আপডেট : ১৯ June ২০২২
একদিনে এমন বন্যা আগে দেখেনি সিলেটের মানুষ। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার কবলে সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ অঞ্চল। সিলেট বিভাগের ৮০ ভাগের বেশি এলাকা এখন পানির নিচে। পানিবন্দি লাখ লাখ মানুষকে উদ্ধারে প্রশাসনের সঙ্গে মাঠে নেমেছেন সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরাও। সিলেটের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলেও বন্যার তীব্রতা বাড়তে শুরু করেছে। এছাড়া আগামী দুদিনের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের ১৪টি জেলায়ও বন্যা হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার কুড়িগ্রাম দিয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করে তা আরো সামনে এগিয়ে আসছে। ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও পাবনায় বন্যার পানি প্রবেশ করতে পারে। আর তিস্তা অববাহিকার কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও রংপুরে বন্যা শুরু হতে পারে। এ ছাড়া পদ্মানদীর পানি বেড়ে একই সময়ে দেশের মধ্যাঞ্চলের চারটি জেলায় বন্যা শুরু হতে পারে। পদ্মার মূলনদী গঙ্গার উজানে ভারি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ফলে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর ও ফরিদপুরে নিম্নাঞ্চলে বন্যা শুরু হতে পারে। পাহাড়ি ঢল আর অতি ভারি বৃষ্টিতে নদনদী ও হাওরের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যার আরো বিস্তৃতি ঘটেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন দুই জেলার প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। বিশেষ করে গোটা সুনামগঞ্জই এখন পানির নিচে। যেদিকে চোখ যায়, শুধুই থই থই পানি। সড়ক-মহাসড়ক, ঘর-বাড়ি সবই ডুবেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সিলেটে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা। প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য মতে, সিলেট অঞ্চলে নদনদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রবলবেগে পানি ঢুকছে। শুক্রবার দিবাগত রাতে সিলেটে বৃষ্টি কিছুটা কম ছিল। এতে পানি এক-দুই ইঞ্চি কমলেও গতকাল শনিবার সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি হয়। এতে উঁচু এলাকাগুলোও প্লাবিত হয়ে পড়ছে। গতকাল দুপর ১টার মধ্যে নতুন করে নগরের অন্তত ২৫টি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে সিলেট নগররের পুরোটা কার্যত প্লাবিত হয়ে পড়ল। এ অবস্থায় দুর্ঘটনা এড়াতে এসব স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। পানিবন্দি মানুষের মধ্যে হাহাকার ও আর্তনাদ চলছে। আশ্রয়ের খোঁজে পানি-স্রোত ভেঙে ছুটছে মানুষ। সবচেয়ে বিপদে আছেন শিশু ও বয়স্করা। আটকেপড়াদের উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে। যেখানেই শুকনো ও উঁচু জায়গা পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই আশ্রয় নিচ্ছে মানুষ। সিলেটের সবকটি উপজেলা ও অর্ধেক শহর, সুনামগঞ্জের উপজেলা ও পৌর শহর বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক ও সিলেট-ভোলাগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়ক। দুই জেলায় শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এদিকে, বন্যাদুর্গত এলাকায় পানিবন্দি লোকজনকে উদ্ধারে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী তৎপর রয়েছে। শুক্রবার বিকেল থেকে সেনাবাহিনীর ১০ প্লাটুন, ৬টি মেডিকেল টিম, গতকাল শনিবার সকাল থেকে নৌবাহিনীর ৩৫ সদস্য দুটি টিমে ভাগ হয়ে কাজ শুরু করে। সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সিলেট জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গতকাল বিকেলে নৌবাহিনীর আরো ৬০ সদস্যের একটি দল সিলেট এসে পৌঁছায়। আরো দুটি ক্রুজ উদ্ধার কাজে যোগ দেয়। এর মধ্যে একটি সিলেটে এবং অন্যটি সুনামগঞ্জে উদ্ধার কাজে যুক্ত হয়েছে। সিলেট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ শাখা জানিয়েছে, ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ৭ হাজার ৯০০ বস্তা শুকনো খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় আরো ৮ হাজার প্যাকেট খাবার এবং ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, সিলেট ও