, যা দ্রুত সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করতে হয়। এই চামড়া সংরক্ষণ করতে না পারলে বৈদেশিক মুদ্রা আসবে না। সংগৃহীত চামড়া নগদ টাকা দিয়ে কিনতে হয়, মৌসুমী ব্যবসায়ীরা আড়তে চামড়া দিয়ে যান নগদ টাকার বিনিময়ে। তিনি বলেন, ট্যানারি মালিকরা নিজস্ব ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দিয়ে ব্যবসা করলেও কোরবানির সময় বেশি নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়, যা নিজস্ব ফান্ড থেকে ম্যানেজ করা সম্ভব হয় না। এর আগে, কোরবানির ঈদে চামড়া সংগ্রহের জন্য ট্যানারি শিল্পের অনুকূলে ৫০০-৬০০ কোটি টাকা ঋণ সংস্থানের ব্যবস্থা করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় ট্যানারি মালিকরা। অবশ্য গত বছর ঈদুল আজহায় কাঁচা চামড়া কিনতে ৫৮৩ কোটি টাকার তহবিল জোগান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। যেখানে রাষ্ট্রীয় খাতের চার ব্যাংক ঋণ দিয়েছিল ৩৯০ কোটি টাকা। আর এবার এই চার ব্যাংক ঋণ দিচ্ছে ৩০০ কোটি টাকার মতো। ট্যানারি মালিকরা বলছেন, করোনা পরবর্তী ব্যবসায় টিকে থাকতে চাহিদার তুলনায় এবার যে পরিমাণ টাকা ঋণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে তা আগের বছরের চেয়েই কম। আবার পেতেও ভোগান্তি। আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির কাঁচা চামড়ার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাসহ প্রাসঙ্গিক বিষয় ও ঋণের ব্যবস্থা করতে গত ২১ জুন বাণিজ্য সচিবকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন। পাশাপাশি কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে চাহিদামাফিক লবণ সরবরাহের ব্যবস্থা, কাঁচা চামড়া পাচার ঠেকাতে ঈদের পর অন্তত ৩০ দিন পর্যন্ত বর্ডার এলাকায় টহল বাড়ানো ও কাঁচা চামড়া ক্রয়ে ঋণ সরবরাহে ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতাও চেয়েছে সংগঠনটি। রাজধানীর পোস্তা, নাটোরের রেলওয়ে বাজার, যশোরের রাজারহাট, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী, রংপুরের তারাগঞ্জ, নওগাঁ, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, আমিনবাজার ও টঙ্গী-গাজীপুরের আড়তগুলোতে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও মজুত করা হয়ে থাকে। জানা গেছে, ট্যানারি মালিক ও বাণিজ্যিক রপ্তানিকারক মিলিয়ে সংগঠনটির বর্তমান সদস্য প্রায় ৮০০ জন। সারাদেশে ১ হাজার ৮৬৬টি বৃহৎ ও মাঝারি আড়ত রয়েছে। এদিকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রায় তিনবছর পর আবার চামড়া রপ্তানি বাড়ছে, যাতে আগামীতে সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা। গত ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয় হয়েছে। এই রপ্তানির পরিমাণ সরকারের নির্ধারিত টার্গেট ও আগের বছরের চেয়ে অনেক বেশি। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে চামড়া রপ্তানি হয়েছে ১১১.৫৬ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি। আর রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৮% বেশি। যদিও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০১.৯৮ কোটি ডলারের চামড়া রপ্তানি হয়। এই সময়ের পর দুই অর্থবছরে এক বিলিয়ন ডলারের কম পণ্য রপ্তানি হয়েছে। শিল্পের উদ্যোক্তারা জানান, দীর্ঘদিন পর চামড়া রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে, বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদাও এখন বেশ ভালো। রপ্তানি ত্বরান্বিত ও বর্তমান ট্রেন্ড ধরে রাখতে সরকারের সহায়তা প্রয়োজন। এদিকে ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর চামড়া কিনতে প্রয়োজনীয় তহবিল নিশ্চিতে ব্যবসায়ীদের বিশেষ ঋণ সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে আগের দেওয়া ঋণ খেলাপি হলে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে দিয়ে পুনঃতফসিল করা যাবে। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলারে এ তথ্য জানিয়েছে। পুনঃতফসিলিকরণ পরে ব্যাংকিং নিয়মাচার অনুসরণ করে তফসিলি ব্যাংকগুলো ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই সাপেক্ষে ২০২২ সালে কোরবানি দেওয়া পশুর কাঁচা চামড়া কেনার উদ্দেশ্যে ঋণ বিতরণ করতে পারবে। এই সুবিধা ২০২২ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বলবত থাকবে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, নতুনভাবে কোভিডের সংক্রমণ বৃদ্ধি, বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থা এবং সামপ্রতিক সময়ে দেশের কয়েকটি এলাকায় সংঘটিত আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চামড়া ব্যবসায়ীদের (কাঁচা চামড়া ক্রয়-বিক্রয়/প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ট্যানারি শিল্পসহ চামড়া খাতের সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান/শিল্প) আগামী কোরবানির মৌসুমে প্রয়োজনীয় অর্থের সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিচের নীতিমালা অনুসরণ করতে ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে। সেগুলো হলো, কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয়ের উদ্দেশে ইতোপূর্বে বিতরণ করা ঋণ বা ঋণের অংশবিশেষ খেলাপি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতার গোডাউনে স্টক অথবা সহায়ক জামানত থাকা সাপেক্ষে উক্ত খেলাপি ঋণের বিপরীতে ন্যূনতম ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট গ্রহণ সাপেক্ষে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে পুনঃতফসিল করা যাবে।
ঢাকার বাইরে এবার সারা দেশে ট্যানারি মালিকরা লবণযুক্ত গরুর চামড়া কিনবেন ৪০ থেকে ৪৪ টাকা দরে। গত বছর এই দাম ছিল ৩৩-৩৭ টাকা। আর ২০২০ সালে ছিল ২৮ থেকে ৩২ টাকা বর্গফুট।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ বৈঠকে কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ, ক্রয়-বিক্রয়, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, মজুত, চামড়ায় লবণ লাগানো ও মিডিয়ায় প্রচারের বিষয়ে আলোচনা হয়।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১