সুনামগঞ্জের ১২ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। এসব এলাকায় আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে রানওয়েতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় শুক্রবার দুপুর থেকে বন্ধ রয়েছে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এতে সিলেটের সঙ্গে সারা দেশ ও বিদেশের বিমান যোগাযোগ বন্ধ। বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক হাফিজুর রহমান জানান, বিমানবন্দরের রানওয়ের শোল্ডার পর্যন্ত পানিতে ডুবে যায়। রানওয়ের একাংশের বাতিও পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ধীরে বাড়ছে পানি। এসব কারণে তিন দিনের জন্য এই বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। তাছাড়া গতকাল সিলেট থেকে লন্ডনগামী সব ফ্লাইট বাতিল করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। আগামী বুধবার ২২ জুন পর্যন্ত ফ্লাইট বন্ধ থাকবে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) গতকাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বেবিচক আরো জানায়, বাতিল করা ফ্লাইটের তারিখ পরবর্তীতে জানিয়ে দেওয়া হবে। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমদ জানান, শনিবার সকাল ৮টায় ঢাকা থেকে সিলেট হয়ে লন্ডন যাওয়ার কথা ছিল একটি ফ্লাইট। সেটি বাতিল করা হয়। এর মধ্যে আবার রোববার (১৯ জুন) ও বুধবার (২২ জুন) বিমানের ঢাকা-সিলেট-লন্ডন ফ্লাইট রয়েছে। সেগুলোও বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে বন্যার পানির কারণে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করে সিলেট রেলওয়ের স্টেশন ম্যানেজার নুরুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টির কারণে রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় সিলেট রেলওয়ে স্টেশন আপাতত বন্ধ থাকবে। তবে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মাইজগাঁও রেললাইন স্টেশন ও মৌলভীবাজারের কুলাউড়া স্টেশন থেকে চলাচল করবে। সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য টোল-ফ্রি নম্বর চালু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এসব টোল-ফ্রি নম্বরে যোগাযোগ করে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা সেনাবাহিনীর সহায়তা নিতে পারবেন। গতকাল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। আইএসপিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় টোল-ফ্রি নম্বর চালু করা হয়েছে। এসব নম্বরে বিনামূল্যে ফোন দিয়ে সেনাবাহিনীর সহায়তা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। টোল ফ্রি নম্বরগুলো হচ্ছে : ০১৭৬৯১৭৭২৬৬, ০১৭৬৯১৭৭২৬৭, ০১৭৬৯১৭৭২৬৮, ০১৮৫২৭৮৮০০০, ০১৮৫২৭৯৮৮০০, ০১৮৫২৮০৪৪৭৭, ০১৯৮৭৭৮১১৪৪, ০১৯৯৩৭৮১১৪৪, ০১৯৯৫৭৮১১৪৪, ০১৫১৩৯১৮০৯৬, ০১৫১৩৯১৮০৯৭, ০১৫১৩৯১৮০৯৮ সারা দেশে আরো বৃষ্টিপাতে বন্যা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সারা দেশেই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সারা দেশে বজ্রসহ ভারি বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, আগামী ৩ দিনে আবহাওয়া খুব একটা পরিবর্তনের সম্ভবনা নেই। তাই আগামী তিন দিনে বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করা মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সারা দেশে এ বৃষ্টিপাত চলতে পারে আরো ৫ থেকে ৭ দিন। আজ দেশের রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়ার সঙ্গে বিজলী চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। আগামী ৭২ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, একই সময়ে আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তন হতে পারে।
উদ্ধার কাজে নৌবাহিনী সদস্যরা নিজস্ব ক্রুজ ও বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহার করছেন। বিকেলে ৬০ জনের আরেকটি দল আরো ক্রুজ ও হেলিকপ্টারসহ উদ্ধার কাজে যুক্ত হয়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, বন্যার পানিতে রানওয়ের অ্যাপ্রোচ লাইট ডুবে গেছে। এ ছাড়া পাওয়ার ক্যাবলগুলো পানির নিচে চলে গেছে। এ অবস্থায় ঝুঁকি এড়াতে সিলেট বিমানবন্দরে যেসব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট আসার কথা ছিল সেগুলো এখন ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১